নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন
নতুন বাংলাদেশে উগ্রবাদ উত্থানের শঙ্কা, প্রতিবেদনকে বিভ্রান্তিকর বলছে সরকার
বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের উত্থানের আশঙ্কা তুলে ধরে প্রতিবেদন করেছে মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস। মুজিব মাশাল ও সাইফ হাসনাতের করা প্রতিবেদনটির প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশ সময় গতকাল সোমবার রাতে পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের উত্থানের শঙ্কা প্রকাশ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস। গতকাল সোমবার রাতে পত্রিকাটি অনলাইনে ওই সংবাদ প্রকাশ করেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আজ মঙ্গলবার এই প্রতিবেদনকে বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করেছে। সিএ প্রেস উইং ফ্যাক্টসের ফেসবুক পেজে বলা হয়, ভুল চিত্র ও একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়, নারীর শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে উগ্রবাদীরা বিষয়টি শুরু করেছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী নেতাকে উৎখাতের পর একধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতার মধ্যে একটি শহরের ধর্মীয় মৌলবাদীরা ঘোষণা দিয়েছে, তরুণীরা আর ফুটবল খেলতে পারবে না। আরেকটি শহরে এই মৌলবাদীরা এমন এক ব্যক্তিকে ছেড়ে দিতে পুলিশকে বাধ্য করেছে, যিনি হিজাব না পরায় প্রকাশ্যে এক নারীকে হেনস্তা করেছিলেন। পরে তাঁকে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়।
এরপর আরও নির্লজ্জ আহ্বান জানানো হয়েছে। ঢাকায় এক সমাবেশে বিক্ষোভকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, সরকার যদি ইসলাম অবমাননাকারীদের মৃত্যুদণ্ড না দেয়, তাহলে তাঁরাই তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবেন। এর কয়েক দিন পর একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত গোষ্ঠী ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে বড় মিছিল করেছে।
বাংলাদেশ যখন গণতন্ত্র পুনর্নির্মাণ ও সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের জন্য নতুন এক ভবিষ্যৎ তৈরির চেষ্টা করছে, তখন দীর্ঘ দিন ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ইসলামি উগ্রপন্থীরা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
ইসলামপন্থী বেশ কয়েকটি দল ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা, যেগুলোর মধ্যে কয়েকটি আগে নিষিদ্ধ ছিল—বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তাঁরা বাংলাদেশকে আরও মৌলবাদী পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছেন। এই পরিবর্তন দেশের বাইরে থেকে খুব সামান্যই নজরে এসেছে।
ইসলামপন্থী নেতারা জোর দিয়ে বলছেন, বাংলাদেশে এমন একটি ‘ইসলামি সরকার’ হোক, যে সরকার ইসলাম অবমাননাকারীদের শাস্তি দেবে এবং ‘শালীনতা’ প্রতিষ্ঠা করবে। এই অস্পষ্ট ধারণাগুলো অন্যান্য জায়গায় বেআইনি কর্তৃপক্ষের শাসন বা ধর্মতান্ত্রিক শাসনের পথ তৈরি করে দিয়েছে।
নতুন সংবিধানের খসড়া তৈরির সঙ্গে জড়িত আছেন—এমন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এই খসড়ায় বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়টি বাদ দেওয়া হতে পারে। সেখানে বহুত্ববাদ প্রতিস্থাপন করা হবে এবং দেশকে আরও ধর্মীয় ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা হবে।
দেশের নিপীড়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যেসব নারী শিক্ষার্থী পথে নেমেছিলেন, তাঁদের জন্য মৌলবাদীদের এই উত্থান বিশেষভাবে বেদনাদায়ক।
নারী শিক্ষার্থীরা শেখ হাসিনার একদলীয় শাসনের পরিবর্তে বৈচিত্র্যপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও উন্মুক্ত পরিবেশ প্রতিষ্ঠা হবে বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের এখন ধর্মীয় লোকরঞ্জনের বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। তাদের লড়াই করতে হচ্ছে এমন এক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, যারা হিন্দু ও ইসলামের ছোট ছোট সম্প্রদায়ের অনুসারীসহ নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান থেকে স্নাতক ২৯ বছর বয়সী শেখ তাসনিম আফরোজ এমি বলেন, ‘আমরা বিক্ষোভের সামনের সারিতে ছিলাম। আমরা রাস্তায় আমাদের ভাইদের রক্ষা করেছি। এখন পাঁচ-ছয় মাস পর দেখছি, পুরো ব্যাপারটা উল্টে গেল।’
সমালোচকেরা বলছেন, ৮৪ বছর বয়সী নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার চরমপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। তাঁরা অভিযোগ করছেন, অধ্যাপক ইউনূস অপেক্ষাকৃত নমনীয়, গণতান্ত্রিক সংস্কারের ছায়ায় হারিয়ে যাওয়া ও সংঘাতবিমুখ। তিনি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে পারেননি, ফলে চরমপন্থীরা আরও বেশি জনসাধারণের স্থান দখল করে নিয়েছে।
অধ্যাপক ইউনূসের সহকারীরা একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপের কথা বলছেন। তাঁরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন জারি ছিল। এখন অবশ্যই বাক্স্বাধীনতা ও প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। কিন্তু এটি করলে মূলত চরমপন্থী দাবির জন্য একটি দরজা উন্মুক্ত হয়ে যায়।
শেখ হাসিনার পতনের পর পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়েছে। তারা আজ নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে না। সামরিক বাহিনী কিছু ‘পুলিশিং দায়িত্ব’ নিয়েছে বটে, তবে তারাও অন্তর্বর্তী সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে ক্রমেই বিরোধে লিপ্ত হচ্ছে। কারণ, ছাত্ররা অতীতের নৃশংসতার জন্য কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করতে চায়।
বাংলাদেশে এখন যা ঘটতে শুরু করেছে, তা মৌলবাদের এক ঢেউকে প্রতিফলিত করে, যা এই অঞ্চলকে গ্রাস করে ফেলেছে।
আফগানিস্তান একটি চরম জাতিগত ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে নারীদের মৌলিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। পাকিস্তানে উগ্র ইসলামপন্থীরা বছরের পর বছর ধরে সহিংসতার মাধ্যমে তাদের চাওয়া-পাওয়া বাস্তবায়ন করে আসছে। ভারতে একটি প্রতিষ্ঠিত হিন্দু ডানপন্থী দল দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ঐতিহ্যকে খাটো করেছে। বৌদ্ধ চরমপন্থীদের নিয়ন্ত্রিত মিয়ানমারে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানো হচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম বলেছেন, দেশ চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার ‘ভয় আছে’। নাহিদ ইসলাম বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন, যিনি নতুন একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সরকার থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
তবে নাহিদ ইসলাম আশাবাদী, সংবিধানে পরিবর্তন আনা হলেও গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের প্রতি ঘৃণা করার মতো মূল্যবোধগুলো টিকে থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না, বাংলাদেশে এমন কোনো রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব, যা এই মৌলিক মূল্যবোধগুলোর বিরুদ্ধে যায়।’
কেউ কেউ শিল্প ও বুদ্ধিভিত্তিক বিতর্কের গভীর ঐতিহ্যের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির সংযোগের দিকে ইঙ্গিত করেন। আবার কেউ কেউ দেশের অর্থনীতির আকার নিয়ে আশার আলো দেখতে পান।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে নারীরা গভীরভাবে জড়িত। নারীদের ৩৭ শতাংশ আনুষ্ঠানিক শ্রমশক্তিতে আছেন, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ হারের একটি। এই নারীদের জোর করে ঘরে ঢোকানোর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা এই চরমপন্থী শক্তিগুলোকে একই সঙ্গে দমন ও তুষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। আর এই দীর্ঘ সময়ে চরমপন্থী শক্তিগুলো তাদের ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছে।
শেখ হাসিনা একটি পুলিশ রাষ্ট্র চালিয়েছিলেন। তাঁর সরকার ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল, যার মধ্যে মূলধারার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিরাও ছিলেন, যাঁরা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি হাজার হাজার অনিয়ন্ত্রিত ইসলামি ধর্মীয় মাদ্রাসা অনুমোদন দিয়েছিলেন এবং শত শত মসজিদ নির্মাণে ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি ইসলামি দলগুলোর ধর্মীয় রক্ষণশীল অংশকে জয় করার চেষ্টা করেছিলেন।
শেখ হাসিনার বিদায়ের পর ছোট ছোট চরমপন্থী দলগুলো যারা এই ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে উল্টে দিতে চায় এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে চাওয়া মূলধারার ইসলামপন্থী দলগুলো—উভয় অংশই আরও মৌলবাদী বাংলাদেশের একটি যৌথ লক্ষ্যে একত্র হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী এখন একটি বড় সুযোগ দেখছে। বিশ্লেষক ও কূটনীতিকেরা বলছেন, উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক বিনিয়োগের অধিকারী এই দল দীর্ঘমেয়াদি খেলা খেলছে। অবশ্য বছরের শেষের দিকে যে নির্বাচন প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তাতে তাদের জয়ের সম্ভাবনা কম। তারপরও দলটি মূলধারার ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর প্রতি মানুষের মনে সৃষ্ট অসন্তোষকে পুঁজি হিসেবে দেখার আশা করছে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পারওয়ার বলেন, দলটি একটি ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র চায়। তাদের কাছে ধর্ম ও রাজনীতির মিশ্রণে তুরস্ক হলো সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
মিয়া গোলাম পারওয়ার বলেন, ‘ইসলামে নারী ও পুরুষের আচরণ ও নীতিশাস্ত্রের দিক থেকে নৈতিক দিকনির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাগুলোর মধ্যে নারীরা যেকোনো পেশায় অংশ নিতে পারেন। যেমন খেলাধুলা, গান, থিয়েটার, বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র ইত্যাদিতে নারীর অংশগ্রহণে বাধা নেই।’
তবে বর্তমানে রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে পুরুষেরা ইসলামি শাসনব্যবস্থায় নিজস্ব ব্যাখ্যা নিয়ে আসছেন।
স্থানীয় মেয়েদের অনুপ্রাণিত করতে কৃষিনির্ভর শহর তারাগঞ্জে গত মাসে দুটি নারী দলের মধ্যে ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আয়োজকেরা। মেয়েরা যখন খেলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন শহরের এক মসজিদের নেতা আশরাফ আলী ঘোষণা দেন, নারী ও মেয়েদের ফুটবল খেলতে দেওয়া উচিত নয়।
ক্রীড়া সংগঠকেরা সাধারণত শহরের বিভিন্ন স্থানে রিকশায় লাউডস্পিকার বেঁধে খেলার ঘোষণা দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আশরাফ আলীও তাঁর নিজস্ব লোকদের পাঠিয়ে লাউডস্পিকার লাগিয়ে খেলা দেখতে না যেতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে থাকেন।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি নারী খেলোয়াড়েরা যখন ড্রেসিংরুমে জার্সি পরছিলেন, তখন স্থানীয় কর্মকর্তারা খেলাটি নিয়ে একটি সভা করছিলেন। আয়োজকদের একজন সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করতে প্রয়োজনে আশরাফ আলী শহীদ হবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।’
পরে স্থানীয় প্রশাসন নতি স্বীকার করে, খেলা বাতিল ঘোষণা করে এবং এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে।
ওই ম্যাচে খেলতে বাসে চার ঘণ্টা ভ্রমণ করে এসেছিলেন ২২ বছর বয়সী তসলিমা আক্তার। তিনি বলেন, তিনি অনেক গাড়ি, সেনাবাহিনী ও পুলিশ দেখেছেন। তাঁরা খেলোয়াড়দের বলেছিলেন, ম্যাচটি বন্ধ।
তসলিমা আক্তার আরও বলেন, তাঁর এক দশকের ফুটবল খেলোয়াড়ি জীবনে এই প্রথম তিনি এমন বিরোধিতার মুখোমুখি হলেন।
তসলিমা বলেন, ‘কী হতে পারে, তা নিয়ে আমি এখন একটু ভীত।’
কয়েক সপ্তাহ পর নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক ডজন সদস্যের উপস্থিতিতে আয়োজকেরা নারীদের একটি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করেন। তবে সতর্কতা হিসেবে তাঁরা তরুণীদের তাঁদের হাফপ্যান্টের নিচে স্টকিংস পরতে বলেছিলেন।
উগ্রপন্থীদের অবিরাম হুমকির মুখে আয়োজকেরা বলেছেন, তাঁরা নিশ্চিত নন, তাঁরা আবার ঝুঁকি নেবেন কিনা।
মসজিদের ইমাম আশরাফ আলী এক সাক্ষাৎকারে গর্বভরে বলেন, তারাগঞ্জের মতো গ্রামীণ এলাকায় নারীদের ফুটবল ‘অশ্লীলতা’ বাড়াবে।
নারীদের খেলাধুলা ছিল আশরাফের সর্বশেষ লক্ষ্য। বছরের পর বছর ধরে তিনি নির্যাতিত সংখ্যালঘু আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ৫০০ সদস্যকে ওই এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের রাতেই আহমদিয়াদের উপাসনালয়ে একদল জনতা হামলা চালায়। আহমদিয়া সম্প্রদায় এখনো ভয়ের মধ্যে আছে। তাদের প্রার্থনালয়ে উপস্থিতি প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।
আহমদিয়াদের উপাসনালয়ের ধ্বংস হওয়া সাইনবোর্ড পুনর্নির্মাণ বা লাউডস্পিকার থেকে আজান দিতে দেওয়া হচ্ছে না। আশরাফ আলী এসব সহিংসতার দায় এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁর মতো প্রচারকেরা ‘আহমদিয়া ধর্মদ্রোহীদের’ বহিষ্কার করা প্রয়োজন বলে ক্রমাগত প্রচার চালিয়ে গেছেন।
স্থানীয় আহমদিয়া শাখার সভাপতি এ কে এম শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু এই ধর্মীয় নেতারা আমাদের বিরোধিতা করে থাকেন।’
বিভ্রান্তিকর বলছে সরকার
সরকার নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটিকে বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করেছে।
এ বিষয়ে বাসসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আজ বলেছে, নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করছে, ইসলামি কট্টরপন্থীরা একটি উন্মোচন দেখছে’ শীর্ষক নিবন্ধটি বিভ্রান্তিকর।
প্রেস উইং তার যাচাইকৃত ফেসবুক পেজ-সিএ প্রেস উইং ফ্যাক্টস-এ পোস্ট করা এক বিবৃতিতে বলেছে, নিউইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধটি বাংলাদেশের একটি বিভ্রান্তিকর ও একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে দেশটি ধর্মীয় চরমপন্থীদের নিয়ন্ত্রণের দ্বারপ্রান্তে। এই বয়ান কেবল দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতাকে অতিরঞ্জিত করে না, বরং ১৮ কোটি মানুষের একটি সমগ্র জাতিকে অন্যায়ভাবে কলঙ্কিত করার ঝুঁকির মুখেও ফেলে দেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, একটি বিভ্রান্তিকর চিত্র তুলে ধরার মতো বেছে বেছে উসকানিমূলক উদাহরণের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে বিগত বছরে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও পরিস্থিতির জটিলতা স্বীকার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিবৃতিটি নিম্নরূপ:
১. বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং চ্যালেঞ্জগুলো স্বীকার করা:
নিবন্ধটিতে ধর্মীয় উত্তেজনা ও রক্ষণশীল আন্দোলনের কিছু ঘটনা তুলে ধরা হলেও অগ্রগতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নারীদের অবস্থার উন্নতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের সুরক্ষা ও কল্যাণের জন্য বিশেষভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এটি এমন একটি সরকার, যা নারীর অধিকার ও সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা নিবন্ধে তুলে ধরা আবছা চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ‘যুব উৎসব ২০২৫’, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২৭ লাখ মেয়ে ৩,০০০ খেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল।
বিভিন্ন অঞ্চল, প্রান্তিক সম্প্রদায় এবং আদিবাসী যুবসমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে নারী ও মেয়েদের স্বতঃস্ফূর্ত ও গতিশীল সম্পৃক্ততার প্রতিফলন।
একটি ফুটবল খেলা বিরোধিতার মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি অন্যান্য ২,৯৯৯টি ইভেন্টের সাফল্যকে মুছে ফেলে না, যা অসংখ্য অংশগ্রহণকারী ও সম্প্রদায় উদ্যাপন করেছিল।
একটি অনুষ্ঠানে একটি মাত্র বাধার বিষয়ে আলোকপাত করার মাধ্যমে দেশের যুবসমাজের, বিশেষ করে নারীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ ও দৃঢ় অঙ্গীকারের বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ‘চরমপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোরভাবে প্রতিরোধ করেননি’—এই দাবি কেবল মিথ্যাই নয়, বরং এটি নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি তার আজীবন প্রতিশ্রুতিকেও উপেক্ষা করে।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক ইউনূস নারীর অধিকারের পক্ষে তাঁর অবস্থানে অটল রয়েছেন। দুই কন্যার পিতা, ইউনূস তাঁর সমগ্র কর্মজীবন এবং গ্রামীণ ব্যাংককে নারীর শক্তিতে তার গভীর বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁকে নোবেল পুরস্কার এনে দিয়েছে।
নারীর অধিকার এগিয়ে নেওয়া এবং তাঁদের স্বাধীনতা রক্ষায় তাঁর নিষ্ঠা ও কাজ তাঁর খ্যাতির ভিত্তি।
২. ধর্মীয় সহিংসতা সম্পর্কে ভুল ধারণা সংশোধন:
বাংলাদেশের মতো দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ধর্মীয় সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত অনেক সংঘর্ষকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যদিও বাস্তবে সেগুলো মূলত রাজনৈতিক প্রকৃতির ছিল।
রাজনৈতিক বিভিন্ন দল অনেক সময় সমর্থন লাভের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে, যা বিষয়টিকে জটিল করে তোলে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে ধর্মীয় নিপীড়নের মিশ্রণের ঝুঁকি তৈরি করে। পুরো পরিস্থিতিকে একটি সাম্প্রদায়িক সংঘাত হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর। কারণ, এটি প্রকৃত রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক কারণগুলোকে উপেক্ষা করে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষা করার জন্য তার প্রতিশ্রুতি সুস্পষ্ট করেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চলমান কাজ এবং সন্ত্রাসবাদ দমন প্রচেষ্টা এই প্রতিশ্রুতিকে আরও জোরদার করে।
সামাজিক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে চরমপন্থা মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টা ভুল তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে ম্লান হওয়া উচিত নয়।
৩. বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের ভূমিকা
বাংলাদেশ নীরবে এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একটিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, একটি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় যা বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রচুর সুযোগের প্রতিশ্রুতি দেয়।
সব প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়েছে, যা উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতার প্রতিফলন।
গত সাত মাসে রপ্তানি প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার পরও ব্যাংকিং খাত গতিশীল রয়েছে এবং স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ১২৩ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে।
সামনের দিকে তাকালে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা বাজারে পরিণত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৮৪ বছর বয়সী মুহাম্মদ ইউনূস আট মাস ধরে যেসব অবিশ্বাস্য কাজ সম্পন্ন করেছেন, তার স্বীকৃতি কোথায়? বাংলাদেশের জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে সফর করে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন।
গত সপ্তাহে চীন সফরের সময় চীন সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশকে ২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ, বিনিয়োগ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ঢাকা আগামী সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের সম্মেলন আয়োজন করবে, যেখানে ৫০টি দেশের ২,৩০০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারী অংশ নেবেন, যার মধ্যে মেটা, উবার ও স্যামসাংয়ের মতো বৈশ্বিক কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারাও থাকবেন।
বিশ্ব ক্রমবর্ধমানভাবে বাংলাদেশকে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এটি হচ্ছে আশা, শক্তি ও অভূতপূর্ব সুযোগের গল্প, যা সম্মান ও যথাযথ বিবেচনার দাবি রাখে।
৪. অতি সরলীকরণ এড়িয়ে চলা এবং একটি জাতিকে অপবাদ দেওয়া:
নিউইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেমন একজন নারীর ওপর নির্যাতনকারী একজন ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা একটি দেশের চরমপন্থায় পতিত হওয়ার চিত্র তুলে ধরে।
এটি কেবল বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং ক্ষতিকারক। ১৮ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশে, কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দ্বারা সমগ্র দেশকে সংজ্ঞায়িত করা অযৌক্তিক।
বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় ও গতিশীল সমাজ, যেখানে সহনশীলতা, সংস্কৃতি এবং প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে।
ধর্মীয় উগ্রবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ একা নয়; এটি একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা, যা অনেক দেশ বিভিন্ন রূপে মোকাবিলা করে।
তবে আইন প্রয়োগ, সামাজিক সংস্কার ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য ক্রমাগত কাজ করে আসছে।
মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান বা অন্য যেকোনো সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যাকে রক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিভিন্ন সমাবেশে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা ছড়ানোর জন্য সব সময় কট্টরপন্থীরা সক্রিয় থাকলেও তাদের ক্ষোভে ঘৃতাহুতি না দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
এ ছাড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে চরমপন্থার উত্থান অনিবার্য, এমন চিন্তা অত্যন্ত পূর্বধারণাপ্রসূত।
দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজ এমন শক্তিশালী, যা চরমপন্থী মতাদর্শের উত্থানকে প্রতিহত করে চলেছে।
চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি গতিধারা কেবল চরমপন্থীদের কর্মকাণ্ড দ্বারা নির্ধারিত হবে না।
বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষ করে এর যুবসমাজ ও নারীরা একটি ন্যায়সংগত, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
পরিশেষে বাংলাদেশের সহনশীলতার ইতিহাস, গণতন্ত্রের প্রতি তার অঙ্গীকার এবং নারীর ক্ষমতায়নের ওপর তার মনোযোগ এই সত্যের প্রমাণ যে দেশটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও এগিয়ে যাবে।
কয়েকটি নেতিবাচক উদাহরণের ওপর মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে আমাদের আজকের বাংলাদেশকে সংজ্ঞায়িত করে এমন অগ্রগতি, সহনশীলতা ও দৃঢ় অঙ্গীকারের ব্যাপকতর চিত্রটির স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।