স্বপ্নভূমির নাম 'উইঘুরিস্তান'

যুবকেরা লম্বা দাড়ি রাখতে পারবে না; ১৮ বছর বয়সের নিচের কেউ মসজিদে নামাজ পড়তে পারবে না; যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে এবং অফিস-আদালতে চাকরি করে তারা রমজান মাসে রোজা রাখতে পারবে না; নারীরা ইসলামি পোশাক পরতে পারবে না; এমনকি যেকোনো ধরনের আলোচনা ও গানবাজনা করতে চাইলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ জিনজিয়াংয়ে উইঘুর সম্প্রদায়ের জন্য এমন শাসন জারি রেখেছে চীন সরকার। সরকারের এই নীতির বিরোধিতা বা সমালোচনা করলেই কঠোর শাস্তি।
চীনের উৎপীড়ন থেকে রেহাই পেতে উইঘুরদের একটা বড় অংশ অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় আগে কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তানসহ মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেখানেও ভালো নেই তারা। সেখানেও এখন তাদের প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায় চীন। ওই সব দেশগুলোতেও উইঘুরদের জীবন-যাপনে হস্তক্ষেপ করছে চীন।
তবু উইঘুর মুসলমানদের স্বপ্ন জিনজিয়াং প্রদেশে তারা এক স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা করবে যেখানে তারা ধর্মীয় ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। তারা সেই স্বপ্নের স্বাধীন ভূখণ্ডের নাম দিয়েছে ‘উইঘুরিস্তান’। অনেকে সেটাকে ‘ওয়াতান’ বা ‘মাতৃভূমি’ বলে ডাকে। সম্প্রতি বিবিসির এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে।
চীনের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তিব্বতের মানুষের সংগ্রামের কথা বিশ্ববাসী যতটা জানে, উইঘুরদের সংগ্রাম ও তাঁদের বঞ্চনার কথা ততটা গণমাধ্যমে আসেনি। খনিজ ও তেল সম্পদে পরিপূর্ণ এই প্রদেশটি কিছুতেই হাতছাড়া করতে রাজি নয় চীন। এ কারণেই তাদের নানা রকম চাপে রাখার চেষ্টা করছে দেশটি।
উইঘুরদের আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সর্বশেষ চেষ্টা চীন সরকার গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ১৯৪৯ সালে। ওই সময় সরকারের দমন-পীড়নে বাধ্য হয়ে ৬০ হাজারেরও বেশি উইঘুর জিনজিয়াং থেকে সোভিয়েত সীমান্ত পেরিয়ে কাজাখস্তানসহ মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। এখন মধ্য এশিয়ার এসব দেশে প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার উইঘুর বাস করে। এই সাড়ে তিন লাখ লোক কিছুদিন আগে পর্যন্ত চীনের উইঘুরদের স্বাধিকারের পক্ষে কথা বলতে পারত। কিন্তু এখন সে অবস্থাও সংকুচিত হয়ে আসছে।
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল পর্যন্ত কাজাখস্তানে দুই লাখ ২৩ হাজার ১০০, কিরগিজস্তানে ৪৮ হাজার ৫৪৩ এবং উজবেকিস্তানে ৫৫ হাজার ২২০ জন উইঘুর সদস্য বাস করে। ২০১০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে উইঘুরদের সংখ্যা ছিল এক হাজার, তুরস্কে ৪৫ হাজার ১০০, রাশিয়ায় তিন হাজার ৬৯৬ ও ইউক্রেনে ১৯৭ জন।
কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও উজবেকিস্তানে জ্বালানি, রাস্তাঘাট, গ্যাস পাইপলাইন, রেলওয়ে, বর্ডার ক্রসিং জোনসহ বিভিন্ন খাতে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে চীন। ফলে ওই অঞ্চলে চীন আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে। এতে বেকায়দায় পড়েছে সেখানকার উইঘুর মুসলমানেরা।

ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেসের মধ্য এশিয়ার প্রতিনিধি কাখারমান খোজামবারদি বলেন, ‘মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে দিনে দিনে চীনের প্রভাব বেড়ে যাচ্ছে। তারা ইতিমধ্যেই কাজাখস্তানের উইঘুর সম্প্রদায়কে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। এখন কাজাখস্তানে বসে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে যে এ বিষয়ে আলোচনা করতে যাবে, তাকে শাস্তি পেতে হতে পারে।’
কাখারমান খোজামবারদি জানান, তিনি একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। বেশ কয়েক বছর ধরে দলটির নিবন্ধন নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু কাজাখস্তান কর্তৃপক্ষ তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছে। অনেক দিন থেকেই তিনি উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তানে ভ্রমণ করতে পারছেন না। তিনি জানান, যখনই তিনি ওই দেশ দুটিতে সফরের জন্য এগিয়ে গেছেন, ঠিক তখনই সীমান্ত থেকে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চীন থেকে কাজাখস্তানে যাওয়া ৪৩ বছর বয়সী উইঘুর নারী মালিকা (ছদ্মনাম) বলেন, ২০০৫ সালে সরকার-বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তাঁরা বাবা ও ভাইকে কারাবন্দী করা হয়। সে সময় তাঁকেও মাথায় স্কার্ফ না পড়ার জন্য হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে ওই বছরই তিনি জিনজিয়াং থেকে কাজাখস্তানে পালিয়ে এসেছিলেন।
মালিকা আরও বলেন, কাজাখস্তানে গিয়ে তিনি রাজনীতিতে নতুন একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। কাজাখস্তান তাঁদের চীনের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে-এমন আশঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, ‘কাজাখস্তানের একজন নাগরিককে বিয়ে করলেও মন থেকে ভয় কাটছে না। আমার বাইরে যেতে ভয় করে। কাজাখস্তানের সামনেই চীনের দরজা হওয়ায় শরণার্থী হয়েও কোথাও কোনো নিরাপত্তা নেই।’
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি জিনজিয়াংয়ে উইঘুর সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি লম্বা দাঁড়ি রাখায় তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন চীনের একটি আদালত। ২০১০ সাল থেকে তিনি দাঁড়ি রাখা শুরু করেছিলেন। শুধু তাই নয়, ওই ব্যক্তির স্ত্রী বোরখা পরতেন বলে তাঁকেও দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস অ্যাডভোকেসি অর্গনাইজেশনের মুখপাত্র দিলক্ষাত রক্ষিত বলেন, ‘চীনের কোনো নাগরিক যদি ফ্যাশনের জন্য দাঁড়ি রাখেন তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। তিনি স্বাধীনভাবেই চলাফেরা করতে পারেন। কিন্তু কোনো উইঘুর সদস্য যদি দাঁড়ি রাখেন তাহলে তাঁকে ধর্মীয় উগ্রপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের জিনজিয়াংয়ে সরকারের দমন-পীড়নের মাত্রা গত কয়েক বছরে অতিমাত্রায় বেড়ে গেছে। সম্প্রতি ২০১৪ সালেও চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি রেলওয়ে স্টেশনে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ২৯ জন নিহত ও ১৩০ জন আহত হয়। এ ছাড়া জিনজিয়াংয়ে একটি বিপণিকেন্দ্রে হামলায় উইঘুরদের ৩১ জন নিহত হয়। এ ঘটনায় উইঘুররা নিহত হলেও, ঘটনাটির জন্য উইঘুরদেরই দায়ী করা হয়। কিন্তু উইঘুর মুসলমানরা এটাকে তাদের দমন-নিপীড়নের অংশবিশেষ বলে মনে করে। চীনের দাবি, উইঘুররা জিহাদি নেটওয়ার্কের সম্পর্কযুক্ত। বেশ কিছু তরুণ উইঘুর কট্টর ইসলামপন্থীও হয়ে গেছে।
কাজাখস্তানের আলমাতিতে উইঘুর কোয়ার্টার মসজিদের ইমাম সদরুদ্দিন আয়ুপভ বলেন, ‘সব সমাজেই এখন কট্টরপন্থী দেখা যায়। কিন্তু মানুষ আসলে জানে না বা বুঝতে পারে না যে, প্রকৃত ইসলাম কী! এতে ধর্ম সম্পর্কে অনেক মানুষ ভ্রান্ত ধারণা পাচ্ছে।’ জিনজিয়াংয়ে উইঘুররা কেন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তো ওখানে থাকি না। হতে পারে, তাঁরা সেখানে অসহনীয় দমন-পীড়নের মধ্যে আছে। এমন হতে পারে যে, দমন-পীড়নে তারা তাদের বাবা বা সন্তানদের হারিয়েছেন।’ তিনি বলেন, তরুণদের সঠিক পথে আনতে হলে তাঁদের টেনিস-বাস্কেটবলসহ খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।
বহু বছর নির্যাতিত হওয়ার পরও চীনের উইঘুর মুসলমানরা এখনো জিনজিয়াংকে নিজেদের স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আবাসভূমি বা ওয়াতান করার স্বপ্নটি দীর্ঘদিন থেকেই লালন করে আছে। শুধু জিনজিয়াংয়ের উইঘুররাই নয়, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তানের উইঘুররাও এই স্বপ্ন দেখছেন। তাঁদের এ স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা দেখতে দমন-পীড়নের ভেতর দিয়েই তাদের অপেক্ষা করা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনো পথ খোলা নেই।