সাথী আক্তারের অপরাধ কী

ময়মনসিংহের ভালুকায় বিএনপি সরকারকে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তির অভিযোগে উত্তেজনার মধ্যে সাথী আক্তারকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে স্কয়ার মাস্টারবাড়ি এলাকায়।ছবি: সংগৃহীত

ময়মনসিংহের ভালুকার নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তারের অপরাধ কী? তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একের পর এক চুরির ঘটনায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফেসবুক লাইভে বলেছেন, ‘বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়া আজকে ভুক্তভোগী।’

সাথী আক্তারের এ বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করে বিচারের দাবি জানিয়েছেন। আর পুলিশ তাঁকে হেফাজতে নিয়ে পরে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।

একজন নাগরিক তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, সরকারের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন এবং নিজের ভোটের সিদ্ধান্ত নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এর চেয়ে স্বাভাবিক ঘটনা আর কী হতে পারে? অথচ তাঁকে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলো, তা শুধু একজন নারী উদ্যোক্তার হয়রানির ঘটনা নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের প্রতি ক্ষমতাসীন দল, পুলিশ এবং আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন

সাথী আক্তার প্রায় ১৪ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকবার তাঁর দোকান থেকে বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়েছে। আশপাশের দোকানেও একই ধরনের চুরি হয়েছে। এসব ঘটনায় তিনি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। চুরি ঠেকানো এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ফলে এ নিয়ে তাঁর ক্ষোভ প্রকাশের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

কিন্তু সেই ক্ষোভের বিষয়টি আমলে নেওয়ার বদলে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা অনেকটা মবের মতো তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে জড়ো হন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা প্রথম আলোকে বলেছেন, বিএনপিকে নিয়ে কথিত কটূক্তির কারণে দলীয় নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওই নারীকে প্রতিহত করতে চেয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো, একজন নাগরিকের বক্তব্য তাঁদের পছন্দ না হলে তাঁকে ‘প্রতিহত’ করার অধিকার তাঁরা কোথায় পেলেন?

এর চেয়েও বিস্ময়কর পুলিশের ভূমিকা। ভালুকা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি ভিডিওটি কয়েকবার দেখেছেন এবং সাথীর বক্তব্য বাক্‌স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে ওই নারী মারমুখী আচরণ করায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এ কারণেই তাঁকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

আরও পড়ুন
কোনো বক্তব্য অশালীন বা আপত্তিকর মনে হতে পারে। তার প্রতিবাদও হতে পারে। কিন্তু সেই অসন্তোষের জেরে দলীয় নেতা–কর্মীরা একজন মানুষকে আটক করবেন, এরপর পুলিশ তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখাবে—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোনো বক্তব্যকে সন্ত্রাসের অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনের নির্দিষ্ট উপাদান ও তার প্রমাণ থাকতে হবে। শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকে নিয়ে আপত্তিকর কথা বলা সেই প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।

পুলিশের এই ব্যাখ্যা বিভ্রান্তিকর। যাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করা হলো, তাঁকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরিতে ঘেরাওকারীদের ভূমিকা কী ছিল? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে কেন বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তিটিকেই গ্রেপ্তার করতে হলো? ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারা কোনো সম্ভাব্য আমলযোগ্য অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োগ হতে পারে। শুধু উত্তেজনা তৈরি হয়েছে বলেই কোনো একজনকে ধরে এই ধারায় গ্রেপ্তার দেখানোর সুযোগ নেই।

কেউ যদি কোনো বক্তব্যে সংক্ষুব্ধ হন, আইনসম্মত পথ অনুসরণ করতে পারেন। কিন্তু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করে, ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে এবং বক্তব্যদাতাকে পুলিশের কাছে তুলে দিয়ে বিচারের দাবি জানানো আইনের শাসনের পথ নয়। এ ধরনের ঘটনা অন্যদের জন্য ভয়াবহ বার্তা দেয়—ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করলে আইনি–বেআইনি সব ধরনের হয়রানি মুখে পড়তে হতে পারে।

বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

ভালুকার ঘটনার সঙ্গে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে গত ২ এপ্রিলের একটি ঘটনার মিল রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে কথিত কটূক্তির অভিযোগে শাওন মাহমুদ নামের এক ব্যক্তির রেস্তোরাঁয় স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের ২৫ থেকে ৩০ জন নেতা-কর্মী জড়ো হন। তাঁরা শাওনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। এরপর পুলিশ তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করে।

যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে উপস্থিত যুবদলের নেতা-কর্মীরা বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনামূলক ওই পোস্ট তাঁরা মেনে নেবেন না। পুলিশও জানায়, দলীয় নেতা–কর্মীরা শাওনকে আটক করে তাদের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ঘটনাটিকে সরকার–সমর্থকদের চাপে মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। দলীয় নেতা-কর্মীরা কারও বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে মববাজদের মতো তাঁর বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করবেন, তাঁকে আটক করবেন কিংবা পুলিশের ওপর ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করবেন—এমন আচরণ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশকে রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে চাইলে এটুকু করতেই হবে।

কোনো বক্তব্য অশালীন বা আপত্তিকর মনে হতে পারে। তার প্রতিবাদও হতে পারে। কিন্তু সেই অসন্তোষের জেরে দলীয় নেতা–কর্মীরা একজন মানুষকে আটক করবেন, এরপর পুলিশ তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখাবে—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোনো বক্তব্যকে সন্ত্রাসের অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনের নির্দিষ্ট উপাদান ও তার প্রমাণ থাকতে হবে। শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকে নিয়ে আপত্তিকর কথা বলা সেই প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।

একই ধরনের আরও বেশ কিছু ঘটনার উদাহরণ দেওয়া সম্ভব; কোথাও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করা হয়েছে, কোথাও দলীয় নেতা-কর্মীরা নিজেরাই একজনকে আটক করে পুলিশের কাছে দিয়েছেন, কোথাও অনলাইন প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে হামলার অভিযোগ উঠেছে। সব ঘটনাতেই একটি প্রবণতা স্পষ্ট: ক্ষমতাসীন দলের একাংশ ভিন্নমত, সমালোচনা বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জবাব দিতে নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছে; আর পুলিশের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়েছে, নাগরিকের অধিকার রক্ষার চেয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা অনুযায়ীই তারা কাজ করছে।

প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক

দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকার সময় বিএনপির নেতা-কর্মীরাও মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব হওয়ার অভিজ্ঞতা দলটির অজানা থাকার কথা নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইন ব্যবহার করে সাংবাদিক, বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ নাগরিককে হয়রানির যে অভিযোগ উঠেছিল, বিএনপি তার সমালোচনা করেছে।

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক পরিচয়–নির্বিশেষে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির মূল্যায়ন হবে যাঁরা এখন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাঁদের সঙ্গে সরকার ও দল কী আচরণ করে, তা দিয়ে।

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে, যদিও আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের ব্যবস্থাও আছে। সেই বিধিনিষেধকে ক্ষমতাসীন দল বা নেতাদের সমালোচনা থেকে রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। রাষ্ট্র, সরকার ও ক্ষমতাসীন দল এক জিনিস নয়। সরকারের সমালোচনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; বরং সরকারের কাজের জবাবদিহি দাবি করা একটি গণতান্ত্রিক অধিকার।

সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। দলীয় নেতা-কর্মীরা কারও বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে মববাজদের মতো তাঁর বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করবেন, তাঁকে আটক করবেন কিংবা পুলিশের ওপর ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করবেন—এমন আচরণ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশকে রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে চাইলে এটুকু করতেই হবে।

  • মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
    * মতামত লেখকের নিজস্ব