সুন্নতে রাসুল (সা.)–এর অনুসরণই কোরআনের বাস্তবায়ন

ধর্ম

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নবী ও রাসুল পাঠিয়েছেন এবং ওহি নাজিল করেছেন। কোরআনুল করিম হলো ‘ওহিয়ে মাতলু’, যা নামাজে তিলাওয়াত করা হয়; হাদিস শরিফ হলো ‘ওহিয়ে গয়রে মাতলু’, যা নামাজে পাঠ করা হয় না।

রাসুলে আকরাম (সা.)–এর জীবন হলো বাস্তব কোরআন। ইসলাম ও কোরআনের এমন কোনো ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়, যা নবী জীবনের বিপরীতে যায়।

সহজ সূত্র হলো, হজরত মুহাম্মদ (সা.)–কে মানাই হলো ইসলামকে মানা, আল্লাহকে মানা। হজরত মুহাম্মদ (সা.)–কে মানার অর্থ হলো হাদিস মানা। নবী করিম (সা.)–এর হাদিস মানে তাঁর কথা, কাজ ও সমর্থন। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, ‘আর রাসুলুল্লাহ (সা.) তোমাদের যা দিয়েছেন, তা তোমরা ধারণ করো, আর যা হতে তিনি বারণ করেছেন, তা হতে বিরত থাকো।

যিনি যাঁকে ভালোবাসেন, তিনি তাঁর চিন্তাচেতনার সঙ্গে একাত্ম হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) মহব্বতের নিদর্শন বা প্রমাণ হচ্ছে, জীবনের সব ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নতের অনুসরণ করা। প্রেমিক তো প্রেমাস্পদের অনুগতই থাকে

আর আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয় আল্লাহ কঠিন শাস্তি বিধানকারী।’ (সুরা-৫৯ হাশর, আয়াত: ৭) আল্লাহ জাল্লা শানুহু আরও বলেন, ‘যে রাসুল (সা.)–এর আনুগত্য করল ,অবশ্যই সে আল্লাহর আনুগত্য করল।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৮০)

দ্বীন ইসলামের ওপর চলা মানে কোরআন সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা। এ জন্য দুটি অবস্থা রয়েছে: হয় ইজতিহাদের সামর্থ্য নিয়ে কোরআন–সুন্নাহ নিজে বুঝে আমল করতে হবে; আর তা না হলে কোনো মুজতাহিদকে (যিনি কোরআন–সুন্নাহ সঠিকভাবে বোঝেন তাঁকে) অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘তোমরা যদি না জানো, তবে জাননেওয়ালার কাছে জিজ্ঞাসা করো।’ (সুরা-১৬ নহল, আয়াত: ৪৩)

সহজ কথা হলো, পবিত্র কোরআনুল করিম বোঝার জন্য হাদিস, ফিকহ, সিরাত, ইতিহাস, উসুলে তফসির, উসুলে হাদিস, উসুলে ফিকহ এবং আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা জরুরি। কোরআন বোঝার জন্য অন্তত ১৪ থেকে ৪২ ধরনের বিদ্যায় পারদর্শী হতে হয়। নচেৎ বিভ্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা প্রবল। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জাত বলেন, ‘এর দ্বারা অনেকে পথভ্রষ্ট হয় এবং অনেকে সুপথপ্রাপ্ত হয়। ফাসিকরাই এর মাধ্যমে বিপথগামী হয়।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২৬)

মূল কথা হলো রাসুল (সা.)–এর জন্য ভালোবাসা ইমানের অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘(হে নবী!) বলুন, যদি তোমরা আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চাও, তাহলে আমাকে অনুসরণ করো। তবে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ৩১) হজরত আনাস (রা.) বলেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি (নবীজি সা.) তার নিকট তার বাবা, সন্তান ও সব মানুষ থেকে প্রিয় হব।’ (বুখারি: ১৩-১৪)

আনুগত্যেই ভালোবাসার প্রমাণ। ভালোবাসা মানে নিজের সবকিছু সমর্পণ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে আমার সুন্নতকে ভালোবাসে, সে আমাকেই ভালোবাসে; যে আমাকে ভালোবাসে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গে থাকবে। (মুসলিম: ২৭২৬)

এক ব্যক্তি রাসুলে করিম (সা.)–কে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! কিয়ামত কবে হবে? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, তুমি কি প্রস্তুতি নিয়েছ কিয়ামতের জন্য? সে জবাব দিল, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)–কে ভালোবাসি। তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘যে ব্যক্তি যাকে ভালোবাসে, তার সঙ্গেই তার হাশর হবে।’ (মুসলিম: ২৬৪০) হজরত আনাস (রা.) বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর আমাদের কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় ছিল নবী করিম (সা.)–এর এই কথা। তারপর হজরত আনাস (রা.) বলেন, আর আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)–কে ভালোবাসি। আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)–কেও ভালোবাসি। যদিও আমি তাঁদের মতো আমল আমি করতে পারিনি। (মুসলিম: ২৬৩৯)

যিনি যাঁকে ভালোবাসেন, তিনি তাঁর চিন্তাচেতনার সঙ্গে একাত্ম হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) মহব্বতের নিদর্শন বা প্রমাণ হচ্ছে জীবনের সব ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নতের অনুসরণ করা। প্রেমিক তো প্রেমাস্পদের অনুগতই থাকে। (শরহুজ জুরকানি আলাল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১১৮)

নবী করিম (সা.)–এর ভালোবাসার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কিরাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিলেন। হজরত আবু সুফিয়ান (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগেই বলেছেন, ‘আমি কাউকে এতটা ভালোবাসতে দেখিনি, মুহাম্মদ (সা.) কে তাঁর সঙ্গীরা যত ভালোবাসেন।’ (সিরাতে ইবনে হিশাম, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৭২; আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, মুহাম্মদ ইবনে কাসির, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৬৫)

কোরআন মাজিদের সেই ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য, যে ব্যাখ্যা নবীয়ে আকরাম (সা.) করেছেন এবং সাহাবাগণ, তাবিয়িন ও তাবে তাবিয়িন, যা আমল করেছেন। ইসলামের সেই ধারাই বিশুদ্ধ, যা নবীজি (সা.)–এর যুগ থেকে নিরবচ্ছিন্ন পরম্পরাসূত্রে চলে এসেছে।

  • মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

[email protected]