রাজশাহীতে ৩ হাজার সূর্যমুখীতে কৃষক লিখলেন ‘অমর ২১’

রাজশাহীতে ৩ হাজার সূর্যমুখী ফুল দিয়ে কৃষক মনিরুজ্জামান একুশের আলপনা তৈরি করেছেন। বৃহস্পতিবার রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণে
ছবি: প্রথম আলো

প্রত্যাশা ছিল ফুলগুলো ৬০ দিনে ফুটবে। ঠিকমতো ফুটলে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এসব ফুল দিয়ে ‘একুশ’ লিখবেন—এই পরিকল্পনা ছিল কৃষক মনিরুজ্জামানের। কিন্তু আবহাওয়াসহ নানা কারণে ফুলগুলো সম্পূর্ণ ফুটতে সাত দিন বিলম্ব করেছে। সে জন্য সূর্যমুখী দিয়ে একুশের আলপনা করতে সাত দিন বিলম্ব হয়ে গেল। অবশেষে আজ বৃহস্পতিবার মনিরুজ্জামান তিন হাজার সূর্যমুখী ফুল দিয়ে রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণে একুশের আলপনা করেছেন। সেই আলপনা দেখতেই শত শত মানুষ ভিড় করেছেন।

ফুলের এই আলপনাটি বেলা ১১টায় উদ্বোধন করেন রাজশাহীর ভাষাসৈনিক মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ মু. যহুর আলী, উপাধ্যক্ষ মো. ইব্রাহিম আলীসহ কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

মনিরুজ্জামানের খামার রাজশাহী শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার পশ্চিমে গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর মাঠে। গত ২০ ডিসেম্বর ওই মাঠে তিনি এই ফুলের বীজ রোপণ করেছিলেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল একুশে ফেব্রুয়ারিতে সব ফুল ফুটবে। কিন্তু ফুল ফুটতে বিলম্ব হওয়ার কারণে সাত দিন দেরিতে তিনি এই আলপনা করতে পারলেন। ৩৩ ফুট বাই ৩৫ ফুট আয়তনের এই আলপনার মাঝখানে বাংলায় ‘অমর ২১’ লেখা হয়েছে। ফুল দিয়ে তার চারপাশ দিয়ে সুন্দর একটি নকশা এঁকে দেওয়া হয়েছে। নকশাকে ঘিরে চারদিক দিয়ে আর একটা সীমানারেখা টেনে দেওয়া হয়েছে। সবই করা হয়েছে সূর্যমুখী ফুল দিয়ে।

এই ফুলের নকশা তৈরি করতে মনিরুজ্জামানকে সহযোগিতা করেছেন জেসমিন হোসেন। তিনি রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। জেসমিন হোসেন বলেন, ভাষার জন্য ১৯৫২ সালে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের স্মরণ করে এত চমৎকার একটা উদ্যোগ নিয়েছেন কৃষক মনিরুজ্জামান, সেই চেতনা থেকে তিনি সহযোগিতা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা করে মন থেকেই আমার অনেক ভালো লেগেছে। সারা দিন মানুষ দেখতে আসছে, এইটা আমি উপভোগ করেছি। কেউ যাতে নষ্ট না করে, সে দিকটাও নজরদারি করেছি।’

বিলম্বে ফোটায় একুশে ফেব্রুয়ারির ৭ দিন পর সূর্যমুখী ফুল দিয়ে ‘অমর ২১’ আলপনা করলেন কৃষক মনিরুজ্জামান। বৃহস্পতিবার রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণে

রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, ‘কৃষক মনিরুজ্জামান তাঁর কাছে প্রস্তাব করেছিলেন, নিজের চাষ করা সূর্যমুখী ফুল দিয়ে তিনি একুশের আলপনা তৈরি করবেন। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছি। এ জন্য যে একুশের চেতনাকে ধারণ করে তিনি একটি চমৎকার কাজ করেছেন।’

সকালে উদ্বোধনের পর থেকেই রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ভিড় জমে উঠতে থাকে। বিকেলে এই ভিড় আরও বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের সহকারী লোকোমাস্টার জাহাঙ্গীর আলম তাঁর দুই শিশুসন্তান ও তাঁর ভাইয়ের দুই সন্তানকে নিয়ে এই ফুলের আলপনা দেখতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি রাজশাহী কলেজেই পড়েছি। আমার কলেজ প্রাঙ্গণে সুন্দর করে সূর্যমুখী ফুল দিয়ে আলপনা করা হয়েছে শুনে বাচ্চাদের নিয়ে দেখতে এসেছি। এককথায় দেখে খুবই ভালো লাগল। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি না হোক, তবু ভাষার মাসেই এই আলপনা করা হয়েছে। আমি বলব এটি সার্থক হয়েছে। যে কৃষক ফুল চাষ করে এই আলপনা তৈরি করেছেন, তাঁর স্বপ্ন সত্যি হয়েছে বলে আমি মনে করি।’

শাওন আহমেদ নামের এক ব্যক্তি স্ত্রী ও শিশুসন্তান নিয়ে এসেছেন। স্ত্রী-সন্তানকে একুশের আলপনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রেখে তিনি ছবি তুলছিলেন। বললেন, ‘এককথায় খুব সুন্দর।’

কৃষক মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দিয়ে আসছি। বাসায় গাছ লাগিয়ে ফুল ফুটিয়ে সেই ফুল একুশে ফেব্রুয়ারির দিনে শহীদ মিনারে দিয়েছি। গ্রামে একটি স্কুলের প্রথম শহীদ মিনার স্থাপন করার পর সেখানে প্রথম ফুল আমরা গ্রামের সব বাচ্চাদের নিয়ে গিয়ে দিয়েছি। সেটির ধারাবাহিকতাতেই আমার কাছে বরাবরই মনে হয়েছে যে ২১ ফেব্রুয়ারির চেতনাকে যদি আমরা আমাদের জাতীয় জীবনে লালন না করি, তাহলে কিন্তু আমরা পিছিয়ে যাব। যাঁরা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা তাঁদের পারিবারিক সম্পত্তি রক্ষার জন্য জীবন দেননি। তাঁরা ভেবেছেন, বাংলা যদি রাষ্ট্রভাষা না হয়, তাহলে এই দেশের জনগণ পিছিয়ে যাবে। নতুন প্রজন্ম একুশকে ভুলে না যায়।’

সূর্যমুখী ফুল দিয়ে কেন ২১ লেখার কথা ভেবেছিলেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সূর্যমুখী ফুলটা সাইজে অনেক বড় হয়। এই ফুলটা দেখতেও সুন্দর। তাই মনে হয়েছে যে একটু সহজে এটা দিয়ে লেখাটা সম্ভব হবে এবং ভালো হবে। সেই জন্য আমি প্রায় তিন হাজারের মতো বীজ লাগিয়েছিলাম।’