কয়েক লাখ মুসল্লির সমাগমে জনসমুদ্র শোলাকিয়া, শান্তি কামনা করে মোনাজাত
ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে এসেছিলেন আবদুল মতিন। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহে স্বস্তিতে নামাজ আদায় শেষে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। দীর্ঘ ১৫ বছর পর আবারও শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় করে মাহবুবুর রহমান বাড়ি ফেরার সময় বলেন, ‘এর আগে কখনো এত মুসল্লি শোলাকিয়ায় দেখিনি। বড় মাঠে দোয়া কবুল হয়, সেই বিশ্বাসেই ১০ বছর বয়স থেকে এলাকার লোকদের সঙ্গে শোলাকিয়ায় নামাজ পড়তে আসতাম। মাঝখানে নানা কারণে আসা হয়নি। তবে এবার নামাজ পরে অনেক শান্তি পেয়েছি। আল্লাহ যত দিন বাঁচিয়ে রাখেন তত দিনই আসব।’
৮৫ বছর বয়সী মো. সুরুজ আলী। তিনি জানালেন, তিনি পাকিস্তান আমল থেকে শোলাকিয়া ঈদগাহে নামাজ পড়তে আসেন। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দায়। প্রতিবারের মতো এবারও এক দিন আগে তিনি শোলাকিয়া ঈদগাহে নামাজ পড়তে চলে এসেছেন। সুরুজ আলী জানান, বড় মাঠে বেশি সওয়াব ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় তিনি প্রায় ৬৫ বছর ধরে শোলাকিয়া ঈদগাহে আসছেন।
শুধু সুরুজ আলী নন, দেশের নানা প্রান্ত থেকে কয়েক শ লোক শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ পড়তে দু–এক দিন আগেই চলে আসেন। ঐতিহাসিক এ ঈদগাহে নামাজ পড়বেন বলে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে মফিজুর রহমান নামের একজন গত শনিবার সকালেই কিশোরগঞ্জে চলে আসেন। তিনি পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক প্রবাসী। ২০-২৫ বছর থেকে তাঁর ইচ্ছা ছিল শোলাকিয়ার ঈদগাহে নামাজ পড়বেন। কিন্তু দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকায় সময়–সুযোগ হয়ে ওঠে না। তাই এবার মোজাম্বিক থেকে নিয়ত করেই দেশের বাড়িতে আসেন এবং সেখান থেকে শোলাকিয়ায় চলে আসেন। নামাজ শেষে তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন।
বাগেরহাট থেকে মো. ইব্রাহীম নামের একজন শিক্ষক তাঁর ভাই মোস্তফাকে নিয়ে এক দিন আগেই শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ পড়তে আসেন। ফজর আলী নামের আরেকজন নাটোর সদর থেকে শোলাকিয়া ঈদগাহে এসেছিলেন। এভাবে দু–এক দিন আগে ও আজ ঈদের নামাজের আগপর্যন্তই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এ ঈদগাহে সমাবেত হন। সঙ্গে স্থানীয় লাখো মুসল্লির সমাগমে নামাজ শুরুর এক ঘণ্টা আগেই মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
নামাজ শুরু হয় সকাল ১০টায়। এবার ছিল ১৯৮তম ঈদুল ফিতরের জামাত। জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ এবার শোলাকিয়া ঈদ জামাতের ইমামতি করেন। এর আগে ২০০৯ সালে সর্বশেষ এ ঈদগাহে ইমামতি করেছিলেন তিনি।
শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খানের পক্ষে কথা বলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজাবে রহমত। তিনি বলেন, এবার কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় লাখ লাখ মুসল্লি উৎসাহ–উদ্দীপনা ও স্বস্তিতে নামাজ আদায় করেছেন। শোলাকিয়ায় প্রতিবারের মতো এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনায় লাখো মুসল্লির ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিতে মুখর ছিল ময়দান।
সরেজমিন দেখা যায়, ভোর থেকেই দূরদূরান্ত থেকে দলে দলে মুসল্লিরা আসতে শুরু করেন। সকাল ৯টার দিকে মাঠ কানায় কানায় ভরে যায়। নামাজে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই বলেন, এবার শোলাকিয়ায় রেকর্ড পরিমাণ মুসল্লি হয়েছে। প্রায় তিন লাখ মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান পরিপূর্ণ হয়ে চারপাশের রাস্তা এবং আশপাশের মাঠেও মুসল্লিদের নামাজের জন্য জায়গা পেতে বসতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও মুসল্লিদের দাবি, শোলাকিয়ায় এবার ছয় থেকে সাত লাখ মুসল্লির সমাগম হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নামাজ ও মোনাজাত শেষে মুসল্লিরা বাড়ি ফেরেন।
এর আগে শোলাকিয়া মাঠের রেওয়াজ অনুযায়ী, বন্ধুকের ফাঁকা গুলির মাধ্যমে সকাল ১০টায় জামাত শুরু হয়। নামাজ শেষে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনা করে মোনাজাত করা হয়। দেশের সবচেয়ে বড় এই ঈদ জামাত নির্বিঘ্ন করতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় স্থানীয় প্রশাসন। মোতায়েন ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ), পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং জেলা পুলিশের ১ হাজার ১০০ সদস্য।
এ ছাড়া মাঠের ভেতর ও বাইরে ছিল অর্ধশতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা, পুরো মাঠ পর্যবেক্ষণের জন্য ছিল কয়েকটি ড্রোন। ছয়টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের মাধ্যমে সবার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ ছাড়া মাঠের ভেতর-বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তায় ছিলেন অনেক স্বেচ্ছাসেবী। নিরাপত্তার স্বার্থে কাউকে ছাতা বা কোনো ধরনের ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি মাঠে। মুসল্লিদের সঙ্গে ছিল শুধু পাতলা জায়নামাজ। তাঁদের যাতায়াতে দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
বিভিন্ন বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়ায় বড় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে শোলাকিয়া সাহেববাড়ির লোকজন এ মাঠের প্রচলন করেন। এরপর ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর দেওয়ান হয়বত খাঁ কিশোরগঞ্জের জমিদারি প্রতিষ্ঠার পর এ ঈদগাহের কলেবর বড় করে মাঠের জমির পরিমাণ বাড়ান। দেওয়ান মান্নান দাদ ছিলেন হয়বত খাঁর বংশধর। হয়বত খাঁ ছিলেন ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর। যে কারণে এ মাঠে জমিদারির একটা ঐতিহ্য রয়েছে। এটা তৎকালীন জমিদারের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ ছিল বলে ইতিহাসবিদদের কাছে জানা যায়।
এ ছাড়া শোলাকিয়া ঈদগাহ নিয়ে দুটি জনশ্রুতির বর্ণনা রয়েছে। এর একটি হলো, মোগল আমলে এখানকার পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল শ লাখ টাকা, মানে এক কোটি টাকা। কালের বিবর্তনে শ লাখ থেকে বর্তমান শোলাকিয়া হয়েছে। আরেকটি বর্ণনায় আছে, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সেই থেকে এটি শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদের দিন শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের কাছে পুলিশ সদস্যদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় জঙ্গিরা। এতে পুলিশের দুই সদস্য, স্থানীয় এক নারী ও পুলিশের গুলিতে একজন সন্ত্রাসীসহ সেদিন চারজন নিহত হয়েছিলেন। সেই থেকে এ মাঠে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। শোলাকিয়ায় নির্বিঘ্নে ঈদের নামাজ আদায় শেষে মুসল্লিরা ঘরে ফেরায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী।