ঠাকুরগাঁওয়ে লোভ দেখিয়ে র‍্যাফল ড্রয়ের টিকিট বিক্রি

>
  • দামি পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে র‍্যাফল ড্রয়ের টিকিট বিক্রি।
  • প্রতিদিন আয়োজকেরা তিন-চার লাখ টাকা আয় করছে।

‘মাথাই নষ্ট মামা। প্রতিদিন কয়েকটি দামি মোটরসাইকেলসহ কয়েক লাখ টাকার পুরস্কার। ভাগ্যে থাকলে আপনিও পেয়ে যেতে পারেন লোভনীয় পুরস্কার।’ র‍্যাফল ড্রয়ের টিকিট বিক্রির জন্য এভাবে মাইকিং করা হচ্ছে। এই প্রতারণা চলছে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায়। মানুষকে পুরস্কার জেতার স্বপ্ন দেখাচ্ছে আনন্দমেলার আয়োজকেরা। নিম্ন আয়ের মানুষ ও শিক্ষার্থীরা সহজেই তাদের এই ফাঁদে পা দিচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ীহাট এলাকায় গত ২০ এপ্রিল থেকে চলছে আনন্দমেলা। প্রথম দিন থেকেই ওই মেলায় শুরু হয়েছে র‍্যাফল ড্র। মেলার আয়োজক স্থানীয় একদল তরুণ। আয়োজকেরা দিনের বেলা মূল্যবান ও আকর্ষণীয় পুরস্কার দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মাইকিং করছে। রাতের বেলা ড্রয়ে কিছু না জুটলেও দমছে না তারা। ভাগ্য জয়ের আশায় আবারও টিকিট কিনছে। এভাবে যত টিকিট বিক্রি হচ্ছে, তত পকেট ভারী হচ্ছে আয়োজকদের। এতে পকেট খালি হচ্ছে সাধারণ মানুষের। দুই-এক দিনের মধ্যে এখানে হাউজি খেলা শুরু হবে।

জেলা প্রশাসন বলছে, তারা বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ীহাট এলাকায় ১৫ দিনের জন্য শুধু গ্রামীণ শিল্পসামগ্রী মেলার অনুমোদন দিয়েছে। কোনো ধরনের র‍্যাফল ড্র বা হাউজির অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

জেলা প্রশাসক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, সাধারণত মেলায় হাউজি-র‍্যাফল ড্রয়ের অনুমতি দেওয়া হয় না। লাহিড়ীহাট মেলায়ও দেওয়া হয়নি। এরপরও খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

২৮ এপ্রিল মেলা চত্বরে গিয়ে দেখা গেছে, মেলায় দুই-তিনটি দোকান বসানো হয়েছে। বিনোদনের জন্য বসানো হয়েছে ‘মহানন্দা অপেরা’ নামের একটি যাত্রার প্যান্ডেল। পাশে রয়েছে ‘ঢাকা একে সার্কাস’ নামে একটি প্যান্ডেল। পাশে নির্মাণ হচ্ছে একটি প্যান্ডেল। শ্রমিকের জানান, ওই প্যান্ডেলটি হাউজির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। মেলায় র‍্যাফল ড্র-ই মূল আকর্ষণ।

স্থানীয় লোকজন বলেন, র‍্যাফল ড্রয়ের প্রতিটি টিকিটের দাম ২০ টাকা। টিকিট বিক্রি করতে প্রতিদিন সকালে মেলা চত্বর থেকে শতাধিক ইজিবাইক ছুটছে উপজেলা সদরসহ আশপাশের উপজেলার বিভিন্ন স্থানে। প্রতিদিন অন্তত ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টিকিট বিক্রি হয়। সে হিসাবে প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ লাখ টাকার টিকিট বিক্রি হয়। রাত ১০টায় শুরু হয় র‍্যাফল ড্র।

জানা গেছে, র‍্যাফল ড্রর দামি পুরস্কার হিসেবে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তিনটি মোটরসাইকেল দেওয়া হয়। ওই তিনটি মোটরসাইকেলের দাম পড়ে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা। অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে আছে বাইসাইকেল, শাড়ি, লুঙ্গি, মুঠোফোন, বৈদ্যুতিক পাখা প্রভৃতি। এসব কিনতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো খরচ হয়। সে হিসাবে মেলার র‍্যাফল ড্রর পেছনে আয়োজকদের খরচ সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী সব খরচ বাদে আয়োজকদের প্রতিদিন ৩-৪ লাখ টাকা লাভ হচ্ছে।

২৮ এপ্রিল বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা সদরে ইজিবাইকে করে সততা র‍্যাফল ড্রর টিকিট বিক্রি করছিলেন মতিউর হক। তিনি তালিকা দেখিয়ে বলেন, ‘আজকে (শনিবার) পুরস্কার হিসেবে থাকবে দামি দামি পুরস্কারসহ চারটি মোটরসাইকেল। গত শুক্রবার প্রথম পুরস্কার ২ লাখ ও শেষে ১ লাখ টাকাসহ ৩৫টি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরস্কারের সংখ্যা বাড়বে। প্রতিদিন তিনি ইজিবাইকে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে আড়াই থেকে তিন হাজার টিকিট বিক্রি করেন।

লাহিড়ীহাট এলাকায় ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান সাইদুর রহমান। শনিবার মেলা প্রাঙ্গণের সামনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মেলা শুরুর দিন থেকে প্রতিদিন চারটা করে টিকিট কিনেছু। প্রতিদিন তিনটা মোটরসাইকেলসহ ৩৫টা পুরস্কার দিলেও মোর ভাগ্যে কিচ্ছু জুটিলনি। এ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ টাকার টিকিট কিনছু।’

গত শনিবার রাস্তার দাঁড়িয়ে থাকা ইজিবাইক থেকে টিকিট কিনছিল পাড়িয়া এলাকার স্কুলশিক্ষার্থী সাহেদুল ইসলাম। সাহেদুল বলে, ‘প্রতিদিন দুইটি করে টিকিট কিনেছি। তবে এখনো কোনো পুরস্কার পাইনি।’

লাহিড়ীহাট এলাকার বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘পুরস্কারের লোভে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষেরা তাদের আয়ের বড় অংশ লটারির টিকিট কিনে শেষ করছে। এমনকি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত বাড়ি থেকে চুরি করে টাকা নিয়ে সেই টাকায় লটারি কিনছে।