নতুন বইয়ে পরিবর্তন, তবু পুরোনো বই বিক্রির সুযোগ

চলতি নতুন শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিকের বাংলা বইয়ে (সাহিত্যপাঠ) ১২টি গদ্য ও কবিতা সংযোজন-বিয়োজন হচ্ছে। পাঠ্যসূচিও বদলাবে। এরপরও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জেনেশুনে নিয়ম ভেঙে একটি মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানকে পুরোনো বই বিক্রির সুযোগ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উপরন্তু নতুন শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার কাজটিও গতবারের চেয়ে পিছিয়েছে। ফলে চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের বই কেনায় প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, অনৈতিকভাবে গত বছর কাজ পাওয়া মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসকে চলতি শিক্ষাবর্ষের অক্টোবর পর্যন্ত সাহিত্যপাঠ্য (গদ্য ও কবিতা), বাংলা সহপাঠ (উপন্যাস ও নাটক) এবং ইংরেজি—এই তিনটি বই বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে এনসিটিবি। অথচ চুক্তি অনুযায়ী তাদের এই সুযোগ ৩০ জুনই শেষ হয়েছে।

সরকার প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিনা মূল্যে পাঠ্যবই দিলেও উচ্চমাধ্যমিকের বই শিক্ষার্থীদের কিনে পড়তে হয়। এর মধ্যে সবার জন্য বাধ্যতামূলক সাহিত্যপাঠ্য (গদ্য ও কবিতা), বাংলা সহপাঠ (উপন্যাস ও নাটক) এবং ইংরেজি বইগুলো প্রতিবছর এনসিটিবির মাধ্যমে ছাপানো হয়। দরপত্র আহ্বান করে রয়্যালটির ভিত্তিতে মুদ্রণকারীদের মাধ্যমে এসব বই ছাপানো হয়। বাকি বইগুলো বাণিজ্যিকভাবে ছাপা ও বিক্রি হয়।

এত দিন তিনটি বই এনসিটিবির মাধ্যমে ছাপা হলেও এবার আইসিটি বইটিও ছাপানো হবে এনসিটিবির মাধ্যমে। সাহিত্যপাঠ্য, বাংলা সহপাঠ, ইংলিশ ফর টুডে এবং আইসিটি বইয়ের প্রতিটি ১০ লাখ করে মোট ৪০ লাখ বই ছাপার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে এনসিটিবি।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, উচ্চমাধ্যমিকে শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় ১ জুলাই থেকে। গত শিক্ষাবর্ষের (২০১৯-২০) জন্য নোয়াখালীর অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস ওই তিনটি বই ছাপার কাজ পেয়েছিল। মোট বইয়ের সংখ্যা ছিল ৩০ লাখ। চুক্তি অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত তারা বই বিক্রির কাজ পায়। তাদের বই বিক্রি করার মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি তারা আবেদন করে জানায়, করোনার কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে কলেজ বন্ধ থাকায় ছাত্রছাত্রীরা তেমন বই কিনতে পারেনি। এ জন্য তাদের সব বই বিক্রি হয়নি। ৯ লাখ বই মজুত আছে। প্রতিষ্ঠানটির আবেদনে বলা হয়, গত শিক্ষাবর্ষ এবং চলতি (২০২০-২১) শিক্ষাবর্ষের এই তিনটি বইয়ের শিক্ষাক্রম ও সিলেবাস একই।

অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন জানায়। এর ভিত্তিতে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাস সময় বাড়ায় এনসিটিবি। এনসিটিবির চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা প্রথম আলোকে বলেন, করোনার কারণে ওই প্রতিষ্ঠান তাদের সব বই বিক্রি করতে পারেনি জানিয়ে আবেদন করে। এ জন্য কেবল গত শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য তিনটি বই বিক্রির জন্য অতিরিক্ত চার মাস সময় দেওয়া হয়েছে।

অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের আবেদনে ২০২০-২১ নতুন শিক্ষাবর্ষেও এই তিনটি বই ও সিলেবাস এক থাকার কথা বললেও এনসিটিবির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেছেন, নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য যে বই ছাপা হতে যাচ্ছে, তাতে বাংলা বইয়ে (সাহিত্যপাঠ) গদ্য ও কবিতা সংযোজন-বিয়োজন হচ্ছে। পাঠ্যসূচিও পরিবর্তন করা হবে।

আবেদনে চলতি শিক্ষাবর্ষেও একই শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি থাকার কথা উল্লেখ করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী মো. কাউসার-উজ-জামান প্রথম আলোকে বলেন, তখন তাঁরা বিষয়টি জানতেন না, পরে জেনেছেন। আর নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর পরও অতিরিক্ত চার মাস পুরোনো বই বিক্রি হলে এ বছরের শিক্ষার্থীরাও প্রতারিত হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁরা তো গত বছরের শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করছেন। গত বছরের অনেক শিক্ষার্থী বই কেনেনি।

এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তা ও মুদ্রণকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণির ভর্তির আবেদন নেওয়া শুরু হয়ে গেছে। শিক্ষাবর্ষের শেষের দিকে এসে কোনো শিক্ষার্থী বই কেনে না, বরং নতুন শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রতারিত হয়ে গত বছরের বই কিনতে পারে। অথচ এবারের বইয়ে পরিবর্তন আসছে।

প্রতিষ্ঠানটিকে এনসিটিবি অনিয়ম ও অবৈধভাবে অভিজ্ঞতার সনদ দিয়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে অভিযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রক ও বিপণন সমিতি। যদিও এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেছেন, এখানে অনিয়মের কিছু নেই। তারা যে বই ছেপেছে, সেটার একটি প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে।