কীভাবে জাফরান বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলা হলো

থালায় শোভা পাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলা জাফরানছবি: এএফপি

আড়াই হাজার বছর আগে দারুচিনি সংগ্রহের পদ্ধতির কথা জানলে রূপকথার গল্পের মতোই মনে হতে পারে। সে সময় সিনামন বা সিনামোলগ নামের একধরনের হিংস্র পাখি ছিল। এই পাখি দারুচিনির টুকরা দিয়ে বাসা বুনত। সিনামোলগ পাখির বাসা ছাড়া দারুচিনি পাওয়ার আর কোনো উপায় ছিল না। তাই দারুচিনি সংগ্রহ করতে প্রথমে মাংসের বড় টুকরার টোপ দেওয়া হতো পাখিটিকে। নিচে মাংসের টুকরা এত বড় রাখা হতো যে পাখিটি তা নিয়ে বাসায় উঠলে বেশি ওজনে বাসা ভেঙে নিচে পড়ে যেত। আর এই সুযোগে দারুচিনি সংগ্রহ করত মানুষ।

তবে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরবের মসলা বণিকেরা দারুচিনি নিয়ে এই অতিরঞ্জিত গল্পটি ফেঁদেছিল। সিনামোলগ মূলত একটি কল্পিত পাখি, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। ইউরোপীয় বণিকদের মসলার উৎস সম্পর্কে অন্ধকারে রাখতে আরব বণিকেরা মূলত এ গল্প ফেঁদেছিল।

আফগানিস্তানের হেরাত প্রদেশের গরিয়ান জেলায় খেত থেকে জাফরান ফুল তুলছেন এক শ্রমিক
ছবি: এএফপি

ইউরোপীয় ধনীদের কাছে খাবারে মসলার ব্যবহার ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। তাই মসলার দাম ছিল সাধারণের নাগালের বাইরে। ইতিহাসের হাজার বছরের পথ পেরিয়ে সেই মসলা এখন সহজলভ্য পণ্য। তবে বাজার মূল্যে জাফরান এখনো ধরে রেখেছে তার আভিজাত্য। এ কারণে বিশ্বজুড়ে এই মসলা ‘লাল সোনা’ হিসেবে পরিচিত।

সবচেয়ে অভিজাত মসলার তকমা পাওয়া জাফরানের সন্ধান পৃথিবীতে কখন পাওয়া গেল?—এই প্রশ্নের সপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাহারি খাবার ও পানীয়বিষয়ক সাময়িকী ‘ফুড অ্যান্ড ওয়াইন’ জানিয়েছে, মিনোয়ান সভ্যতায় প্রথম জাফরানের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ব্রোঞ্জ যুগে গ্রিসের এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জে গড়ে ওঠে এই সভ্যতা। সেখানেই প্রথম জাফরানের ব্যবহার শুরু হয়। প্রায় ১৬০০ খ্রিষ্টপূর্বে সান্তোরিনি দ্বীপের ফ্রেস্কো ‘দ্য স্যাফ্রন গ্যাদারার্স’ চিত্রকর্মটিতে থাকা ক্রোকাস ফুল থেকে জাফরান চাষের ধারণা পাওয়া যায়। মিনোয়ানের অভিজাত নারীরা জাফরান দিয়ে রং করা একধরনের পোশাক পরত। স্নানের পানি সুরভিত করতে রোমানরাও জাফরান ব্যবহার করত। আবার প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে বর্তমান ইরাকের প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্রগুলোয় জাফরানের রং ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ভারতের কাশ্মীর রাজ্যের পাম্পোর শহরে ফুল থেকে জাফরানের পরাগদণ্ড আলাদা করছেন এই পরিবারের সদস্যরা
ছবি: রয়টার্স

প্রণয়প্রার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে মিসরের অনিন্দ্যসুন্দরী ক্লিওপেট্রা জাফরানমিশ্রিত দুধ দিয়ে গোসল করতেন। মিসরের সম্ভ্রান্ত নারীরা রূপচর্চায় জাফরান ব্যবহার করতেন বলেও ফুড অ্যান্ড ওয়াইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আবার জন ও’কনেল তাঁর ‘দ্য বুক অব স্পাইস: ফ্রম এনাইজ ট জুডোরি’ বইয়ে লিখেছেন, মধ্যযুগীয় সন্ন্যাসীরা আবিষ্কার করেছিলেন, ডিমের সাদা অংশের সঙ্গে জাফরানের মিশ্রণে হলুদ আভাযুক্ত আঠার সৃষ্টি হয়।

জাফরানের দাম কেন আকাশছোঁয়া

অন্য যেকোনো মসলার চেয়ে জাফরানের দাম আকাশচুম্বী কেন?—এই মসলার উৎপাদনপ্রক্রিয়া জানলেই প্রশ্নের উত্তর সহজ হয়ে যায়।

ইরানের পর্যটনবিষয়ক সরকারি ওয়েবসাইট ‘ভিজিট আওয়ার ইরান’-এ বলা হয়েছে, জাফরান তৈরি হয় ক্রোকাস ফুলের গর্ভমুণ্ড থেকে। আর ক্রোকাস ফুল তুলতে হয় শরৎকালে। এই গাছ উচ্চতায় ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। ফুলের তিনটি অংশ থাকে। প্রথমটি ক্রোকাস ফুলের কেন্দ্রে থাকা লাল গর্ভমুণ্ড, যেটা দিয়ে জাফরান তৈরি হয়। দ্বিতীয় অংশ ফুলের পুংকেশর বা স্টামেন। আর তৃতীয়টি হলো ফুলের পাপড়ি। কাপড় রং করার জন্য ফুলের পাপড়ি ব্যবহার করা হয়।

জাফরানের গাছ উচ্চতায় ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়
ছবি: এএফপি

ক্রোকাস ফুল মাত্র কয়েক দিনের জন্য ফোটে। এই ফুল সকালে তুলতে হয়। হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর সাহায্যে খুব সতর্কতার সঙ্গে ফুলের গর্ভমুণ্ড সংগ্রহ করতে হয়, যেন এটা ভেঙে না যায়। এরপর গর্ভমুণ্ড রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। এক কেজি জাফরান সংগ্রহ করতে প্রায় দেড় লাখ ফুল থেকে ২০ দিন ধরে গর্ভমুণ্ড সংগ্রহ করতে হয় বলে ইরানের সরকারি এই ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে। আর এক কেজি জাফরান তৈরিতে প্রায় ৩৭০ থেকে ৪৭০ ঘণ্টা সময় লাগে।

মার্কিন সাময়িকী ‘ফুড অ্যান্ড ওয়াইন’ বলছে, ক্রোকাস ফুলের এ তিন অংশের মধ্যে শুধু গর্ভমুণ্ড থেকে তৈরি এক পাউন্ড (৪৫৩ গ্রাম) জাফরান বিক্রি হয় প্রায় ১২ লাখ ১৫ হাজার ২৮৯ টাকায় (১০,০০০ মার্কিন ডলার)। ফুল থেকে থেকে জাফরান বের করতে বেশ দক্ষতার প্রয়োজন। এ কারণেই জাফরানের আকাশছোঁয়া দাম।

জাফরান যেখানে হয়

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য বলছে, বিশ্বের ৯০ ভাগ জাফরান উৎপাদিত হয় ইরানে। ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খোরাসান এলাকা জাফরান উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। খোরাসানের রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া ও রাতের বেলার শীত উন্নত মানের জাফরান চাষের জন্য ভালো।

আবার ভারতের কাশ্মীরেও জাফরান উৎপাদন হয়। ইরানের পর ভারতই বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাফরান উৎপাদনকারী দেশ। ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কাশ্মীর রাজ্যের পাম্পোর গোটা বিশ্বে জাফরানের শহর হিসেবে পরিচিত। সেখানে ‘জাফরান ক্রোকাস’ বা আঁশ প্রায় ৩০ হাজার পরিবারের আয়ের উৎস। বহু প্রজন্ম থেকে সেই ঐতিহ্য চলে আসছে। তবে গত কয়েক দশকে নানা কারণে সেখানে জাফরান উৎপাদন কমে গেছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের হেরাত প্রদেশে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে জাফরানের চাষ হয়। আফগানিস্তানের জাফরান ভারত, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়।

আফগান নারী শ্রমিকেরা মাঠ থেকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ঝুড়িভর্তি জাফরান ফুল
ছবি: এএফপি

উচ্চমানের জাফরান চেনার উপায়

জাফরানেরও উচ্চ ও নিম্নমান থাকে। এই মানের ভিত্তিতেই দাম নির্ধারণ হয়। আসল ও উচ্চমানসম্পন্ন জাফরান চেনার উপায় হলো এর স্বাদ ও গন্ধে।

উচ্চমানের জাফরানে সাধারণত উজ্জ্বল লাল রঙের সঙ্গে সামান্য কমলা-লাল দাগযুক্ত থাকে। তবে বিবর্ণতা বা বাদামি রং থাকবে না। নিম্নমানের জাফরান নিস্তেজ দেখাতে পারে বা হালকা লাল রঙের হতে পারে। উন্নত মানের জাফরানে ফুলের মতো তীব্র ও স্বতন্ত্র ঘ্রাণ থাকে। নিম্নমানের জাফরানে হালকা বা ময়লাযুক্ত গন্ধ থাকে। উচ্চমানের জাফরান শুষ্ক হবে। কারণ, আর্দ্রতার কারণে জাফরানের স্বাদ এবং সুঘ্রাণ নষ্ট হতে পারে। নিম্নমানের জাফরান আর্দ্র বা আঠালো হবে। উচ্চমানের জাফরানের স্বাদ তীব্র, মধুযুক্ত এবং সামান্য তেতো স্বাদ থাকবে। গরম পানি বা দুধে উন্নত মানের জাফরান মিশিয়ে দিলে তা সোনালি ধারণ করবে।

বাংলাদেশে জাফরানের বাজার ও দাম

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের বাজারেও জাফরান বেচাকেনা হয়। বাংলাদেশে ইরান থেকে আসা জাফরানই বেশি বিক্রি করা হয়।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের জাফরান ব্যবসায়ী সোহাগ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. সোহাগ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ইরান থেকে জাফরান আসে। আমাদের কাছে যে জাফরান আছে, সেটা মানভেদে ১ গ্রাম ২৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করি। মূলত বিয়ের অনুষ্ঠান ও রেস্টুরেন্টে খাবারে ব্যবহারের জন্য লোকজন জাফরান কিনে নিয়ে যান।’

মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনায়েত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরাসরি ইরান থেকে আমাদের এখানে জাফরান আমদানি করা হয় না। মূলত প্রবাসীরা দেশে আসার সময় জাফরান নিয়ে এসে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন।’ জাফরানের মার্কেট ইরানের হাতে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্পেনেও জাফরানের কিছু উৎপাদন হয়। তবে, সেটার দাম বেশি। যে বছর উৎপাদন কম হয়, সে বছর জাফরানের দাম একটু বেশি থাকে। আমাদের এখানে জাফরানের কেজি দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকার মধ্যে থাকে।’

হোটেল ইন্টারকনটিনেন্টালে রেশমি জিলাপি, শাহি টুকরা, স্মুদি যেমন শাহি অ্যাভোকাডো স্মুদি, সুইট লাচ্ছি তৈরিতে জাফরান ব্যবহার করা হয় বলে প্রথম আলোকে জানালেন হোটেলটির প্রধান শেফ সাইটল বটলেরো। তিনি বলেন, ‘ইউরোপিয়ান অনেক খাবারের মধ্যে জাফরান দেওয়া হয় যেমন স্যাফ্রন রাইচ, সি ফুড পায়েলা। কিছু স্যুপেও আমরা এটা ব্যবহার করে থাকি। এটা ব্যবহারের ফলে খাবারে ঘ্রাণ, রং ও স্বাদে পরিবর্তন আসে। আমরা স্প্যানিশ জাফরান ব্যবহার করি। মাঝেমধ্যে ইরানের জাফরানও ব্যবহার করা হয়।’

ফুল থেকে জাফরানের পরাগদণ্ড আলাদা করে রাখা হচ্ছে
ছবি: রয়টার্স

জাফরানের যত গুণ

রান্না ছাড়াও জাফরান ঔষধি গুণাবলির জন্য বেশ পরিচিত। ইরানের সরকারি ‘ভিজিট আওয়ার ইরান’ ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, জাফরানের সবচেয়ে সুপরিচিত ঔষধি ব্যবহারগুলোর মধ্যে একটি হলো বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমানো। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, জাফরান মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটারের মাত্রা বিশেষ করে সেরোটোনিন, ডোপামিন এবং নোরেপাইনফ্রিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট প্রভাব ফেলতে পারে। এর অর্থ হলো জাফরান বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমিয়ে প্রশান্তি এনে দিতে পারে।

এ ছাড়া জাফরান হৃদ্‌রোগে বেশ কার্যকর। গবেষণায় জানা গেছে, জাফরান রক্তচাপ কমাতে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা উন্নত করতে এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। মূলত প্রাকৃতিক ওষুধ হলো জাফরান। জাফরান ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষায় চমৎকার কাজ করতে পারে। তবে এর অতি ব্যবহার এড়িয়ে চলাই ভালো।