সমাজে নারীদের করুণ দশার পেছনে দায়ী ‘পুরুষতন্ত্র’
সমাজে নারীদের করুণ দশার পেছনে দায়ী একটি শব্দের নাম ‘পুরুষতন্ত্র’, যা শুধু পুরুষদের মধ্যেই নয়, সমাজের নারীদের মধ্যেও প্রবল। এ ধরনের সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে লড়াই করতে হবে। সংখ্যায় বেশি হলেও গুণগত দিক থেকে নারীরা এখনো পিছিয়ে রয়েছেন। বর্তমান নতুন এই সময় ও সুযোগ কাজে লাগিয়ে সব স্তরে নারীদের অধিকার এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আজ বুধবার সকালে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এনজিসিএএফ) আয়োজিত আলোচনা সভা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথা বলেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে এ সভা হয়।
অনুষ্ঠানে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশ, রাজনীতি, সমাজে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পরিবার, প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গণপরিবহন এবং সড়কে নারী এবং কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে। নারীর অবস্থা ও অবস্থানের উন্নতির ওপর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।
অধ্যাপক বদিউল আলম আরও বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে জুলাইয়ের আন্দোলনে নারীদের এত গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ এবং অবদানের পর আমরা নারীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। তাই দ্রুত নারীদের সঙ্গে হওয়া সব অন্যায়-নিপীড়ন রুখে দিতে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানে দুজন নারী সমাজকর্মীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা এবং লেখক ও মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রকাশিত পোস্টারের মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা।
সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘আমাদের সমাজ এখনো দোষীর চেয়ে নিপীড়িতের দিকেই বেশি আঙুল তোলে। ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত হয় না, কিন্তু ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির জীবন বিষিয়ে তোলা হয়। সমাজ তাকে মুখ লুকাতে বাধ্য করে। এই মনমানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। নারীর বিরুদ্ধে অন্যায়ের শাস্তি নিশ্চিত করতে শুধু কঠিন আইন থাকলেই হবে না, আইনগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।’
কন্যাশিশুর সর্বোত্তম বিকাশের পথ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেই দায়িত্ব পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে নিতে হবে বলে মনে করেন সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, দেশ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীদের সহ-অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। মেয়েরা যেন তাদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে পারে, তেমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান বলেন, জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৫১ শতাংশ নারী। সংখ্যায় বেশি হলেও গুণগত দিক থেকে নারীরা এখনো পিছিয়ে রয়েছেন। বিশেষ করে পাহাড়ি নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে। নতুন এই সময় ও সুযোগ কাজে লাগিয়ে সব স্তরের নারীদের অধিকার এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে।
বাংলাদেশে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি কবিতা বোস বলেন, সোচ্চার ও আত্মবিশ্বাসী নারীরাই ইতিহাস তৈরি করেন। তাই নারী ও কন্যাশিশুদের উচিত নিজেদের দক্ষ ও যোগ্য করে তোলা, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার জন্য আত্মবিশ্বাসী হওয়া। আর এর জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
এদিকে নারী উন্নয়নের জন্য সমতার চেয়ে সাম্যের ওপর বেশি জোর দেন শিশু একাডেমির মহাপরিচালক তানিয়া খান। কারণ, তিনি মনে করেন, সাম্য না আনলে সমতা নিশ্চিত হবে না।
ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আজ সব জায়গা থেকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেছে। রাষ্ট্র যদি তার দায়িত্ব পালন করে এবং আমরা সবাই যদি সোচ্চার থাকি, তাহলে নারীর প্রতি নির্যাতন ও বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র আমরা গড়ে তুলতে পারব।’
সভায় প্রবন্ধপত্র পাঠ করেন এনজিসিএএফের সহসভাপতি শাহীন আক্তার। তিনি বলেন, নারীরা যেন নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারেন, সে জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কারের মধ্য দিয়ে নারীদের জন্য বাসযোগ্য একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।