আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু: তালাবদ্ধ ছিল পাকিস্তানের সেই হাসপাতালের দরজা
বুধবার ভোরের আলো ফুটতেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালের মাতৃসদনে (ম্যাটারনিটি ওয়ার্ড) ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে পুড়ে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, উদ্ধারের জন্য তাঁদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।
হিবসা ওয়ালিদ নামের এক নারী পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (পিমস) হাসপাতালের ওই কক্ষের কাছেই ছিলেন। তাঁর ভাবি কয়েক দিন আগেই সেখানে সন্তান প্রসব করেছিলেন। হিবসা প্রথমে কারও চিৎকার শুনে ভেবেছিলেন কোনো রোগীর হয়তো মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু একটু পরই তিনি ধোঁয়া দেখতে পান।
এরপর দুজন মিলে নবজাতককে নিয়ে দ্রুত সেখান বের হয়ে যান। শিশুটি এতই ছোট যে তার এখনো কোনো নামও রাখা হয়নি।
হিবসা বলেন, ‘আমরা আমাদের জিনিসপত্রের কথা একবারও ভাবিনি। শুধু বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিই এবং দৌড়ে নিচে নেমে যাই।’ তিনি বলেন, ‘কিছু রোগী তো ওই রাতেই সন্তান প্রসব করেছিলেন। আমরা কীভাবে নিচে নেমে আসতে পেরেছিলাম, তা আমি নিজেও জানি না। সবকিছু কেমন যেন ঘোরের মতো লাগছিল।’
পিমস হাসপাতালটি ইসলামাবাদের অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতাল। এই হাসপাতালের মাতৃসদন ইউনিটের তৃতীয় তলার একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রণ (এসি) যন্ত্র থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ওই কক্ষে ১৫ জন নবজাতক ছিল। তবে তাদের মধ্যে মাত্র একজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।
৪০ বছর বয়সী খুররম মেহমুদ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, উদ্ধারকর্মীদের জন্য তাঁদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছি। ওর বয়স ছিল মাত্র তিন দিন।’
নিহত আরেক নবজাতকের মা জাওয়েরিয়া এএফপিকে জানান, মাতৃসদনের দরজাটি তালাবদ্ধ ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি দুই ঘণ্টা ধরে শুধু কাঁদছিলাম আর আর্তনাদ করছিলাম। পুলিশ চার ঘণ্টা পর এসে বলে, তারা তদন্ত করতে এসেছে।’
ক্ষুব্ধ এই মা প্রশ্ন করেন, ‘চিকিৎসকেরা কেন বাচ্চাদের সেখানে ফেলে রেখে গেলেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘উদ্ধারকারী দল আর পুলিশ নিপাত যাক! বাচ্চারা সেখানে পুড়ে মারা গেল, কিন্তু কেউ তাদের বাঁচাতে পারল না।’
হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক রানা ইমরান সিকান্দার বিবিসিকে বলেন, ওয়ার্ডের দরজা তালাবদ্ধ ছিল না, তবে সেখানে পাহারাদার ছিলেন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে এর আগে বাচ্চা চুরির ঘটনা ঘটেছে। শিশু চুরি ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
হিবসা ওয়ালিদ অভিযোগ করেন, বড় হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও পিমসে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। তিনি বলেন, ‘সেখানে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও নির্দিষ্ট নিরাপত্তাবিধি থাকার কথা ছিল। কিন্তু কেউ কিছুই করছিল না। সবাই শুধু প্রাণভয়ে ছুটছিল।’
সন্তান হারানো আরেক বাবা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, তিনি আট দিন ধরে ওই ওয়ার্ডে যাতায়াত করছিলেন। ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা বের হওয়ার সঠিক কোনো পথ ছিল না। তিনি বলেন, ‘সব কটি দরজা বন্ধ থাকত। বাচ্চাদের দেখার জন্য শুধু একটি দরজাই খোলা ছিল। আমরা বারবার বাচ্চাদের দেখতে আসব, এই ভয়ে তারা অন্য দরজাগুলোতে তালা দিয়ে রাখত।’
বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন, ঘটনার সময় সেখানে দায়িত্বরত কোনো কর্মী ছিলেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে বলেন, সাধারণ মানুষকে দরজা ভাঙতে হয়েছিল। আর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে উদ্ধারকর্মীরা জানালা ভাঙতে বাধ্য হয়েছিলেন।
আবদুল গফুর নামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে জানান, তিনি রোগীদের বাঁচাতে ভবনে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মাতৃসদন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘ভেতরে শুধু ঘন কালো ধোঁয়া ছিল আর রোগীরা আটকা পড়েছিলেন। উদ্ধারকারী দল প্রায় দুই ঘণ্টা পর সেখানে পৌঁছায়।’
তবে এএফপির খবর অনুযায়ী, ইসলামাবাদের চিফ কমিশনার সোহেল আশরাফ জানিয়েছেন, জরুরি ফোন পাওয়ার পরপরই উদ্ধারকারী দল তাত্ক্ষণিক ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
পাকিস্তানের রাজধানীর অন্যতম বড় হাসপাতাল হলো পিমস। এই হাসপাতালের মা ও শিশু স্বাস্থ্য ইউনিটে ১৫৬টি শয্যা রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনায় বিপুল প্রাণহানির জন্য মূলত দুর্বল অগ্নিনিরাপত্তা আইন, ত্রুটিপূর্ণ ভবন নির্মাণ বিধি এবং আইনের প্রয়োগ না থাকাকে দায়ী করা হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে করাচির একটি শপিং মলে অগ্নিকাণ্ডে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন। ওই ঘটনায় বেঁচে ফেরা মানুষেরা জানিয়েছিলেন, জরুরি বের হওয়ার পথ তালাবদ্ধ থাকার কারণেই মূলত এত বেশিসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তিনি এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গভীর শোক ও আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব আসলাম ঘৌরিকেও বরখাস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘শিশুদের সঙ্গে ঘটা এ ধরনের ঘটনা একেবারেই অপূরণীয় ক্ষতি।’