ড্রয়ের আক্ষেপে অভিষেক হামজার
🔴 বাংলাদেশ ০-০ ভারত 🔵
বিরতির সময় দুই দল ড্রেসিংরুমে যাওয়ার সময় ক্যামেরা খুঁজল তাঁদের দুজনকে—হামজা চৌধুরী আর সুনীল ছেত্রী। ছেত্রীর ঠিক পেছনেই দেখা যাচ্ছিল হামজাকে।
একসঙ্গে দুজনকে দেখে দর্শকেরা অভিনন্দন জানালেন। মাঠে দুজনই চেষ্টা করেছেন নিজ দলকে যতটা সম্ভব উজ্জীবিত রাখতে। কিন্তু গোল পায়নি কোনো দলই। বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচটা যেমন শেষ হলো গোলশূন্য, হামজা-ছেত্রী দ্বৈরথও থেকে গেল অমীমাংসিত।
আট মাস পর অবসর থেকে ফেরা ভারতের ছেত্রী বাংলাদেশের পোস্টে একটিমাত্র শট নিয়েছেন প্রধমার্ধে। নিজের উপস্থিতি ঠিক সেভাবে বোঝাতে পারেননি। দ্বিতীয়ার্ধেও তেমন কিছু নয়। ৮৫ মিনিটে তো তাঁকে তুলেই নেন ভারত কোচ। ছেত্রী পারেননি দলকে জেতাতে।
বাংলাদেশের হামজাও পারেননি সেটা। কিন্তু কাল শিলংয়ে বাংলাদেশ যা করেছে, তার অনেকটা কৃতিত্ব দিতে হবে হামজাকেই। মাঠে তাঁর উপস্থিতি বোঝা গেছে পুরোপুরি। জাদুকরি কোনো মুহূর্তের হয়তো জন্ম দিতে পারেননি, কিন্তু নিজের একটা দাপুটে প্রভাব রেখেছেন মাঠে।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের জার্সিতে প্রথম ম্যাচে নতুন সতীর্থদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজের কাজটা করে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর উপস্থিতি দলকেও উজ্জীবিত করেছে দারুণভাবে। কর্নার নিয়েছেন, কয়েকটি ভালো থ্রু দিয়েছেন। গোলের রাস্তাও খুলেছিল তাতে। কিন্তু অন্যদের ব্যর্থতায় গোল পায়নি বাংলাদেশ।
কখনো ফাঁকা পোস্ট, কখনো শুধু গোলরক্ষক সামনে। লক্ষ্যভেদে একটু নিখুঁত হতে পারলে প্রথমার্থেই গোটা চারেক গোল পেতে পারত বাংলাদেশ। গোল আসা উচিত ছিল কিক–অফের পরই, যখন কিনা ম্যাচ পেরিয়েছে মাত্র ১৫ সেকেন্ড। ভুল করে বাংলাদেশের মিডফিল্ডার মজিবর রহমানের কাছে বল দিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের গোলকিপার বিশাল কাইথ। পোস্ট খালি পেয়েও মজিবর পোস্টের পাশের জালে বল মেরেছেন।
এর পরপরই আরেকটি সুযোগ, ডান প্রান্ত শেখ মোরছালিনের ক্রস পেয়েছিলেন বক্সে দাঁড়ানো শাহরিয়ার ইমন। তাঁর হেড ভারতের পোস্টের পাশ ঘেঁষে চলে যায় বাইরে। ভারতের ডিফেন্ডার শুভাশীষের পায়ে মেরে সুযোগ হারিয়েছেন হৃদয়। অথচ একটু উঁচুতে শট নিলেই গোল হতে পারত! তখন পর্যন্ত ভারতের পোস্টে বাংলাদেশ চারটি শট নিয়েছে, ভারত একটিও নয়।
জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ১৫ হজার দর্শক তখন শঙ্কায়। ভারত বেঁচে যাচ্ছে বারবার! ভারতের সমর্থকেরা দলকে উজ্জীবিত করতে স্লোগান তুলছিলেন তখন।
কাজ হয়নি তাতে। বাংলাদেশ আবারও পেয়েছে সুযোগ। হামজার থ্রু ধরে মজিবর তা কাজে লাগাতে পারেননি। পরপরই বাঁ প্রান্ত থেকে মোরছালিনের ক্রস বক্সের ভেতরে পড়েছিল। শাহরিয়ার ইমন ছিলেন অরক্ষিত। শূন্যে লাফিয়ে বলটা মাথায় ঠিকমতো ছোঁয়াতে পারলেই গোল! কিন্তু ঠিকমতো হেডটাই নিতে পারেননি ইমন।
গোল যখন আসি আসি করছিল, ঠিক তখনই জামালের জায়গায় অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামা সেন্টারব্যাক তপু বর্মণ চোট পেয়ে স্ট্রেচারে চড়ে মাঠ ছাড়েন। তাঁর বদলি হিসেবে নামেন ডিফেন্ডার রহমত মিয়া, নামেন অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেই। রক্ষণ সংগঠনের বাঁধনটা তখন একটু ঢিলে হয়ে যায় বাংলাদেশের।
হামজাকে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে হয় রক্ষণে এবং তিনি তাতে পুরোপুরি সফলও। কয়েকটি নিখুঁত ট্যাকলেই বুঝিয়েছেন, কেন তিনি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন। কোচ তাঁকে শুরুতে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর আসল জায়গা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে। রক্ষণের কাজেই তাঁর সুখ্যাতি বেশি। নামের প্রতি হামজা ষোলো আনা সুবিচারই করেছেন বাংলাদেশের হয়ে নিজের প্রথম ম্যাচে।
ভারতের জন্য গোল করাটা তাই কঠিন হয়ে যায়। প্রথমার্ধের মাঝামাঝি স্বাগতিক দল প্রথম শট নেয় বাংলাদেশের পোস্টে। ফরোয়ার্ড ফারুকের ক্রসে মিডফিল্ডার লিস্টন কোলাচো বক্সে ভলি করলেও শটে জোর ছিল না। বাংলাদেশের গোলকিপার মিতুল মারমা সহজেই বল তুলে নেন। পরক্ষণে মিতুল আরেকবার বাঁচিয়েছেন বাংলাদেশকে। বাঁ প্রান্ত থেকে আসা ক্রসে হেড করেন ভারতের স্ট্রাইকার উদান্ত। মিতুল বল ঠেকানোর পর ফিরতি বলে শট নেন ফারুক। এবারও মিতুলকে পরাস্ত করা যায়নি।
দ্বিতীয়ার্ধে প্রাধান্য বিস্তার করে খেলেছে ভারত। বাংলাদেশের ডিফেন্সিভ থার্ডে পাসও খেলেছে তারা। কিন্তু সেখানে হামজার মতো খেলোয়াড় ছিলেন, রক্ষণকাজটা তাই বাংলাদেশ ভালোভাবেই করে গেছে। মিতুলও পোস্টের নিচে ছিলেন আস্থার প্রতীক হয়ে। ভারত গোল পায়নি দ্বিতীয়ার্ধে চাপ তৈরি করেও। ফরোয়ার্ড ফারুককে তুলে নেন তাঁদের কোচ। তবু গোলের দেখা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ ড্র।
ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ সর্বশেষ খেলেছিল ২০১৯ সালে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচ। কলকাতার সল্টলেকে সেই ম্যাচে এগিয়ে থেকেও ১-১ ড্র করতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। পাঁচ বছর পর ভারতের মাটিতে আবারও ভারতের সঙ্গে ড্র। এবার এশিয়ান কাপে বাছাইপর্বের প্রথম ম্যাচটা থাকল গোলশূন্য।
তবে বাংলাদেশের একটা আক্ষেপ থাকছেই। প্রথমার্ধে এতগুলো সুযোগ না হারালে হয়তো জয়ের উল্লাস করতে করতেই ছাড়া যেত মাঠ। আবার এ–ও স্বস্তির, ভারতে এসে ভারতের কাছে হারতে তো হয়নি! হামজার অভিষেক জয়ে না হোক অন্তত ড্রয়ে তো উদ্যাপন করা গেছে। আর এই ড্র ভারতের কাছে হারের চেয়ে কম নয়।
নিজেদের মাটিতে এই ফল মানতে পারেননি ভারতের কোচ মানোলো মার্কেজ। অন্যদিকে অখুশি মনে হয়নি হাভিয়ের কাবরেরাকে। তাঁর জন্য এই ড্র তো জয়ের চেয়ে কম নয়!