প্রয়াত ফুটবলার মনুর জন্য তাঁর মেয়ের সেই ভালোবাসা

আশির দশকের সেই দুর্দান্ত মনু। ছবি: সংগৃহীত
আশির দশকের সেই দুর্দান্ত মনু। ছবি: সংগৃহীত
>

মেয়ের ভালোবাসাটা হাতে দেওয়ার আগেই অন্য ভুবনের বাসিন্দা হয়েছেন মনির হোসেন মনু। মেয়ে সেই ভালোবাসার মালিকানা দিয়ে গেছেন তাঁর ভক্তদের।

হাতঘড়িটি মনির হোসেন মনুর জন্যই এনেছিলেন তাঁর সৌদি আরবপ্রবাসী কন্যা মেঘলা। যেদিন মনু চলে গেলেন পরপারে, সেদিনই সকালেই দেশে এসেছিলেন তিনি। হজরত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সোজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) গেলেন, বাবার বিছানার পাশে দাঁড়ালেন। বাবার চোখের দিকে তাকালেন। মনুও চলে গেলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই। যেন মেয়ের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন তিনি। সৌদি আরব থেকে খুব শখ করে আনা হাতঘড়িটি আর বাবার হাতে বেঁধে দিতে পারলেন না মনু-কন্যা।

গত ২০ এপ্রিল শুক্রবার সবাইকে কাঁদিয়ে পৃথিবী ছেড়েছেন ঢাকার ফুটবলে একসময়ের জনপ্রিয় তারকা মনু। মোহামেডানের সমর্থকদের কাছে ‘কালো চিতা’ হিসেবে পরিচিতি মনু খুব অল্প দিনেই পেয়েছিলেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। ১৯৮৬ লিগে আবাহনীর বিপক্ষে প্রায় মাঝমাঠ থেকে করা দুর্দান্ত সেই গোলটিই মোহামেডান-সমর্থকদের মাঝে তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। ১৯৮৫ সালের লিগেও আবাহনীর বিপক্ষে আরেকটি দুর্দান্ত গোল তিনি করেছিলেন শ্রীলঙ্কান গোলরক্ষক চন্দ্রসিরিকে বোকা বানিয়ে। প্রচণ্ড গতি আর ড্রিবলিং সক্ষমতা দিয়ে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন অন্য মাত্রার এক ফুটবলার হিসেবে। কিন্তু চোট আর নানাবিধ কারণে নিজের ক্যারিয়ারটা লম্বা করতে পারেননি তিনি। তিনি যে এ দেশের ফুটবলের এক বড় আক্ষেপের নাম, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেটিই নতুন করে প্রমাণ করে গেলেন তিনি। মাত্র কয়েক মৌসুম খেলে মনু কতটা জনপ্রিয় হয়েছিলেন, সেটার প্রমাণ মিলেছে তাঁর মৃত্যুর দিন। কালবৈশাখী উপেক্ষা করেও তাঁর নিজের এলাকা মুগদায় কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন প্রিয় মনুর নামাজে জানাজায়।

মেয়ে মনুর জন্য এনেছিলেন এই ঘড়িটি। কিন্তু সেটা হাতে বাঁধ হয়নি তাঁর। ছবি: ফেসবুকে থেকে নেওয়া
মেয়ে মনুর জন্য এনেছিলেন এই ঘড়িটি। কিন্তু সেটা হাতে বাঁধ হয়নি তাঁর। ছবি: ফেসবুকে থেকে নেওয়া

বাবার জন্য আনা হাতঘড়িটি বাবার হাতে বেঁধে দিতে পারলে দারুণ খুশি হতেন মনু-কন্যা মেঘলা। কিন্তু বাবার ফুটবল-ক্যারিয়ারের মতোই হাতঘড়িটি তাঁর জন্য এক আক্ষেপ হয়ে রইল। কিন্তু মেঘলা সেই হাতঘড়িটি দিয়ে গেছেন মোহামেডান-সমর্থকদের সংগঠন ‘মহাপাগলে’র কাছে। যারা এই যুগেও হৃদয়ে ধারণ করেন মোহামেডান ও দেশের ফুটবলের জন্য আবেগ। এই প্রজন্মের কাছে মনুকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতেও যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন।

১৯৯০ সালের পর মনু হারিয়েই গিয়েছিলেন দেশের ফুটবলপ্রেমীদের দৃষ্টি থেকে। দীর্ঘদিন কোনো খোঁজই ছিল না তাঁর। মুগদার বাড়িতে নিভৃত জীবনই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। কী অভিমানে, কেউ জানে না। মোহামেডান সমর্থকদের সংগঠন ‘মহাপাগলে’র উদ্যোগেই সামান্য তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে খুঁজে বের করা হয়। মনু আবার আসেন জনসমক্ষে। মোহামেডান-সমর্থকদের পুরোনো প্রজন্মকে আবারও মনে করিয়ে দেন আশির মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার মাঠে তাঁর দুর্দান্ত পদচারণ।

মেয়ে মেঘলা আবেগভরেই ‘মহাপাগল’দের হাতে তুলে দিয়েছে বাবার প্রতি তাঁর ভালোবাসা। মহাপাগলের প্রতিষ্ঠাতা টি ইসলাম তারিক সেই ঘড়ি গ্রহণ করেছেন মনুর স্মৃতি হিসেবেই।

যদি কোনো দিন দেশে ফুটবল নিয়ে কোনো জাদুঘর করা হয়, তারিক হাতঘড়িটি সেই জাদুঘরে জমা দেবেন—তাঁর পরিকল্পনা এমনই। ঘড়িটির নিচে লেখা থাকবে, ‘ফুটবলার মনুর প্রতি তাঁর মেয়ের ভালোবাসা।’