ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করেছেন কাশ্মীরের তিন নেতা। তাঁরা হলেন হুরিয়াত কনফারেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মীরওয়াইজ উমর ফারুক, আগা সৈয়দ হাসান মোসাভি আল সাফাভি ও ইমরান রেজা আনসারি। বৈঠকে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ দেশটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল দিল্লিতে এসেছে।
বৈঠকের পর ভারতের সংবাদ সংস্থাকে মীরওয়াইজ উমর ফারুক বলেন, কাশ্মীর থেকে একটি প্রতিনিধিদল দিল্লিতে এসেছে। তারা ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পেয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলা নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁরা সংহতি প্রকাশ করেছেন বলেও জানান তিনি।
মীরওয়াইজ উমর ফারুক বলেন, ‘এই অবিচার বন্ধ হওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ইরানের পাশাপাশি ফিলিস্তিন ও লেবাননে যা ঘটছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডকে তিনি অন্যায় বলে মন্তব্য করেন।
বৈঠকের মূল বার্তা সম্পর্কে মীরওয়াইজ উমর ফারুক বলেন, ‘সব ধর্মই সত্য ও ন্যায়কে সমর্থন করে। আর সেই কারণেই আমাদের দেখা উচিত কে সঠিক পথে আছে। এই মুহূর্তে ইরান সঠিক পক্ষে রয়েছে; তারা নিজেদের রক্ষা করছে এবং তাদের ওপর একটি যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
ইরানি দূতাবাসের অনুষ্ঠানে কাশ্মীরি নেতারা
মীরওয়াইজ উমর ফারুক ও ইমরান রেজা আনসারি দিল্লিতে ইরান দূতাবাস আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতেও অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের মিনাবে নিহত শিশুদের স্মরণে প্রদর্শনীটি আয়োজন করা হয়।
মীরওয়াইজ উমর ফারুকের এক মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে জানান, ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মহম্মদ ফাতহালির আমন্ত্রণে কাশ্মীরের নেতারা প্রদর্শনীতে যোগ দেন।
কাশ্মীর নিয়ে ভারত-ইরানের সংবেদনশীলতা
২০১৯ সালে ভারত জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে। এরপর কাশ্মীরের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে বড় পরিবর্তন আসে। একই সময়ে কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও ইরানের মধ্যে মতপার্থক্যও দেখা দেয়।
ভারত বরাবরই বলে আসছে, পুরো কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাকিস্তান-সংক্রান্ত কাশ্মীরের বিষয়টি ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যেই সমাধানযোগ্য বলে দিল্লির অবস্থান।
অন্যদিকে, ২০১৯ সালে বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পর ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কাশ্মীরের মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ভারত তখন এর প্রতিবাদ জানায়।
খামেনি ২০২০ সালের দিল্লির দাঙ্গা নিয়েও মন্তব্য করেন। ২০২৪ সালে গাজার পাশাপাশি ভারতের মুসলমানদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদের মুসলিম বলতে পারি না যদি আমরা মিয়ানমার, গাজা, ভারত বা অন্য যেকোনো স্থানে একজন মুসলিমের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে উদাসীন থাকি।’
তবে এসব মতপার্থক্যের মধ্যেও ভারত ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রয়েছে।
চলতি বছরের গোড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর কাশ্মীর ইস্যুতে তেহরানের অবস্থান নিয়ে ভারতে প্রতিক্রিয়া হয়। ইরানের দূতাবাসকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পোস্ট মুছে ফেলতে হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দিল্লিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কাশ্মীরি নেতাদের বৈঠক তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। একই সময়ে ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পেজেশকিয়ানের সাক্ষাৎও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
ভারত ও ইরানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়, তা পর্যবেক্ষণের বিষয়।