
মহান বিজয় দিবসে বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসের নিশান উড়েছে এবার ধরিত্রীর উল্টোপিঠে। শ্বেত ভালুক আর বলগা হরিণের দেশ কানাডার ছোট্ট শহর উইন্ডসরের মূল সরকারি ভবন সিটি হলে। ভূ-গোলার্ধের যে পিঠে বাংলাদেশ তার ঠিক অন্য পিঠে কানাডা। দেশটির একটি অনন্য সুন্দর উপদ্বীপ শহরের নাম হচ্ছে উইন্ডসর। আকাশ থেকে দেখলে মনে হবে ঠিক যেন আর একটি ছোট্ট বাংলাদেশ। যার তিনটি দিক স্বচ্ছ মিঠা সলিলে ঘেরা। শুধু একদিকে রয়েছে সবুজ শ্যমলিমার স্থল ভাগ। দেখতে একরকম মনে হলেও তার প্রায় সব মানুষই হচ্ছে ভিন্ন ভাষাভাষী। বাংলাদেশিদের সংখ্যা সে তুলনায় অতি নগণ্যই বলা চলে। এখন শীত। বদলে গিয়েছে উইন্ডসরের সবুজ শ্যমলিমা দৃশ্য। কদিন পরেই চোখে পড়বে হয়তো থরথর বরফের স্তূপ, তুষারের কাশ-ভেলা।
এবার বাংলাদেশে যখন বিজয়ের উষালগ্ন ঠিক তখনই উইন্ডসর বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন শুরু করেছে তাদের বিজয় উৎসব। অ্যাসোসিয়েশনের এবারকার উৎসব আয়োজন ছিল একটু ভিন্নধর্মী। বিজয় লগনের আনন্দ আয়োজনে ছিল ঘরে বানানো বাহারি পিঠার সমাহার। অনুষ্ঠান শুরু হয় বাংলাদেশ ও কানাডার জাতীয় সংগীত দিয়ে। অনুষ্ঠানে উইন্ডসরের বাংলাদেশ-কানাডা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির সাইফুল ভূঁইয়া স্বাগত বক্তব্য দেন।

এরপর কানাডার স্থানীয় পার্লামেন্ট সদস্য শেরল হার্ডক্যাসল বিশেষ অতিথি হিসেবে বিজয় দিবসের এই অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সব বাংলাদেশিদের সঙ্গে আমিও আজ সমানভাবে আনন্দিত। আজকের এই অনুষ্ঠান আয়োজনে যোগদানের মধ্যমে বাংলাদেশিদের গর্বের এই বিজয়ের সঙ্গে আমিও অংশীদার হলাম। আমি এতে আমন্ত্রিত হয়ে সম্মানিত বোধ করছি। আমি কানাডা সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ইতিপূর্বে ঢাকা সফর করেছি। আমি জানি বাংলাদেশিরা কতটা অতিথিপরায়ণ এবং তাদের গর্ব করার মতো অধিকার ও ঐতিহ্য রয়েছে।
পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে ছিল বক্তৃতা, আবৃত্তি, শিশু-কিশোর নৃত্য, বিজয়ের গান ও ব্যান্ড শো। এত সব আয়োজনের পাশাপাশি ছিল বাহারী রকমের শীত পিঠা ও খাবারের আয়োজন। এক কথায় মনোমুগ্ধকর ও হৃদয়গ্রাহী বিজয় দিবসের এক ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান।

বাংলাদেশিরা যেখানেই যায় সেখানেই রাখে কৃতিত্বের ছাপ। উইন্ডসর শহর তার এক অনন্য বাস্তব দৃষ্টান্ত। ইতিপূর্বে উইন্ডসরেরই ছেলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সফটওয়্যার প্রকৌশলী শাওন ভূঁইয়া ফেসবুকের নতুন অ্যাপস ‘ফেসবুক স্টোরি’ ফিচার তৈরিতে অনন্য অবদান রেখে বিশ্বনন্দিত হয়েছেন। তাঁর এই উদ্ভাবিত অ্যাপসটি ২০১৭ সালের শুরুর দিকে আমেরিকান কিছু পত্রিকা শিরোনাম করে। পরে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রথম সারির পত্রিকাগুলো ফেসবুক স্টোরির নেপথ্য কারিগর শিরোনামে লিড নিউজ করে। বাংলাদেশিদের জন্য একটি আনন্দের ও গর্বের ব্যাপার।

এই উইন্ডসর শহরের জিরো পয়েন্টে রয়েছে একটি পিস ক্লক (শান্তির ঘড়ি)। উইন্ডসর নগর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশিদের সহায়তায় স্থাপিত হয়েছে এই দৃষ্টিনন্দন ঘড়ি। হাজারো কানাডিয়ান মানুষ প্রতিদিন এই ব্যস্ততম সড়ক অতিক্রম করেন এবং পারাপারের সময় উৎসুক চোখে তাকিয়ে দেখেন এই ঘড়ি। দেখেন শান্তির বাংলাদেশকে।

উইন্ডসরের বাংলাদেশ-কানাডা অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টার জন্যই সিটি অব উইন্ডসর অথোরিটি আমাদের শহীদ দিবসকে সরকারি স্বীকৃতি প্রদান (প্রক্লেমেশন) করতে সম্মত হয়। ২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সিটি মেয়র ড. ড্রিউ ডিলকেন্স সিটিহলে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে এই প্রক্লেমেশন পাঠ করেন এবং এই দিনটিকে সিটি হলের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে একুশকে জাতিসংঘ প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রক্লেম করেছে। এ বছর সিটি অব উইন্ডসর দিবসটিকে প্রক্লেম করে স্থাপন করল আরেকটি মাইল ফলক। বাংলাদেশিদের জন্য একটি বিরাট অর্জন ও গর্বের বিষয়। শুধুমাত্র কানাডাতেই নয় বরং জাতিসংঘের পর উইন্ডসরের এই প্রক্লেমেশন সারা বিশ্বেই প্রণিধানযোগ্য ঘটনা হয়ে থাকবে।

উইন্ডসরের বাংলাদেশিরা এখানকার বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার কর্তৃক একুশকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সরকারি অর্জনের পর উদ্যোগী হয়েছে একটি শহীদ মিনার তৈরি করার জন্য। এটি হবে বাংলাদেশের ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে স্থাপিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অনুরণন। এর মধ্যে বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য স্থপতি সাদিয়া মুমু একটি রেপ্লিকা তৈরি করেছেন। অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে সিটি অব উইন্ডসর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ভাষা স্তম্ভ তৈরির জন্য নদী তীরবর্তী পার্কে একটি ভালো স্থান দিয়েছে। এখন প্রয়োজনীয় অর্থসংগ্রহের কাজ চলেছে। বিজয় দিবসের এই আয়োজনে সভাপতির ভাষণে জনাব সাইফুল ভূঁইয়া জানান এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচ হাজার ডলার অঙ্কের তিনটি প্রতিশ্রুতি পত্র পেয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এখনকার হাইকমিশন ও কানাডার সরকারকে আর্থিক অবদান রাখার অনুরোধ জানান।