তিন খরগোশশাবক ও শিশুটির বেঁচে থাকার একই লড়াই
শনিবার (১ মার্চ)। ঘড়িতে রাত ১১টার কাঁটা পার হয়ে যাচ্ছে। তখন রাজশাহী নগরের অলকার মোড়ে ফুটপাতের একটি সবজির দোকানে একটিমাত্র বাঁধাকপি অবশিষ্ট রয়েছে। দোকানি ১০ টাকায় দিতে চান। এক নারী দাম বলছেন, ‘৫ টাকা।’ দোকানি বললেন, ‘কেনাই ১০ টাকা।’ ক্রেতা বললেন, ‘দেন গো, আমার ব্যাটারা (ছেলেরা) খাবি।’ বলেই হেসে উঠলেন। তারপর নিজেই বললেন, ‘আমার ওই বেটিডার (মেয়েটার) তিনডি খরগোচের বাচ্চা আছে, খাওয়াতি হবি।’ খরগোশের বাচ্চাগুলোকে নিজের ‘ছেলে’ বলেছেন বলে তাঁর মুখে অমন হাসি।
ওই নারী হাত তুলে যে মেয়েটাকে দেখালেন, তার কাঁখে বাদামের ডালা। ডান হাতে এক প্যাকেট বাদাম। বয়স ৭–৮ বছর হতে পারে। পথচারী দেখলেই ধরিয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াচ্ছে। শিশুটির মুখটিতে এতটাই মায়া যে তাকালে বাদাম না নিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কঠিন। এত রাতে বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে বাদাম বিক্রি করছেন—জানতে চাইলে নারীটি বললেন, ‘পরপর তিনটি মেয়ে হওয়ার কারণে ওর বাপ থুইয়ে চলে গেছে। আবার বিয়্যা করছে। এখন গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ি হাট এলাকায় সেই বউ লিয়্যা থাকে।’ সংসারের খরচ দেয় কি না—জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘পথেঘাটে দেখা হলে মেয়ের হাতে এক-আধ শ টাকা ধরায়ে দেয়, এই রকম আরকি।’
এই নারীর নাম পূর্ণিমা (২২)। বাদাম বিক্রি করছে তাঁর বড় মেয়ে সাবিহা খাতুন (৮)। ছোট মেয়ে তাঁর কোলে। নাম কণা। বয়স ৮ মাস। মেজ মেয়ে মাবিয়ার বয়স ২ বছর। তাকে কোলে নিয়ে রাস্তার ওপরে বসে রয়েছেন নানি মনোয়ারা বেওয়া (৬৫)। পূর্ণিমা তাঁর তিন মেয়েকে নিয়ে রাজশাহী নগরের চৌদ্দপাই এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে মায়ের সঙ্গে থাকেন। দিনের বেলায় পূর্ণিমা পুরোনো কাপড় সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। আর মা মনোয়ারা বেওয়া অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। আর রাতে তাঁরা দুজন সাবিহাকে নিয়ে বাদাম বিক্রি করতে বের হন। এভাবেই তাঁদের সংসার চলে।
কথায় কথায় জানা গেল, সাবিহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের কাছে দিনের বেলা পড়াশোনা করে। সেখানে প্রথম শ্রেণির বই পড়ে। রাতের বেলায় শহরের বাদাম নিয়ে বের হয়। সঙ্গে নানি ও তার মা আসে। পূর্ণিমা বলেন, মেয়ের হাত থেকে অনেকেই টাকা কেড়ে নেয়। সেই জন্য সঙ্গে সঙ্গে থাকতে হয়। এক কেজি বাদাম বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। বাদাম শেষ হতে হতে কোনো কোনো দিন রাত ১২টা পার হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে ঘুমাতে রাত একটা-দেড়টা বেজে যায়। এক কেজি বাদাম থেকে ৫০ টাকা আসে।
এত কষ্টের সংসারে খরগোশ পোষেন কীভাবে—জানতে চাইলে পূর্ণিমা বলেন, একদিন রাস্তায় এক লোকের কাছে খরগোশ দেখে মেয়ে সাবিহা খরগোশের বাচ্চা নেওয়ার জন্য কান্না জুড়ে দেয়। রাস্তায় গড়াগড়ি দিয়ে কান্না। এ অবস্থা দেখে খরগোশের মালিক মেয়েকে তিনটি বাচ্চা দেয়। এখন মেয়ের শখ। তিন দিনে খরগোশের বাচ্চার পেছনে ৪০ টাকা যায়। পূর্ণিমা বলেন, ‘মেয়েরা খাক না খাক, খরগোশের বাচ্চা লিয়্যাই ওরা খুব খুশিতে থাকে।’
দেখার জন্য পরের দিন বিকেলে পূর্ণিমাদের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দুই কক্ষের জরাজীর্ণ একটি টিনশেডের বাড়িতে তাঁরা থাকেন। ভাড়া দিতে হয় সাড়ে তিন হাজার টাকা। একটি ঘরে পূর্ণিমা, তাঁর মা মনোয়ারা বেওয়া, পূর্ণিমার তিন মেয়ে এবং তাঁর ‘ব্যাটারা’ অর্থাৎ তিনটি খরগোশের বাচ্চা থাকে। আরেক ঘরে পূর্ণিমার বোন মেরিনা বেগম (২৬) তাঁর দুই সন্তান নিয়ে থাকেন।
মেরিনার ছেলে মোরসালিনও সাবিহার সঙ্গেই বাদাম বিক্রি করতে যায়। ছেলের সঙ্গে মেরিনাও যান। মেরিনা দিনের বেলায় বাসাবাড়িতে কাজ করেন। তাঁর আগের স্বামী ছেড়ে গেছেন। পরে আবার বিয়ে করেছেন। এই স্বামীর আরও একজন স্ত্রী আছেন। মেরিনা বললেন, ‘সব জেনেই এমন বিয়ে করেছেন। একলা থাকলে মানুষ জ্বালায়।’
পূর্ণিমার বাবা কুদরত আলী রিকশা চালাতেন। করোনার আগে মারা গেছেন। পূর্ণিমার এক ভাই রাজশাহী নগরের বুধপাড়ায় থাকেন। রিকশা চালান। আরেক ভাই চারঘাটে থাকেন। দিনমজুরি করেন। মা মনোয়ারা বেওয়া বললেন, দুই ছেলেরই ঠিকমতো চলে না। কিছু দিতে পারে না। তাই বড় মেয়ে আর নাতনিদের সঙ্গে তিনি থাকেন।
এই বাড়িটির ভাড়ার সাড়ে তিন হাজার টাকা অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করে নেন পূর্ণিমা ও মেরিনা। ঘর দুটি এতটাই জরাজীর্ণ যে বৃষ্টি হলে বাইরের সব পানি তাঁদের ঘরে গিয়ে ঢোকে। আর ভাঙা চালা দিয়েও বৃষ্টির পানি পড়ে। রাতে বৃষ্টি এলে তাঁরা ঘুমাতে পারেন না। কিন্তু এই ভাঙা ঘরে দেখা গেল আনন্দের বন্যা। শিশুরা খরগোশের বাচ্চা নিয়ে মেতে আছে। খরগোশের বাচ্চাগুলো দৌড়াদৌড়ি করছে। তাদের সঙ্গে সাবিহা, মাবিয়া আর তার খালাতো ভাই মোরসালিন সমানে ছোটাছুটি করছে। তাদের আনন্দ দেখে মনে হলো না যে এই বাড়িতে কোনো কিছুর অভাব আছে।