রাফিনিয়া: ‘ওই কীরে, ওই কীরে, মধু, মধু’

গোলের পর রাফিনিয়ার উদ্‌যাপনরয়টার্স

ঢাকায় সম্প্রতি এক তরমুজ বিক্রেতা ভাইরাল। তরমুজ কেটে ভেতরের লাল অংশ বের করে রসালো কণ্ঠে হাঁক দেন, ‘ওই কীরে, ওই কীরে, মধু, মধু।’ তরমুজটি পাকা, রসালো ও মিষ্টি—এটা বোঝাতে সেই বিক্রেতার এই সংলাপ এখন অনেকের মুখে মুখে।

ফুটবল খেলার সঙ্গে তরমুজের কোনো সংযোগ নেই। তরমুজ দেখতেও ফুটবলের মতো গোলাকার নয়। কিছুটা চ্যাপটা ও ডিম্বাকৃতির। কিন্তু সেই বিক্রেতার ভাইরাল হওয়া সংলাপের সঙ্গে ফুটবলারদের পারফরম্যান্স চাইলে মিলিয়ে নিতে পারেন। যেমন ধরুন, রাফিনিয়া। চলতি মৌসুমে ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গারের পারফরম্যান্স দেখে তাঁর ভক্তরা হাঁক দিতেই পারেন—‘রাফিনিয়া, ওই কীরে, ওই কীরে, মধু, মধু!’

আরও পড়ুন

রাফিনিয়া-মধুর সাম্প্রতিকতম ফোঁটাটি আজ পড়েছে কলম্বিয়ার জালে। পেনাল্টি থেকে গোল করায় অবশ্য সেই ‘মধু’কে তেমন আহামরি ‘মিষ্টি’ বলবেন না অনেকেই, কিন্তু ব্রাজিলের ২-১ গোলে জয়ের স্কোরলাইন বিচারে ওই গোলের গুরুত্বও অসামান্য। আর পেনাল্টি থেকে গোল করাটা মোটেও সহজ নয়। দূরত্ব যতই মাত্র ১২ গজ হোক না কেন, স্নায়ুচাপ সামলে লক্ষ্য ভেদ করতে হয় এবং রাফিনিয়া সেটাও করেছেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।

দুর্দান্ত এক মৌসুমই কাটছে রাফিনিয়ার
রয়টার্স

শুধু তা–ই নয়, অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড মারকিনিওসের হাতে থাকলেও রাফিনিয়াই এখন ব্রাজিল দলের নেতা। প্রমাণ লাগবে? যোগ করা সময়ে বদলির ডাক পাওয়া ভিনিসিয়ুস যখন কলম্বিয়ার এক ডিফেন্ডারের বিরুদ্ধে নালিশ করতে গিয়েছিলেন রেফারির কাছে, তখন উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে ভিনিকে মাঠ থেকে বের করে দিয়েছেন কে? রাফিনিয়া। বেশি কথা বলতে গিয়ে কিংবা সময় নষ্ট করে ভিনি হলুদ কার্ড দেখলে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পরের ম্যাচে খেলতে পারবেন না—এই চিন্তা রাফিনিয়ার মাথায়ই সবার আগে খেলেছে। ভেতরে নেতৃত্বগুণ থাকলে এসব বিষয় আপনাই বেরিয়ে আসে পাকা তরমুজ কাটার পর উঁকি দেওয়া লাল অংশের মতোই। রাফিনিয়ার এই ‘গেম অ্যাওয়ারনেস’দেখেও ব্রাজিল সমর্থকদের মুখে ওই বুলিটি ফুটতে পারে, ‘মধু! মধু!’

আরও পড়ুন

সেটা অবশ্য এক ফোঁটা। রাফিনিয়ার এ মৌসুমটি আসলে আস্ত এক মধুর চাক। বার্সেলোনার হয়ে গোল করছেন, করাচ্ছেন; ব্রাজিলের হয়েও গোল করছেন ও করাচ্ছেন; ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে বড় ম্যাচগুলোয় গড়ে দিচ্ছেন পার্থক্যও। প্রমাণ দিচ্ছে ট্রান্সফারমার্কেটের পরিসংখ্যান। এ মৌসুমে বার্সার হয়ে ৪২ ম্যাচে ২৭ গোলের পাশাপাশি ২০ গোল করিয়েছেন। আর ব্রাজিলের হয়ে ৫ ম্যাচে গোল তাঁর ৪টি, করিয়েছেন ১টি। সব মিলিয়ে এ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৪৭ ম্যাচে করেছেন ৩১ গোল, বানিয়েছেন ২১টি। অর্থাৎ এ মৌসুমে গোল করা ও গোল করানো মিলিয়ে ৪৭ ম্যাচে ৫২ গোলে অবদান রাফিনিয়ার। তাঁর বার্সা সতীর্থ লামিনে ইয়ামাল সাধেই তো আর বলেননি, এবার ব্যালন ডি’অর হয় তিনি অথবা রাফিনিয়া জিতবেন। দিয়ারিও স্পোর্তকে ইয়ামাল বলেছেন, ‘আমাদের মধ্যে যেকোনো একজন জিতবে, সেটা যেই হোক। রাফিনিয়াকে নিয়ে আমি খুব খুশি। সব সময় তাকে বলি, তার পরিবর্তনটা অবিশ্বাস্য। খুব ভালো সময় কাটছে তার।’

ব্রাজিল দলের নেতাও হয়ে উঠেছেন রাফিনিয়া
রয়টার্স

চ্যাম্পিয়নস লিগে এবারের মৌসুমে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১১ গোল রাফিনিয়ার। অথচ নিখাদ স্ট্রাইকার তিনি নন, মূলত উইঙ্গার, মাঝেমধ্যে ফরোয়ার্ড হিসেবেও খেলেন। কিন্তু এটুকু দিয়েই গোল করায় তাঁর পেছনে পড়েছেন রবার্ট লেভানডফস্কি, হ্যারি কেইন, আর্লিং হলান্ড, কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো স্ট্রাইকারেরা। এবার চ্যাম্পিয়নস লিগে এখন পর্যন্ত ৫ গোল বানানো রাফিনিয়ার ওপরে এ তালিকায় শুধু বায়ার্ন মিউনিখের মিডফিল্ডার ইয়োশুয়া কিমিখ (৬)। এবার ব্যালন ডি’অর জয়ে ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি কেন রাফিনিয়াকে হ্যারি কেইন এবং মোহাম্মদ সালাহর চেয়ে এগিয়ে রাখেন, সেটা কিছুদিন আগে ব্যাখ্যা করেছেন সিবিএস স্পোর্টসকে, ‘আমি মনে করি রাফিনিয়া এগিয়ে। সে চ্যাম্পিয়নস লিগে যা করছে, সেটার জন্য এগিয়ে...মোহাম্মদ সালাহ, কেইন ও দেম্বলেও শক্ত দাবিদার। কিন্তু ব্যাপারটি নির্ভর করে চ্যাম্পিয়নস লিগে কেমন করছেন, তার ওপর। সেটা লিগ জয়েরও ঊর্ধ্বে। রাফিনিয়া অনেক গোল পেয়েছে এবং পেনাল্টি থেকে গোল মাত্র একটি।’

আরও পড়ুন

লা লিগায় ২৮ ম্যাচে ১৩ গোল নিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় চারে রাফিনিয়া। তাঁর দল বার্সা অবশ্য পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে। এবার ক্লাবটির ‘ট্রেবল’ জয়ের অনুসন্ধানে ইয়ামালের পাশাপাশি রাফিনিয়াও অন্যতম চাবিকাঠি। গত ১২ মার্চ অপ্টা অ্যানালিস্ট জানিয়েছিল, সেই মুহূর্ত পর্যন্ত ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে রাফিনিয়াই সর্বোচ্চ ১১৬টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন। মাঝের এ কয় দিনে এই পরিসংখ্যান যে আরও সমৃদ্ধ হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। ঠিক যেভাবে চৈত্রের গরমে পাকা রসালো তরমুজ মুখে দিয়ে রসনাবিলাসীরা বলেন, ‘মধু, মধু, রাফিনিয়ার পারফরম্যান্সও তেমনি মধু ঢেলে দিচ্ছে বার্সা ও ব্রাজিলের তৃষ্ণার্ত সমর্থকদের জিবে।

যদিও রাফিনিয়ার এসব নিয়ে ভাবনা নেই। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ব্রাজিলের আজকের ম্যাচটি দলের জন্য ‘বাঁকবদলের ছিল’ বলে মনে করেন রাফিনিয়া। ম্যাচ শেষে টিভি গ্লোবোকে বলেছেন, ‘এই জয় দরকার ছিল। শুধু খেলোয়াড় কিংবা স্টাফদের জন্য নয়, ভক্তদের জন্যও। অতীতে কী হয়েছে, তা নিয়ে ভাবার দরকার নেই। ভবিষ্যতে তাকাতে হবে। এই ম্যাচটা শেষ হয়েছে, এখন সামনে আর্জেন্টিনা। এই বাঁকবদলটা দরকার ছিল আমাদের।’

বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। রাফিনিয়া এই ম্যাচে নিশ্চয়ই নিজেকে নিংড়ে দিতে চান? ঠিক যেভাবে বড় কোনো তরমুজ কেটে বিক্রেতা তাঁর ভেতরের লাল টকটকে অংশ দেখিয়ে হাঁক দেন, ‘আগুন! আগুন! ফায়ার সার্ভিস ডাক দে...’—রাফিনিয়াও নিশ্চয়ই সেদিন আগুনের শিখা হয়ে ওঠার অপেক্ষায়। যে শিখায় সুখের পোড়া পুড়ে ভক্তরা বলে উঠবেন, ‘ওই কীরে, ওই কীরে, মধু! মধু!’