মাচায় ঝুলছে লাউ, ক্রেতা নেই
এক একর জমিতে লাউ চাষ করেছেন কৃষক সিরাজ উদ্দিন। ফলনও হয়েছে ভালো। এরপরও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে সিরাজ উদ্দিনের। জানালেন, চাষাবাদে খরচ হয়েছে ৯০ হাজার টাকার মতো। অথচ এ পর্যন্ত লাউ বিক্রি করে আয় হয়েছে সাড়ে ৮ হাজার টাকা। এখন স্থানীয় বাজারে লাউ বিক্রির জন্য নিয়ে গেলেও ক্রেতা তেমন মিলছে না। যাঁদের পাওয়া যাচ্ছে, তাঁদের কাছে লাউ বিক্রি করে উঠছে না পরিবহন খরচ।
সিরাজ উদ্দিন নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরক্লার্ক ইউনিয়নের দক্ষিণ চরক্লার্ক গ্রামের বাসিন্দা। সম্প্রতি তাঁর খেতে গিয়ে দেখা যায়, খেতজুড়ে মাচায় ঝুলছে নানা আকারের লাউ। কিছু লাউ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় খেতের পাশে।
সিরাজ উদ্দিন বলেন, গত বছরের বন্যায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে লাউ চাষ করেছিলেন। আশানুরূপ ফলনের পরও ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকে। তিনি বলেন, ‘বাজারে লাউ নিয়ে গেলে কেউ কিনতে চায় না। বাজারে যে গাড়িভাড়া করে নিয়ে যাব, এর খরচ তো অন্তত উঠতে হবে। দাম না পাওয়ায় গত প্রায় ২০ দিন ধরে বাজারে লাউ নেওয়া বন্ধ রেখেছি।’
নিজের খেতে অন্তত দুই হাজার ছোট-বড় লাউ এখন মাচায় ঝুলছে বলে জানান সিরাজ উদ্দিন। বলেন, তাঁর মতো এলাকার সবচাষিই লাউ চাষ করে বিপাকে। কেউ গরুকে লাউ খাওয়াচ্ছেন। এখন অবস্থা এমন যে গরুও লাউ খেতে চায় না। লাউ চাষ যেন চাষিদের জন্য গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে।
এলাকায় কথা হয় আরেক কৃষক আবুল খায়েরের (৫৫) সঙ্গে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তিনি ১০ শতাংশ জমিতে লাউ চাষ করেছেন। পাশাপাশি এক একর জমিতে চাষ করেছেন শিম। দুটি ফসলেরই বাজার এবার খারাপ যাচ্ছে। ক্রেতা না থাকায় তিনিও বাজারে লাউ বিক্রি করতে নিচ্ছেন না।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সুবর্ণচর উপজেলার অনেক কৃষক কমবেশি লাউয়ের চাষ করেছেন। অনেকে নিজেদের বাড়ির আঙিনায়ও লাগিয়েছেন লাউয়ের গাছ। এ কারণে স্থানীয় বাজারে লাউয়ের সরবরাহের তুলনায় চাহিদা নেই বললেই চলে। আবার এলাকার সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় জেলা শহর এবং অন্যান্য জেলা ও উপজেলা থেকে পাইকারেরা আসতে চান না। এ অবস্থায় লাউ চাষ করে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।
চর ক্লার্ক এলাকা থেকে লাউ, শিমসহ বিভিন্ন সবজি পাইকারি কিনে বাজারে বিক্রি করেন ব্যবসায়ী মো. রিধন উদ্দিন। তিনি বলেন, সাত-আট বছর ধরে তিনি এই এলাকা থেকে সবজি কিনে পাইকারি বাজারে বিক্রি করেন। সুবর্ণচরে গত বছরের তুলনায় এবার সব ধরনের সবজির ফলন ভালো হয়েছে। তাই লাউয়ের চাহিদা কম।
সুবর্ণচর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের জেলা শহরের মাইজদী পৌর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একেকটি লাউ বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৪০ টাকা দরে। দামের তারতম্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বিক্রেতা জসিম উদ্দিন বলেন, চরে সবজির দাম কম। তবে আনতে অনেক গাড়িভাড়া লাগে। তাই কিছুটা বাড়তি দামে তাঁদের বিক্রি করতে হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর নোয়াখালীতে ১৫ হাজার ১০৭ হেক্টর জমিতে শীতকালীন নানা সবজির আবাদ হয়েছে। সব ধরনের সবজির ভালো সরবরাহ থাকায় দাম কিছুটা কম। লাউয়ের দাম না পাওয়া বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মীরা রানী দাশ প্রথম আলোকে বলেন, নোয়াখালীতে কোনো হিমাগার নেই। এই এলাকায় সবজির সংরক্ষণাগার করার বিষয়ে তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছেন। সংরক্ষণাগার করা গেলে কৃষকেরা সব সবজির ন্যায্যমূল্য পাবেন।