নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে পুরুষকেও

‘উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি’ প্ল্যাটফর্মের এক যুগ পূর্তি উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে কর্মসূচি পালন করা হয়ছবি: আশরাফুল আলম

নারীবাদ নিয়ে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। নারীবাদ পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। পুরুষতন্ত্র নারীকে সমান অধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ায়। তাই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নারীর পাশাপাশি পুরুষকেও দাঁড়াতে হবে।

আজ রোববার বিকেলে ‘উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি’ প্ল্যাটফর্মের এক যুগ পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন বক্তারা। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ‘স্বাধীনতার জন্য জাগো, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাগো’ শিরোনামে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যৌথভাবে উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি ও নারীবাদীদের সংগঠন সাংগাত বাংলাদেশ।

নারীর ওপর দেশে দেশে বিরাজমান সহিংসতার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী গণসচেতনতা সৃষ্টি ও প্রতিরোধ গড়ার লক্ষ্যে সংগঠিত চলমান আন্দোলন ‘উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি’। ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত এটি। ২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী এর সূচনা হয়। এ বছর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদ্যমে উত্তরণে শতকোটির যুগপূর্তি পালন করা হবে। আজ ছিল এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে ‘ছেলে–মেয়ে বৈষম্য, ভালো সমাজে নয় কাম্য’, ‘নীরবতা ভাঙব, সহিংসতা রুখব’, ‘নারীর শিক্ষা নিশ্চিত করি, উন্নত এক সমাজ গড়ি’, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা, আর না আর না’, ‘সম্পত্তিতে সমান অধিকার নিশ্চিত করো’, ‘যৌন হয়রানিকে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করি’ ইত্যাদি বিভিন্ন স্লোগানের মধ্য দিয়ে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংগাতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সদস্য (কোর গ্রুপ মেম্বার) ফওজিয়া খোন্দকার ইভা বলেন, যেদিন থেকে বিশ্বে পিতৃতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে, সেদিন থেকেই নারী নির্যাতন শুরু হয়েছে। নারীর অধিকার রক্ষা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সেই সময় থেকে জন্ম নিয়েছে নারীবাদ। পিতৃতন্ত্রব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত করেছে পুঁজিবাদ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দাঁড়িয়েছে। এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে পুরুষদেরও দাঁড়াতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে।

অনুষ্ঠান শেষ হয় সাদা ব্যানারে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নানা মতামত প্রকাশের মধ্য দিয়ে
ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা বলেন, বহুকাল ধরে নারী তার বিরুদ্ধে ঘটে চলা অন্যায়–অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছে। যখন থেকে নারীর মধ্যে অধিকারসচেতনতা তৈরি হয়, তখন থেকেই নারীর মনে প্রশ্ন জাগতে থাকে, কেন পুরুষের মতো সমাজে নারীর প্রতি সহযোগিতা ও সমদৃষ্টি নেই। এই ‘কেন’র উত্তর খুঁজতে গিয়ে গড়ে উঠেছে নারী আন্দোলন। কোনো নারী যখন নির্যাতনের শিকার হন, তখন শুধু তিনিই নন, তাঁর পুরো পরিবার ভুক্তভোগী হয়। এ বিষয় মাথায় রেখে নারী–পুরুষ প্রত্যেক মানুষকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জেগে উঠতে হবে।

লেখক ও অধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান বলেন, নারীবাদ পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তাই পুরুষকেও নারীর প্রতি যেকোনো ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে এগিয়ে আসতে হবে। জুলাই বিপ্লবের পর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে সবাই। অথচ এখনো নারীরা নিরাপদ নয়, নির্যাতনের ঘটনা ঘটছেই। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারী–পুরুষের ওপর হামলার প্রতিবাদ করে তিনি বলেন, আদিবাসীরা আরও বঞ্চিত। এই সময়েও আদিবাসীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে।

অনুষ্ঠানে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন বহ্নিশিখার প্রধান তাসাফি হোসেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাংগাত বাংলাদেশের সমন্বয়ক সোহানা আহমেদ। অনুষ্ঠান শেষ হয় সাদা ব্যানারে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নানা মতামত প্রকাশের মধ্য দিয়ে। রংতুলি আর মার্কার দিয়ে কেউ লিখেছেন, ‘চাই মুক্ত আকাশ’, কেউ লিখেছেন ‘আদিবাসী নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করো’, ‘নারী–শিশু পণ্য নয়, ওরাও করবে বিশ্ব জয়’ ইত্যাদি।

প্ল্যাটফর্মের অংশীদার হিসেবে আজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নারীপক্ষ, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি (বিএনডব্লিউএলএ), নিজেরা করি, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), প্রাগ্রসর, একশনএইড বাংলাদেশ, বহ্নিশিখা, প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র, টাঙ্গাইলের মানব প্রগতি সংঘসহ কয়েকটি সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষে মানবন্ধন কর্মসূচি পালন করা হবে। ২২ ফেব্রুয়ারি আয়োজন করা হবে সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।