সশস্ত্র প্রতিরোধে বগুড়া

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নিরীহ বাঙালি অসীম সাহসে মুখোমুখি হয়েছিল পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত বাহিনীর বিরুদ্ধে। ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়। বীরত্বপূর্ণ সেসব সম্মুখযুদ্ধ উজ্জ্বল হয়ে আছে স্বাধীনতার স্বপ্নে, আত্মত্যাগের মহিমায়। মুক্তিযুদ্ধের বহুল আলোচিত কয়েকটি যুদ্ধ নিয়ে প্রথম আলোর এ আয়োজন।

গাজীউল হক

১৯৭১ সাল। ২৫ মার্চ দিবাগত রাত সাড়ে তিনটা। এমদাদুল হক নামে এক তরুণ এসে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। এখনই থানায় যেতে হবে, জরুরি খবর আছে। খবর এসেছে পাকিস্তানি সেনা বগুড়ার দিকে এগিয়ে আসছে। দুই মিনিটে তৈরি হয়ে নিলাম। চিন্তাভাবনার ফুরসত নেই। ছুটতে হলো। ডা. জাহিদুর রহমান (এমপি) তাঁর বাড়ির দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিলেন। ডাকতেই নেমে এলেন। তাঁকে নিয়েই ছুটতে ছুটতে থানায় হাজির হলাম।

আধো আলো আধো অন্ধকারে বগুড়া কোতোয়ালি থানার আঙিনায় ২০-২৫ জন লোক দাঁড়িয়ে। সামনে এগিয়ে এলেন মকবুল সাহেব (ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের অফিসার)। তিনি জানালেন, ওয়্যারলেসে খবর এসেছে পাকিস্তানি সেনারা রাজারবাগ এবং পিলখানা আক্রমণ করেছে। রাজারবাগ এবং পিলখানায় প্রতিরোধ চলছে। এদিকে রংপুর থেকে পাকিস্তানি সেনা বগুড়ার দিকে এগিয়ে আসছে।

নিজেকে ভীষণ অসহায় বোধ করছিলাম। আমি নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলাম না। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাও নই। সুতরাং এ অবস্থায় আমার দায়িত্ব কতখানি বুঝতে না পেরে বিব্রতবোধ করছিলাম। ডা. জাহিদুর রহমানের অবস্থাও আমার চেয়ে বিশেষ সুবিধার নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি সম্পূর্ণ নতুন। ’৭০ সালেই নির্বাচনের আগে সক্রিয় রাজনীতিতে এসেছেন এবং পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবুও কর্তব্য সম্বন্ধে যেন হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠলেন, বললেন, ‘এখন সবাইকে ডেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নেই। প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান। সুতরাং আপনাকেই সিদ্ধান্ত দিতে হবে’। মকবুল সাহেব, অফিসার ইনচার্জ নিজামউদ্দিন সাহেব এবং থানার অন্য পুলিশ কর্মচারীদেরও একই মত। সব দুর্বলতা ঝেড়ে ফেললাম। হঠাৎই যেন মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘অল রাইট, আই এসিউম দ্য কমান্ড। উই শ্যাল রেসিস্ট দ্য পাকিস্তানি আর্মি’।

কিছুক্ষণের জন্য আলোচনা হলো, বগুড়া থেকে আট মাইল দক্ষিণে আড়িয়া ক্যান্টনমেন্ট। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট উত্তরে। মকবুল সাহেব বললেন, ‘আড়িয়াতে পাকিস্তানি সেনার সংখ্যা খুব বেশি নয়। সুতরাং তারা হঠাৎ কিছু করবে না। তা ছাড়া ওয়্যারলেসে খবর এসেছে রংপুর থেকে পাকিস্তানি আর্মি আসছে’। মনে পড়ল ২৫ মার্চের সন্ধ্যার সময় ছাত্রলীগের সামাদ এবং [ছাত্র] ইউনিয়নের রেজাউর রহমান ডিংগুর নেতৃত্বে বগুড়া আড়িয়া সড়কের মাঝখানে কটকির সংকীর্ণ পুলের ওপর গাছ কেটে ফেলে এবং ইটের স্তূপ সাজিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল। সুতরাং শহরের উত্তরে বগুড়া-রংপুর সড়কে ব্যারিকেড বাধা পেলে হয়তো রাতে তারা আর এগোবে না। শহরবাসীর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অন্তত সকাল পর্যন্ত সময় চাই। (আমাদের চিন্তায় ভুল ছিল না, সেটা পরে প্রমাণিত হয়েছে। শহর থেকে তিন মাইল উত্তরে মাটিডালীতে ব্যারিকেড দেখে পাকিস্তানি সেনা রাতে শহরে ঢুকতে সাহস করেনি)।

দারোগা নিজামউদ্দীন এবং নুরউল ইসলাম তিনজন কনস্টেবল সঙ্গে নিয়ে রাইফেল হাতে নির্দেশমতো আজাদ গেস্টহাউসের ছাদে ঘাঁটি গাড়লেন। পাকিস্তানি সেনা রেললাইন পার না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আক্রমণ চালাবেন না, এই নির্দেশ তাঁদের দেওয়া হলো। পুলিশ ফোর্সের অন্যদের অস্ত্রশস্ত্রসহ পুলিশ লাইনসে পাঠিয়ে দিলাম। মকবুল সাহেব চলে গেলেন ওয়্যারলেসে আর কোথাও যোগাযোগ করা যায় কি না, সে চেষ্টা চালাতে।

থানা থেকে বেরোতেই দেখি, থানার গেটে ২০-২৫ জন ছাত্র-যুবক জমায়েত হয়েছে। খবর তারাও পেয়েছে। তাদের নিয়ে ডা. জাহিদুর রহমান এবং আমি ছুটলাম উত্তর দিকে। যত দ্রুত সম্ভব মাটিডালী পৌঁছাতে হবে। ব্যারিকেড দিয়ে প্রথম বাধার সৃষ্টি করতে হবে। শেষ রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙে স্লোগান উঠল ‘জাগো জাগো বীর বাঙ্গালী জাগো,’ জয় বাংলা’, ‘বীর বাঙ্গালী হাতিয়ার ধরো, পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ করো।’...

মাটিডালী এসে পৌঁছালাম। শহর থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে। স্লোগান দিতেই মুস্তাফিজ (বাবু) সহ অনেকেই রাস্তায় বেরিয়ে এল। ব্যারিকেড দেওয়ার কথা বলতেই ১৫-২০ খানা কুড়াল নিয়ে গাছ কাটা শুরু হয়ে গেল। রাস্তার দুপাশের লোকজনদের বাড়ি ছেড়ে সরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হলো। (পাকিস্তানি সেনারা ব্যারিকেড দেখে ওখানকার অনেক বাড়িই পুড়িয়ে দিয়েছিল)। একটা বিরাট গাছ রাস্তাজুড়ে পড়ার পর আবার ছুটলাম শহরের দিকে। মাটিডালীতে তখন আরও গাছ কাটা এবং ব্যারিকেড রচনার কাজ চলছে।

২৬ মার্চের ভোর। পূর্ব আকাশে সূর্য মাত্র উঁকি দিয়েছে। ডা. জাহিদুর রহমানের বাড়ির সামনে রাস্তায় মাহমুদ হাসান খান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আর সবাই কোথায়? জিজ্ঞেস করতে ঘাড় নেড়ে জানালেন, জানেন না। শুধু বললেন, হাবিবুর রহমান (এমপি) আত্মসমর্পণ করার পক্ষপাতী। (পরবর্তীকালে হাবিবুর রহমান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে তাদের সহযোগিতা করেছিলেন)।

‘না তা চলবে না।’ ডা. জাহিদুর রহমান রীতিমতো ক্রুদ্ধ। মাহমুদুল হাসান খানকে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পাঠিয়ে ডা. জাহিদুর রহমানসহ দুখানা সাইকেলে ছুটলাম পুলিশ লাইনসের দিকে। পথে দেখা করলাম জেলা প্রশাসক খানে আলম খান সাহেবের সঙ্গে, দেখলাম ভীষণ উদ্বিগ্ন। বললেন, ‘সম্মুখযুদ্ধে ওদের সাথে পারবেন না। গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিন। আপনাদের সাফল্য কামনা করি।

এরপর পুলিশ লাইনস। পুলিশ লাইনসে মকবুল সাহেবের সঙ্গে দেখা হলো। জানালেন, ওয়্যারলেসে কুষ্টিয়া ছাড়া আর কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। কুষ্টিয়ার শেষ খবর হানাদার বাহিনী কুষ্টিয়া আক্রমণ করেছে। এরপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।...

শহরে যখন ফিরে আসি তখন সকাল সাতটা। রাস্তায় লোক নেমে পড়েছে। কিন্তু অস্ত্রের সংখ্যা অতি নগণ্য। একনলা, দোনলা বন্দুক এবং টু টু বোর রাইফেলসহ মাত্র আটাশটি। শুধু আজাদ গেস্টহাউসের ছাদে দারোগা নিজামউদ্দীন এবং তাঁর চার সঙ্গীর কাছে পাঁচটি ৩০৩ রাইফেল। যে দুরন্ত সাতাশটি ছেলে আমার সঙ্গে ২৬ মার্চের ভোরে অকুতোভয়ে হানাদার বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীকে রুখে দাঁড়িয়েছিল, তাদের সবার ভালো নাম আজ মনে নেই, তবে যে নামে তারা পরিচিত, সে নামই দিলাম। তারা হলো (১) এনামুল হক তপন। (২) আবদুল জলিল (৩) এমদাদুল হক তরুণ (৪) নুরুল আনোয়ার বাদশা (৫) শহীদ টিটু (৬) শহীদ হিটলু (৭) শহীদ মুস্তাফিজ (ছুনু) (৮) শহীদ আজাদ (৯) শহীদ তারেক (১০) শহীদ খোকন পাইকাড় (১১) সালাম (স্বাধীনতার পর আততায়ীর হাতে নিহত) (১২) বখতিয়ার হোসেন বখতু (আর্ট কলেজের ছাত্র) (১৩) খাজা সামিয়াল (১৪) মমতাজ (বর্তমানে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ সম্পাদক) (১৫) রাজিউল্লা (১৬) টি এম মুসা (পেস্তা) (১৭) নান্না (১৮) সৈয়দ সোহরাব (১৯) শহীদ বকুল (২০) বুবলা (২১) জাকারিয়া তালুকদার (২২) মাহতাব (২৩) টাটারু (২৪) বুলু (২৫) বেলাল (২৬) এ কে এম রেজাউল হক (রাজু) (২৭) ইলিয়াস উদ্দিন আহমদ।

কালীতলা থেকে রেললাইনের দুনম্বর রুমটি পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে দেয়ালের আড়ালে ছোট ছোট দলে ভাগ করে এদের দাঁড়ানোর নির্দেশ দিলাম। কিন্তু এই নির্দেশ ভেঙে টিটু, হিটলু এবং মুস্তাফিজ বড়গোলায় ইউনাইটেড ব্যাংকের (বর্তমানে জনতা ব্যাংক) ছাদে ঘাঁটি গেড়ে প্রতিরোধ করে এবং সেখানেই তারা শহীদ হয়। তপন, সামিয়াল, বখতু, জলিলসহ চারজনের একটি দল কালীতলার মুখে প্রথম প্রতিরোধের জন্য ঘাঁটি গাড়ল। প্রত্যেককে নির্দেশ দিলাম গুলি করার সঙ্গে সঙ্গে স্থান ত্যাগ করে এক আড়াল থেকে সরে যেতে হবে অন্য আড়ালে। যুদ্ধ চলাকালীন যোগাযোগ রক্ষা, সংবাদ আদান-প্রদান এবং নির্দেশ পৌঁছানোর দায়িত্ব নিল একরামুল হক স্বপন, মঞ্জু (শহীদ আজাদের ভাই), ছাত্রলীগের সামাদ, বিলু (মরহুম আকবর হোসেন আকন্দ সাহেবের ছেলে), সৈয়দ কেরামত আলী গোরা (পরবর্তীকালে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে শহীদ হন) এবং আবু সুফিয়ান (পরবর্তীকালে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে শাহাদতবরণ করেন)। সত্যি বলতে কি, আমার নিজেকে একজন সেনাপতি সেনাপতি মনে হচ্ছিল। আমার সেই নির্বোধ সেনাপতির ভূমিকার কথা মনে হলে এখনো হাসি পায়।

গাজীউল হক

২৬ মার্চের সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ পাকিস্তানি সেনা সুবিল পার হয়ে বগুড়া শহরে ঢুকল। সুবিল পার হওয়ার আগে মাটিডালী, বৃন্দাবনপাড়া ও ফুলবাড়ি গ্রামের কিছু কিছু বাড়ি তারা আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দিল। শহর ঢোকার পর পাকিস্তানি সেনা দল রাস্তায় দুপাশ দিয়ে দুটো লাইনে এগোতে শুরু করে। সুবিল (করতোয়ার একটি খাল) পার হওয়ার পর কোনো প্রতিরোধ না পেয়ে বেশ নিশ্চিন্তেই তারা এগোচ্ছিল। রাস্তা জনশূন্য, কোনো বাধা নেই। কিন্তু কালীতলাহাট পার হওয়ার পরপরই দেয়ালের আড়াল থেকে তপনের হাতের বন্দুক আচমকা আগুন ঝরাল। অব্যর্থ নিশানা। লুটিয়ে পড়ল একজন পাকিস্তানি সেনা। তপনই বগুড়ার প্রথম মুক্তিযোদ্ধা, যার অস্ত্র বগুড়ার মাটিতে প্রথম পাকিস্তানি সেনার রক্ত ঝরাল। গুলি করেই তপন এবং তার সঙ্গীরা স্থান ত্যাগ করে আর এক দেয়ালের আড়ালে চলে যায়। হঠাৎ আঘাত পেয়ে বিচলিত পাকিস্তানি সেনা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে চালাতে এগিয়ে চলে। জামিলের বাড়ি পার হতেই আবার রাস্তার দুপাশে দেয়ালের আড়াল থেকে পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্য করে নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধাদের আগ্নেয়াস্ত্র গর্জে উঠল। এখানে দুজন পাকিস্তানি সেনা গুরুতর জখম হয়। পাকিস্তানি সেনাদের গতি কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায়। এরপর পাকিস্তানি সেনা ক্রলিং করে কিছুটা পথ এগিয়ে যায়। কিন্তু বড়গোলা পার হওয়ার পর প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হলো পাকিস্তানি সেনা। ঝাউতলা বোম্বে সাইকেল স্টোরের পাশ থেকে গুলি করে সরে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হলো আজাদ। স্বাধীনতাযুদ্ধে অস্ত্র হাতে বগুড়ার মাটিতে আজাদই প্রথম শহীদ। ওই পাকিস্তানি সেনা রাস্তার পাশের ছোট্ট চায়ের দোকানের ঝাঁপ তুলে দুটো কিশোর কর্মচারীকে গুলি করে মারল।

পাকিস্তানি সেনারা রেললাইনের দুনম্বর রুমটির কাছে যেতেই আজাদ রেস্টহাউসের ছাদ থেকে দারোগা নিজামউদ্দীন, দারোগা নুরুল ইসলাম এবং তাঁদের সহযোগীদের ৩০৩ রাইফেল গর্জে উঠল। সম্মুখ দিক এবং দুপাশ থেকে আক্রান্ত হয়ে হানাদার সেনারা থমকে দাঁড়াল। কিছুটা পিছু হটে এল তারা। এমন সময় বড়গোলার ইউনাইটেড ব্যাংকের ছাদের ওপর থেকে তিনটি বন্দুক গর্জে উঠল। উৎসাহের বলে নির্দেশ অমান্য করে সবার অজান্তে ব্যাংকের ছাদে পজিশন নিয়ে ছিল টিটু, হিটলু ও মুস্তাফিজ (ছুনু)। দুজন পাকিস্তানি সেনা জখম হলো। পেছন দিক থেকে হঠাৎ আক্রান্ত হয়ে হানাদার সেনা দল বিচলিত হয়ে পড়ে। পিছু হটে দ্রুত তারা ব্যাংক ভবনটি ঘিরে ফেলে। টিটু, হিটলু ও ছুনু সরে যাওয়ার সুযোগ পেল না। শহীদ হলো বগুড়ার আরও তিনটি দামাল ছেলে। দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ বর্বর হানাদার সেনারা দ্রুত পিছু হটে শহর ছেড়ে গেল। সুবিলের উত্তর পাড়ে পূর্ব বিভাগের ডাক বাংলো এবং মহিলা কলেজে অবস্থান নিল তারা।

রাস্তায় বেরিয়ে এলো বগুড়া শহরের লোক। স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রথম দিনে আমাদের ছেলেরা প্রাণ দিয়েছে। সে জন্য চোখগুলো অশ্রুসিক্ত। কিন্তু তার সঙ্গে মিলে আছে জয়ের আনন্দ, এক অভূতপূর্ব আস্বাদ। বর্বর হানাদার বাহিনীর মোকাবিলা করেছি আমরা। তাদের হটিয়ে দিয়েছি, জয়ী হয়েছি।

বগুড়া জেলা

২৬ মার্চেরই অপরাহ্নে একরামুল হক স্বপন, ফজলার রহমান (ফুলবাড়ী) এবং চন্দন এসে খবর দিল যে তারা একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন জোগাড় করেছে। সুতরাং বুলেটিন সাইক্লোস্টাইল করে বিলি করা যায়। বুলেটিনের খসড়া দিলাম। এক পাতার বুলেটিন সন্ধ্যার সময় শহরে ছড়ানো হলো। হেডলাইন ছিল ‘প্রথম দিনের যুদ্ধে বগুড়াবাসীর জয়লাভ: পাঁচজন পাকিস্তানি সেনা নিহত। এরপর ছিল এক সর্বাত্মক যুদ্ধের আহ্বান। সবশেষে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ। একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। মাটিডালীতে যখন ব্যারিকেড দিয়ে ফিরে আসছিলাম, তখন দত্তবাড়ির সম্মুখে ওয়্যারলেস অফিসের একজন লোক ডা. জাহিদুর রহমানের হাতে একটা কাগজ দিয়ে যায়। মেসেজটি রাতে পেয়েছিল বলে জানায়। লাল কালিতে লেখা। যত দূর মনে হয় বাংলা তরজমা করলে দাঁড়াবে: ‘এটি আমার শেষ নির্দেশ। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। শত্রুসৈন্য আমাদের আক্রমণ করেছে। বাংলার মানুষ তোমরা যে যেখানে আছ, যার হাতে যে অস্ত্র আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও। হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি থেকে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।’ এই নির্দেশও বুলেটিনে জুড়ে দিয়েছিলাম। বুলেটিনে অবশ্য আমাদের তরফের ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করিনি। কারণ, ভেবেছিলাম তাতে সাধারণ মানুষ ভয় পেতে পারে। এরপর থেকে প্রতিদিন আমরা বুলেটিন বের করতাম। এমনকি প্রচুর গোলাবৃষ্টির মধ্যেও স্বপন ডিকটেশন নিত। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বুলেটিন সাইক্লোস্টাইল মেশিনে ছাপা হয়ে শহরে ছড়ানো হতো। ২৬ মার্চ থেকে শুরু করে ১ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন বুলেটিন বের হতো। বুলেটিনের বিশেষ দায়িত্ব ছিল একরামুল হক স্বপন, চন্দন, ধলু ও সৈয়দ কেরামত আলীর (গোরা) ওপর।

২৬ মার্চ সন্ধ্যায় বাদুড়তলায় একটি বাড়িতে যুদ্ধ পরামর্শ সভা বসল। আলোচনা শেষে জনাব মোখলেসুর রহমানের প্রস্তাবক্রমে পাঁচ সদস্যের একটি হাইকমান্ড গঠন করা হলো:
(১) গাজীউল হক (অদলীয়), সর্বাধিনায়ক, (যুদ্ধের দায়িত্ব)
(২) ডা. জাহিদুর রহমান (আওয়ামী লীগ) (খাদ্য এবং চিকিৎসার দায়িত্ব)
(৩) জনাব মাহমুদুল হাসান খান ( আওয়ামী লীগ), প্রশাসন
(৪) জনাব মোখলেসুর রহমান (মোজাফফর ন্যাপ), প্রশাসন
(৫) জনাব আবদুল লতিফ (কমিউনিস্ট পার্টি), প্রচার। ২৬ মার্চ রাতেই আমরা সুবিলের দক্ষিণ পাড়ে ঘাঁটি স্থাপন করলাম।
২৭ মার্চ সকাল আটটা। সুবিলের উত্তর পাড় থেকে পাকিস্তানি সেনারা গুলিবর্ষণ শুরু করে। পাল্টা জবাব দেয় আমাদের ছেলেরা। এই দিন ঝন্টু, মাহমুদ, ডা. টি আহমদের ছেলে মাসুদ, গোলাম রসুল, বিহারীর ছেলে (নামটি মনে নেই), রশীদ খানের ছেলে গুলাব, রেডিও, রফিকুল ইসলাম লাল, শহীদ আবু সুফিয়ান রানা এবং আরও অনেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সকাল সাড়ে আটটার দিকে ডা. জাহিদুর রহমান পুলিশ লাইনস থেকে পুলিশ বাহিনীর ৬০ জনের এক দলকে নিয়ে এলেন। ৩০৩ রাইফেল হাতে আমাদের ছেলেদের পাশাপাশি তাঁরাও অবস্থান নিলেন। দুই পক্ষে প্রচণ্ড গোলাবৃষ্টি হলো। গোলাবৃষ্টির মধ্যেই হানাদার বাহিনী সড়ক ধরে এগিয়ে এলে শহরের উত্তর প্রান্তে কটন মিল দখল করল। (তখন বগুড়া শহরের উত্তর সীমার প্রান্তে ছিল কটন মিল)। পুলিশ এবং আমাদের ছেলেদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে শহরের ভেতরে বেশি এগিয়ে আসতে পারল না হানাদারেরা। এদিনের যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা ভারী মেশিনগান ব্যবহার করে এবং মর্টারের গোলাবর্ষণ করে। বেলা তিনটায় মর্টারের গোলার আঘাতে শহীদ হলো তারেক, দশম শ্রেণির ছাত্র। মৃত্যুর সময়েও তার হাতে ধরা ছিল একটি একনলা বন্দুক। তারেকের রক্তে ভিজে গিয়েছিল আমার বুক। মনে পড়ে, তাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছিলাম।

২৭ মার্চ বিকেলে বাদুড়তলায় একটি খাদ্য ক্যাম্প বসানো হলো এবং তার সঙ্গে একটি প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রও খোলা হলো। খাদ্য ক্যাম্পের দায়িত্ব নিলেন মিউনিসিপ্যাল কমিশনার জনাব আমজাদ হোসেন এবং তাঁকে সাহায্য করার জন্য মোশাররফ হোসেন মণ্ডল, বাদুড়তলার আবু মিয়া, আবেদ আলী, মজিবর রহমান এবং আরও কয়েকজনকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হলো। তাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করা খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতেন। প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন শহীদ ডা. কছিরউদ্দীন তালুকদার সাহেব। তিনি একসময়ে বগুড়া জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। ওই সময়ে বৃদ্ধ বয়সে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে যেভাবে তিনি এগিয়ে আসেন, একজন চিকিৎসক হিসেবে তা বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য। তাঁর বাড়িটিও আমাদের শেল্টার হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে বগুড়ার প্রয়াত প্রবীণতম মুসলিম লীগ নেতা ডা. হাবিবুর রহমানও সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসেন। ২৭ মার্চ রাতে খবর পেলাম একজন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করেছেন।

২৮ মার্চের সকাল। কটন মিলের গেস্টহাউসের ছাদে পাকিস্তানি সেনারা মেশিনগান বসিয়েছে। তখনো গোলাগুলি শুরু হয়নি। মেশিনগানের পাশে দুজন পাকিস্তানি সেনা দাঁড়িয়ে। একজন পাকিস্তানি সেনা ছাদের রেলিংয়ে ভর দিয়ে কী যেন দেখছে। দেয়াল ঘেঁষে এগিয়ে গিয়ে দুরন্ত ছেলে তপন রাইফেল তুলল। অব্যর্থ লক্ষ্য। ছাদের ওপর থেকে পাকিস্তানি সেনাটি ছিটকে পড়ল মাটিতে। পিছু হটে তপন লাফিয়ে পড়ল রাস্তার পাশের নর্দমায়। নর্দমার দেয়াল ঘেঁষে সরে এল আড়ালে।

শুরু হলো এলোপাতাড়ি গোলাবৃষ্টি। ২৮ মার্চে মুক্তিসেনারাও দলে ভারী। মিন্টু, ডিউক, লিয়াকত (পরে রাজাকার হয়ে যায়), আব্দুর রহমান, মামুন (হক সাহেবের কমিউনিস্ট পার্টির), হারুন (ব্যাংক অফিসার), ধলু, বজলু, মুকুল, সাত্তার, রশীদ (রশীদ গুণ্ডা নামে খ্যাত ছিল) এবং গ্রাম থেকে প্রায় শ খানেক বন্দুকসহ এসে যোগ দিয়েছে। প্রচণ্ড প্রতিরোধ সত্ত্বেও ভারী মেশিনগানের গুলি এবং মর্টারেরর গোলাবর্ষণের আড়াল নিয়ে বেলা সাড়ে তিনটার পর পাকিস্তানি সেনারা ক্রল করে শহরে ঢুকতে শুরু করল। প্রচণ্ড প্রতিরোধের মধ্যেও তারা এগিয়ে চলল। বেলা ডোবার একটু পর পাকিস্তানি সেনারা রেললাইন পার হয়ে থানার মোড়ে পৌঁছাল। হতাশ হয়ে গেলাম, এবার বগুড়ার পতন নিশ্চিতপ্রায়। জলিল বিড়ি ফ্যাক্টরির পেছনে একটি ছোট বাড়িতে ছাত্রলীগের সামাদ, মাসুদ, সৈয়দ কেরামত আলী গোরাসহ আমরা কয়েকজন জড়ো হয়েছি। মাসুদকে দেখে একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। ২০ মার্চের রাতে মাসুদ এবং মুস্তাফিজুর রহমান পটল আমাকে নিয়ে গিয়েছিল স্টেডিয়ামের কাছে তাদের তৈরি বোমার কার্যকারিতা দেখানোর জন্য। দুটি বোমা ফাটানো হলো। সে কী বিকট আওয়াজ। কিন্তু হতাশ হলো সবাই, দেয়ালে একটুও চিড় পর্যন্ত ধরেনি। ধ্বনিসর্বস্ব বোমা।
ঘটনাটা মনে আসতেই মাসুদের কাছে জানতে চাইলাম সেই বোমা আছে কি না। সামাদ জানাল, ২৩টি বোমা আছে। সামাদ ও মাসুদ ছুটল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতবোমা দুটো নিয়ে এসে হাজির। বললাম, যেমন করেই হোক দত্তবাড়ীর উত্তরে যেকোনো জায়গায় রাস্তার ওপর এই বোমা দুটো ফাটাতে হবে এবং কিছু মুক্তিসেনা কাছাকাছি জায়গায় ফাঁকা গুলি ছুড়বেন ও সরে পড়বেন।

শেখ ইনসান হাজী সাহেবের বাড়ির উত্তর ধারে বোমা দুটি ফাটানো হলো। সে কী বিকট শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে এলোপাতাড়ি, কিছু একনলা-দোনলা বন্দুকের গুলির আওয়াজ। পেছন থেকে আক্রান্ত হয়েছে ভেবে সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে হানাদার সেনারা ঘুরে দাঁড়াল। তারপর দ্রুত পিছু হটে কটন মিলের গেস্টহাউসে এবং সুবিলের উত্তর পাড়ের ঘাঁটিতে ফিরে গেল। সেদিনের মতো হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এক আনাড়ি মূর্খ সেনাপতির রণকৌশলে বগুড়া শহর সেদিন পতনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

২৮ মার্চ রাতে সুবেদার আকবরের নেতৃত্বে ৩৯ জন ইপিআরের একটি দল বগুড়া পৌঁছায়। অস্ত্র বলতে তাদের রাইফেল, কয়েকটি গ্রেনেড এবং তিনটি এলএমজি। বিনা খবরে ওরা পৌঁছায়। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই সন্দিহান হই। পুলিশ লাইনসে ওদের নিরস্ত্র করে নওগাঁয় মেজর নজমুল হকের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করলাম। তিনি ইপিআরদের কাজে লাগাতে বললেন এবং ৩০ মার্চ নিজে বগুড়া আসবেন বলে জানালেন।

২৯ মার্চ। সকালবেলায় বিস্ময়ে দেখলাম রাতের অন্ধকারে হানাদার পাকিস্তানি সেনা কটন মিলের গেস্টহাউস ছেড়ে সুবিলের উত্তর পাড়ের ঘাঁটিতে ফিরে গেছে। নিশ্চয়ই গুপ্তচর মারফত তারা ইপিআরদের পৌঁছানোর খবর পায়। সকাল ৯টায় সুবেদার আকবর ও মাসুদ রেকি করতে বের হলো। বেলা ১১টায় ইপিআরের কয়েকজন একটি এলএমজি পাকিস্তানি সেনাদের দিকে মুখ করে কটন মিলের ছাদে বসালেন। দুপুর আনুমানিক বারোটার সময় পাকিস্তানি সেনারা বৃন্দাবনপাড়া প্রাইমারি স্কুলের ঘাঁটি থেকে মর্টারের আক্রমণ শুরু করে। এবার আমাদের তরফ থেকেও তিনটি এলএমজির মুখ দিয়ে পাল্টা জবাব গেল, সন্ধ্যার সময়ে দুই পক্ষের গোলাগুলি বন্ধ হয়। করিম হাওলাদার নামে একজন পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।

৩০ মার্চ। বেলা ৯টায় জেলা প্রশাসক খানে আলম সাহেব খবর পাঠালেন মেজর নজমুল হক এসেছেন। দেখা হলো মেজর নজমুল হকের সঙ্গে। মাঝারি গড়নের শ্যামলা রঙের একহারা চেহারা। সর্বাঙ্গে একটা দৃঢ়প্রত্যয়ের ছাপ। সংক্ষেপে তাঁর কাছে সব রিপোর্ট করলাম। শেষে বললাম, ‘যুদ্ধ করা আমার কাজ নয়। আমি যুদ্ধের কৌশল জানিনে। আপনি এসেছেন। এখন দায়িত্ব আপনার।’

মেজর নজমুল মৃদুস্বরে বললেন, ‘দায়িত্ব আমাদের সকলের। পলিটিক্যাল হাইকমান্ডের নিযুক্ত সর্বাধিনায়ক হিসেবে আপনিই কাজ করবেন। আমি আপনার সাহায্যের জন্য রইলাম।’

অদ্ভুত ভালো লেগেছিল এই মানুষটিকে। নিরহংকার। কোনো দিন ভুলতে পারব না। স্বাধীন বাংলাদেশ তিনি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা, অতুলনীয় সাহস বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

৩০ মার্চ বেলা ১০টায় পাকিস্তানি সেনারা মর্টারের প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ শুরু করে। মুক্তিসেনারাও পাল্টা জবাব দেয়। বেলা একটা নাগাদ হঠাৎ পাকিস্তানি সেনারা গোলাবর্ষণ বন্ধ করে।

বেলা আড়াইটায় ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী জিন্নাহর বাসায় হাইকমান্ডের বৈঠক। বৈঠকে আলোচনা শুরু হয়েছে। হঠাৎ উড়োজাহাজের আওয়াজ পাওয়া গেল। জিন্নাহ এসে খবর দিল, বেশ নিচু দিয়ে দুটো উড়োজাহাজ ছুটে আসছে। একটু পরই মেশিনগানের গুলির আওয়াজ এবং তার পরপরই বোমাবর্ষণ শুরু হলো। সবাই বিচলিত হয়ে পড়লাম।

বোমাবর্ষণ বন্ধ হওয়ার পর ঘুরে দেখলাম বিশেষ ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কোনো লক্ষ্যেই আঘাত করতে পারেনি। মুক্তিসেনাদের মনোবল আরও চাঙা হয়ে গেছে। মেজর নজমুল হক সার্কিট হাউসে কন্ট্রোল রুম বসালেন। সন্ধ্যায় শহীদ খোকন পাইকাড় ও সালাম একটা খাকি ফুলপ্যান্ট ও খাকি শার্ট তৈরি করে এনে দিল। তাদের জেদে পরতে হলো তাই। ষোলোকলা পূর্ণ হলো যখন, তখন এসে একটা রিভলবার ঝুলিয়ে দিল কোমরে। হাসি পাচ্ছিল। সর্বাধিনায়ক, সেনাপতি, জেনারেল-এ জেনারেল অব ড্রিমল্যান্ড।

৩১ মার্চ। দিনের বেলা দুই পক্ষই নীরব। খবর এল, ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও ক্যাপ্টেন আশরাফের নেতৃত্বে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এসেছে এবং ঘোড়াঘাটে অবস্থান করছে। ৩১ মার্চ রাতে অসীম সাহসী সুবেদার আকবরের নেতৃত্বে মুক্তিসেনারা মহিলা কলেজের ঘাঁটিতে গ্রেনেড চার্জ করলেন। পেট্রলের ড্রামে আগুন ধরিয়ে গড়িয়ে দেওয়া হলো পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটির দিকে। পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটি থেকে লক্ষ্যবিহীন গুলির শব্দ শোনা গেল। তারপর অন্ধকারে মোটর কনভয়ের শব্দ। কিছু বোঝা গেল না। ভোরে দেখা গেল, পাকিস্তানি সেনা বগুড়া ছেড়ে অন্ধকারের মধ্যে রংপুরের দিকে পশ্চাদপসরণ করে গেছে।

১ এপ্রিল। সকালেই সারা শহর রাষ্ট্র হয়ে গেল, হানাদার বাহিনী পালিয়েছে। সারা শহরে আনন্দের ঢেউ। হরিগাড়ীর গোপন আড্ডা থেকে সার্কিট হাউস কন্ট্রোল রুমে এসেছি। সুবেদার আকবর এসে দাঁড়ালেন। ‘স্যার, আড়িয়া ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করব, অনুমতি চাই’। কিছু জানি না, বুঝি না। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘চলুন’।

৩১ মার্চ। দিনের বেলা দুই পক্ষই নীরব। খবর এল, ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও ক্যাপ্টেন আশরাফের নেতৃত্বে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এসেছে এবং ঘোড়াঘাটে অবস্থান করছে। ৩১ মার্চ রাতে অসীম সাহসী সুবেদার আকবরের নেতৃত্বে মুক্তিসেনারা মহিলা কলেজের ঘাঁটিতে গ্রেনেড চার্জ করলেন। পেট্রলের ড্রামে আগুন ধরিয়ে গড়িয়ে দেওয়া হলো পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটির দিকে। পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটি থেকে লক্ষ্যবিহীন গুলির শব্দ শোনা গেল। তারপর অন্ধকারে মোটর কনভয়ের শব্দ। কিছু বোঝা গেল না। ভোরে দেখা গেল, পাকিস্তানি সেনা বগুড়া ছেড়ে অন্ধকারের মধ্যে রংপুরের দিকে পশ্চাদপসরণ করে গেছে।

৩৯ জন ইপিআর, ৫০ জন পুলিশ বাহিনীর লোক এবং ২০ জন মুক্তিসেনা। বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ আড়িয়া ক্যান্টনমেন্ট উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম-এই তিন দিক থেকে ঘেরাও করা হলো। দুই পক্ষ থেকে গুলিবৃষ্টি চলছে। এরই মধ্যে বিমান আক্রমণ শুরু হলো। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে গ্রামের হাজার হাজার লোক টিনের ক্যানেস্তারা পেটাতে শুরু করল। বোমাবর্ষণ বন্ধ হওয়ার পর আবার কিছুটা এগোলাম। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা অবিরাম গুলি চালিয়ে যেতে লাগল। অবশ্য তাদের সুবিধা ছিল। ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে আমাদের একটা ফাঁকা মাঠ পাড়ি দিতে হয়। সেদিন ছিল দক্ষিণের জোর হাওয়া। গ্রামের লোকদের অনুরোধ জানানো হলো, তারা ক্যান্টনমেন্টের দক্ষিণ দিক থেকে মরিচের গুঁড়া ছাড়তে পারে কি না। ব্যস, আর বলতে হলো না। কোথা থেকে এত মরিচের গুঁড়া ভেসে এল, তা বলা কঠিন। ক্যান্টনমেন্টের ৫০০ গজ উত্তরে আমাদের চোখ-মুখ জ্বলতে লাগল। বেলা তখন আড়াইটা। আড়িয়া ক্যান্টনমেন্টে সাদা পতাকা উড়ল। আনন্দের আতিশয্যে রাইফেল হাতে লাফিয়ে উঠল অসীম সাহসী যোদ্ধা মাসুদ। আর তৎক্ষণাৎ শত্রুর নিক্ষিপ্ত শেষ বুলেটটি তাকে বিদ্ধ করল। শহীদ হলো নির্ভীক সেনা, বগুড়ার এক বীর সেনানী। যুদ্ধে জয় হলো। পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করেছে। বন্দী সেনাদের এবং ৫৮ ট্রাকভর্তি অ্যামিউনিশন নিয়ে ফিরলাম। কিন্তু চোখের জল বাধা মানছিল না। মাসুদকে হারিয়ে এলাম চিরদিনের জন্য। সেদিনই ঘোষণা করেছিলাম, আড়িয়ার নাম হবে ‘মাসুদনগর’। রাতে ২১টি গান স্যালুটের মাঝে মাসুদকে কবরে সমাহিত করলাম। দেখলাম, ডাক্তার জাহিদুর রহমানের চোখেও জলের ধারা নেমে এসেছে।

আড়িয়ার ক্যান্টনমেন্টে একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনসহ (ক্যাপ্টেন নূর) ৬৮ জন সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্যে ছিল ২১ জন পাঞ্জাবি সৈন্য। জনতার ক্রুদ্ধ আক্রমণের হাত থেকে এদের রক্ষা করতে পারিনি। জেলখানার তালা ভেঙে ওদের বের করে নিয়ে এসে কুড়াল ও বটি দিয়ে কুপিয়ে আমার অনুপস্থিতিতে ওদের হত্যা করে। বাঙালি সৈন্য যারা ছিল, তাদের নজরবন্দী করে রাখা হলো। আড়িয়া ক্যান্টনমেন্টে কিছু চায়নিজ রাইফেল ও গুলি পাওয়া যায়। ৫৮ ট্রাকভর্তি অ্যামিউনিশন পাই, কিন্তু তা ব্যবহারের অস্ত্র ছিল না। অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বললেন, সেগুলো ছিল ১০৫ গান এবং আর-আর-এর অ্যামিউনিশন।

২ এপ্রিল। পাবনার এসপি জনাব সাঈদ এলেন এবং কিছু রাইফেলের গুলি নিয়ে যান। তাঁকে বললাম, যেমন করে হোক ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সাহেবকে বগুড়া নিয়ে আসতে।

৩ এপ্রিল। জনাব কামারুজ্জামান, শেখ মনি এবং তোফায়েল আহমেদ বগুড়া এসে উপস্থিত হলেন। ডা. মফিজ চৌধুরীকে সঙ্গে দিয়ে তাঁদের সীমান্ত পার করে দেওয়ার ব্যবস্থা করলাম। জনাব শেখ মনির কাছেই জানতে পারলাম, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দী।

৪ এপ্রিল। বগুড়া আওয়ামী লীগের জনাব আবদুর রহিম তালুকদার জিপ নিয়ে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে নিয়ে বগুড়া পৌঁছালেন। তাঁর সঙ্গে জনাব আবু সাঈদ এমপি। মনসুর ভাইকে বিশেষ করে অনুরোধ করলাম যাতে প্রভিশনাল গভর্নমেন্টের নাম ঘোষণা করেন। মনে আছে, একটা সিগারেটের প্যাকেটের সাদা অংশে বিএসএফের কর্নেল মুখার্জিকে লিখেছিলাম মনসুর ভাইকে নিরাপদে তাজউদ্দীনের কাছে পাঠানোর জন্য।

৫ এপ্রিল। মেজর নজমুল হক বগুড়া এলেন। জেলা প্রশাসক জনাব খানে আলমের কুঠিতে আলোচনা সভা বসল। মেজর নজমুল হক জানালেন, যেমন করে হোক ১০৫ কামান এবং আর-আর জোগাড় করতে হবে। তিনি বললেন, হিলিতে গিয়ে ব্রিগেডিয়ার চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর সঙ্গে আলোচনায় ঠিক হলো, যদি কোনো প্রকারে আমরা রংপুর ক্যান্টনমেন্ট দখল করে উত্তরাঞ্চল শত্রুমুক্ত করতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে পাকিস্তানিদের পাল্টা আক্রমণ ঠেকাতে পারব।

৬ এপ্রিল। সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি ও জাহিদুর রহমান হিলি যাই। পশ্চিম হিলিতে গেলে আমাদের দুজনকে একপ্রকার নজরবন্দী করে রাখে সারা দিন। সন্ধ্যায় জানাল, রাত তিনটায় ব্রিগেডিয়ার চ্যাটার্জি আমাদের সঙ্গে দেখা করবেন। রাত তিনটায় ব্রিগেডিয়ার চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা হলো। তিনি আমাদের দুই পেটি ৩০৩ রাইফেলের গুলি দিয়ে বিদায় দিলেন এবং ১৬ এপ্রিল হিলিতে তাঁর সঙ্গে আবার দেখা করতে বললেন। জানালেন, তিনি ভারত গভর্নমেন্টকে আমাদের অবস্থা জানিয়ে অস্ত্র সাহায্য করতে অনুরোধ জানাবেন।

৬ এপ্রিল। সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি ও জাহিদুর রহমান হিলি যাই। পশ্চিম হিলিতে গেলে আমাদের দুজনকে একপ্রকার নজরবন্দী করে রাখে সারা দিন। সন্ধ্যায় জানাল, রাত তিনটায় ব্রিগেডিয়ার চ্যাটার্জি আমাদের সঙ্গে দেখা করবেন। রাত তিনটায় ব্রিগেডিয়ার চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা হলো। তিনি আমাদের দুই পেটি ৩০৩ রাইফেলের গুলি দিয়ে বিদায় দিলেন এবং ১৬ এপ্রিল হিলিতে তাঁর সঙ্গে আবার দেখা করতে বললেন। জানালেন, তিনি ভারত গভর্নমেন্টকে আমাদের অবস্থা জানিয়ে অস্ত্র সাহায্য করতে অনুরোধ জানাবেন।

৭ এপ্রিল। প্রায় খালি হাতেই বিকেলবেলা আমি ও ডা. জাহিদুর রহমান হিলি থেকে ফিরলাম। মুক্তিসেনারা সাগ্রহে আমাদের প্রতীক্ষা করছিলেন। কিন্তু আপাতত কোনো সামরিক সাহায্য না পাওয়ায় কিছুটা হতোদ্যম হলেন। বলতে ভুলে গেছি, ২ এপ্রিল থেকেই মুক্তিসেনাদের কয়েকটি ক্যাম্পে ভাগ করে দিয়ে সংক্ষিপ্ত ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলাম। করোনেশন স্কুলে একটি ক্যাম্প, সেন্ট্রাল হাই মাদ্রাসায় একটি ক্যাম্প এবং জিলা আনসার অফিসের মাঠে একটি ক্যাম্প। ইপিআর বাহিনীর ব্যবস্থা করেছিলাম এডওয়ার্ড পার্কের কমিউনিটি সেন্টার হলের এক তলায়। কন্ট্রোল রুম শিফট করেছিলাম দোতলায়। বগুড়া সার্কিট হাউসে প্রশাসনকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। জনাব এম আর আখতার মুকুলকে কেরোসিন, ডিজেল ও পেট্রলের পারমিট ইস্যু করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। খালি হাতে ফিরে আসার খবর জেনে মুকুল একান্তে ডেকে নিয়ে বলল, ‘শালা সেরেছে। এবার আস্তানা গুটাও। পাকিস্তানি খুনিরা এবার তোমার জন্য ট্যাংক নিয়া আইব। এদিকে তোমার মুক্তিসেনাদের থামাও। এরা কোনো শৃঙ্খলা মানে না। এরাই এখন প্রবলেম।’ দেখলাম তা-ই। মুক্তিসেনাদের মধ্যে একদল ভীষণ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠেছে। এদের নিয়ন্ত্রণে রাখাই মুশকিল। তা ছাড়া পাকিস্তানি সেনা সরে যেতেই দলীয় কোন্দল মাথা চাড়া দিয়েছে। দুষ্কৃতকারীরাও সুযোগ নেওয়ার চেষ্টায় আছে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য শেষ চেষ্টা চালালাম।

৮ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিল বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটল না। ১৩ এপ্রিল সিরাজগঞ্জের মহকুমা অফিসার শহীদ শামসুদ্দীন সাহেব দেখা করলেন এবং সিরাজগঞ্জ নগরবাড়ীর ডিফেন্সের ব্যবস্থাও বগুড়া থেকে করতে অনুরোধ জানালেন।

১৪ এপ্রিল, হিলি থেকে একটা খবর আসে। যেসব অ্যামিউনিশন আড়িয়া যুদ্ধে পাওয়া গেছে, তার নমুনা নিয়ে অতি অবশ্য হিলিতে দেখা করতে হবে। ১৪ এপ্রিল রাতে সুবেদার আকবরের নেতৃত্বে মুক্তিসেনার একটি দল নগরবাড়ী প্রতিরক্ষার জন্য পাঠানো হলো।
১৬ এপ্রিল, জনাব এম আর আখতার মুকুল, জনাব আসাদুজ্জামান, মজিবর রহমান এমপি, ডা. জাহিদুর রহমান এমপি এবং দুজন ইপিআরকে সঙ্গে নিয়ে অ্যামিউনিশনের নমুনাসহ বিকেলবেলা হিলি পৌঁছাই। সেদিন বিকেলেই কর্নেল ব্লিৎস অ্যামিউনিশনগুলো পরীক্ষা করেন। ওই দিন রাতেই আমাদের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য কলকাতা যেতে বলা হয়। ১৭ এপ্রিল ভোরে আমরা কলকাতা রওনা হই। ১৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় লর্ড সিনহা রোডে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী জনাব মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব কামারুজ্জামান এবং পার্লামেন্ট সদস্য জনাব আবদুল মান্নান এবং আবদুস সামাদ আজাদের নিকট বগুড়ার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রতিবেদন পেশ করি।

২২ এপ্রিল বগুড়া শহরের পতন ঘটে।
......
গাজীউল হক: ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের নেতা, মুক্তিযোদ্ধা ও আইনজীবী। তাঁর প্রকৃত নাম আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক। জন্ম ১৯২৯ সালে নোয়াখালীর ছাগলনাইয়ার নিচিন্তপুর গ্রামে। তিনি বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে বিএ অনার্স ও এমএ এবং এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৯ সালে মারা গেছেন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র, নবম খণ্ড, তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, প্রথম প্রকাশ ২০০৪, পৃ. ৪১৩-৪২২