আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের পর ‍গুলিতে দুই মৃত্যু কী বার্তা দিচ্ছে

এসআরবির অভিযানের সময় নিহত মারুফ ওরফে দুখু মিয়াগ্রাফিক্স: প্রথম আলো/এআই

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে গুলিতে নিহত হয়েছেন কারখানাশ্রমিক মারুফ ওরফে দুখু মিয়া। ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এসআরবির (অধুনালুপ্ত র‍্যাব) এক মাদকবিরোধী অভিযানের সময় এ ঘটনা ঘটে। অভিযানের এক পর্যায়ে এসআরবি সদস্যদের দিকে গুলি করে চার আসামি ছিনিয়ে নিলে এবং অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁরা আত্মরক্ষার্থে আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি ছুড়েছিলেন বলে দাবি করেন বাহিনীটির কর্মকর্তারা।

অভিযানের সময় গোলাগুলি এবং দুখু মিয়ার মৃত্যু ঘটলেও প্রাণঘাতী গুলিটি কার অস্ত্র থেকে এসেছে, তা নিশ্চিত করা যায়নি। (এসআরবির অভিযানের সময় তরুণের মৃত্যু, গুলি করেছে কে, প্রথম আলো অনলাইন, ৩০ অক্টোবর ২০২৬)

অন্যদিকে ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ভোর চারটার বরিশালের হিজলায় গুলিতে জেলে আকতার হোসেন হাওলাদারের মৃত্যুর ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ নৌ পুলিশের বিরুদ্ধে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেখানে নিজেদের অভিযান পরিচালনার কথা অস্বীকার করেছেন। (ইলিশ ধরতে গিয়ে ‘নৌ-পুলিশের’ গুলিতে ঝাঁঝরা জেলের বুক, ঘটনাস্থলেই মৃত্যু, বাংলা ট্রিবিউন, ২৯ অক্টোবর ২০২৬)

দুটি ঘটনাতেই মানুষের প্রাণ গেছে, কিন্তু সেই মৃত্যুর দায় কার, এর স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।

ঘটনা দুটি এমন সময়ে ঘটল, যখন ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে পুলিশপ্রধানের বহুল বিতর্কিত বক্তব্যের রেশ কাটেনি। সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে—আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের এ মন্তব্যের পর পুলিশ সদর দপ্তর ব্যাখ্যা দিয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠনও তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তাদের বক্তব্য, অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান বোঝাতেই তিনি শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

এ রকম প্রেক্ষাপটে ‍গুলিতে দুটি মৃত্যুকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে উদ্বেগের পুরোটা বোঝা যাবে না। আইজিপির বক্তব্যের সঙ্গে ধলপুর ও হিজলার ঘটনার হয়তো সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তদন্তের আগে ঘটনাগুলোকে ‘ক্রসফায়ার’ বলাও সংগত হবে না। কিন্তু পুলিশপ্রধান যখন প্রকাশ্যে এমন একটি পদ্ধতির কথা বলেন, তারপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ঘিরে মানুষের মৃত্যু হয় এবং তার দায় নিয়ে অস্পষ্টতা দেখা দেয়, তখন প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

২.

‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের পর সরকারের পক্ষ থেকে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সরকারের প্রতিক্রিয়ায় ওই বক্তব্যের রাজনৈতিক ক্ষতি সামলানোর চেষ্টা স্পষ্ট। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তাদের অবস্থান উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আত্মরক্ষা ও অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে আইজিপির বক্তব্য সমর্থন করেছে; এমনকি তারা ওই বক্তব্যকে ‘সময়োপযোগী আহ্বান’ বলে উল্লেখ করেছে। (আইজিপির বক্তব্য ‘সময়োপযোগী আহ্বান’: পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোর ডটকম, ২৭ অক্টোবর ২০২৬)

বাহিনীর প্রধানের বক্তব্যকে যখন সেই পেশাজীবীদের সংগঠন সমর্থন করে, তখন প্রশ্ন ওঠে, তাঁর ওই বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা বাহিনীর ভেতরে কতটা বিস্তৃত। নাগরিকদের আশঙ্কা দূর করতে তারা বলপ্রয়োগের সীমা ও জবাবদিহির ওপর জোর দিতে পারত, তার বদলে আইজিপির বক্তব্যটি কেন ‘সঠিক’, সে যুক্তিই সামনে এনেছে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে প্রথমে অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতে হবে। তারপর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার সত্যি সত্যি ‘ক্রসফায়ার’, গুম বা হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করতে চাইলে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে বাহিনীর কর্মকাণ্ডে ও জবাবদিহিতে।

এটা খুব স্বাভাবিক যে বাহিনীর সদস্যরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কথা বা বক্তব্য থেকে বুঝতে চেষ্টা করেন, কোন আচরণ সমর্থন পাবে এবং কোনটির জন্য জবাবদিহি করতে হবে। পুলিশপ্রধানের বিতর্কিত বক্তব্যের পর তাঁর পক্ষে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সমর্থন মাঠপর্যায়ে কী বার্তা দেয়—কঠোরতার নামে সীমা অতিক্রম করলেও তাঁর পক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন পাওয়া যাবে?

যে বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কোন বিতর্কিত পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার আগে তার পক্ষে গ্রহণযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা কি না। প্রকাশ্যে ‘ক্রসফায়ার’কে সম্ভাব্য ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা, সমালোচনার পর তার পক্ষে যুক্তি দেওয়া এবং আত্মরক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখানো—এটা ‘ক্রসফায়ার’–এর বিরুদ্ধে আপত্তিকে দুর্বল করার কৌশলও হতে পারে।

আরও পড়ুন

৩.

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘বর্তমান সরকারের সময় এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুমের ঘটনা বা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। …’ (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, ২৯ অক্টোবর ২০২৬)। তিনি এর আগেও একাধিকবার একই রকম বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর এসব বক্তব্যের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ‘ডিফেন্ড’ করার চেষ্টা স্পষ্ট।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এবং এইচআরএসএসের তথ্য অনুসারে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এখন পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, হেফাজতে কোনো ব্যক্তির কীভাবে মৃত্যু হয়েছে, সেটি তদন্তসাপেক্ষ বিষয়।

অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, এ ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিস্থিতির চাপে ভুক্তভোগীর পরিবারও মামলা করতে পারে না। তাই হেফাজতে নির্যাতনের মামলা না হওয়ার মানে ঘটনাগুলো ঘটেইনি—এমনটা বলা যায় না। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে এই মৌলিক পার্থক্য উপেক্ষা করেছেন।

আরও পড়ুন

গুমের ক্ষেত্রেও একই রকম সমস্যা লক্ষ করা যাচ্ছে। খুলনার মোংলার মিরাজ শেখকে ১০ এপ্রিল কোস্টগার্ডের পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এটিকে গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম গুমের অভিযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এ অভিযোগে কোস্টগার্ডের দায় চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমনটা হয়তো বলা যাবে না। কিন্তু অভিযোগটি অসত্য প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার সেটিকে হিসাবের বাইরে রাখতে পারে না। একজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন এবং তাঁর পরিবারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে—এমন অবস্থায় ‘গুম ঘটেনি’ বলা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই বাহিনীগুলোকে ‘ডিফেন্ড’ করে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য তদন্তের ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের বদলে সেই বক্তব্যকে সঠিক প্রমাণ করাই তখন বাহিনীর দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াবে। তবে সমস্যা শুধু বক্তব্যে নয়; অভিযোগ ও ঘটনাগুলোকে অস্বীকার করার প্রবণতা আরো বড় সমস্যা ।

আরও পড়ুন

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে প্রথমে অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতে হবে। তারপর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার সত্যি সত্যি ‘ক্রসফায়ার’, গুম বা হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করতে চাইলে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে বাহিনীর কর্মকাণ্ডে ও জবাবদিহিতে।

অপরাধ দমনে মানুষ পুলিশের কার্যকারিতা দেখতে চায়। সে প্রত্যাশাকে ‘ক্রসফায়ার’-এর পক্ষে সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আইজিপির বিতর্কিত বক্তব্যের পর দুই মৃত্যু যে প্রশ্ন তৈরি করেছে, তার কেন্দ্রে আছে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। সরকার ও বাহিনীর নেতৃত্বকে কাজে প্রমাণ করতে হবে, কঠোরতা মানে প্রাণ কেড়ে নেওয়া নয় এবং দায় এড়িয়ে যাওয়ার পুরোনো পথ আর খোলা নেই।

  • মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

মতামত লেখকের নিজস্ব