জিডি তদন্তে আদালতের অনুমতি, জনভোগান্তি কমল নাকি বাড়ল

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, থানায় জিডি করার পর বিপুলসংখ্যক অভিযোগকারী আদালতে উপস্থিত হন না। অনেকেই জানেন না যে তদন্ত শুরুর জন্য তাঁকে আদালতে যেতে হবে।ছবি: এআই কোলাজ

বাংলাদেশে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) কেবল একটি আনুষ্ঠানিক নথি নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রে একজন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম আইনি আশ্রয়।

প্রাণনাশের হুমকি, খুন-জখমের আশঙ্কা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অন্যান্য অ-আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে মানুষ ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার প্রত্যাশায় থানায় জিডি করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রত্যাশিত সেবা সময়মতো নিশ্চিত হয় না।

এর অন্যতম কারণ, বিদ্যমান আইনি কাঠামো, যেখানে অ-আমলযোগ্য অপরাধসংক্রান্ত জিডির তদন্ত শুরু করার আগে আদালতের অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক।

প্রশ্ন হলো, এই বিধান বর্তমান বাস্তবতায় কতটা কার্যকর? বিচারিক তদারকির স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখেও কি নাগরিককে আরও দ্রুত ও কার্যকর সেবা দেওয়ার কোনো পথ নেই? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার সময় এখন এসেছে।

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর–এর ধারা ১৫৫-এ অ-আমলযোগ্য অপরাধের তদন্ত সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।

আরও পড়ুন

ধারা ১৫৫ (১) অনুযায়ী, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে যদি কোনো অ-আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য আসে, তবে তিনি তা নির্ধারিত রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করবেন এবং অভিযোগকারীকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাবেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ধারা ১৫৫ (২), যেখানে বলা হয়েছে—প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া কোনো পুলিশ কর্মকর্তা অ-আমলযোগ্য মামলার তদন্ত করতে পারবেন না।

অর্থাৎ অভিযোগ থানায় এলেও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত শুরু করতে পারে না; আদালতের অনুমতিই তদন্তের পূর্বশর্ত। এরপর ধারা ১৫৫ (৩) অনুযায়ী আদালতের অনুমতি পেলে পুলিশ তদন্ত পরিচালনা করতে পারে, তবে ওয়ারেন্ট ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা থাকে না।

অন্যদিকে একই আইনের ধারা ১৫৬ পুলিশকে আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের পূর্বানুমতি ছাড়াই তদন্ত শুরু করার ক্ষমতা দিয়েছে।

আরও পড়ুন

এই বিধানের পেছনে আইনপ্রণেতার উদ্দেশ্য ছিল বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করা এবং অ-আমলযোগ্য বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় পুলিশি হস্তক্ষেপ সীমিত রাখা।

সেই উদ্দেশ্যের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু আইন কেবল নীতিগতভাবে সঠিক হলেই যথেষ্ট নয়; বাস্তবেও তা নাগরিকের জন্য কার্যকর হতে হয়। আর এখানেই বর্তমান ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, থানায় জিডি করার পর বিপুলসংখ্যক অভিযোগকারী আদালতে উপস্থিত হন না। অনেকেই জানেন না যে তদন্ত শুরুর জন্য তাঁকে আদালতে যেতে হবে।

কেউ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন, কেউ কর্মব্যস্ততার কারণে যেতে পারেন না, আবার কেউ ভয় বা অনাগ্রহের কারণে আদালতে হাজির হন না।

অনেক ক্ষেত্রে থানা থেকে সমন বা মৌখিকভাবে জানানো হলেও নির্ধারিত দিনে অভিযোগকারী আদালতে উপস্থিত হন না। ফলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি পাওয়া যায় না এবং পুলিশও আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে তদন্ত শুরু করতে পারে না।

আরও পড়ুন

এখানেই সৃষ্টি হয় একটি বাস্তব বৈপরীত্য। একদিকে নাগরিক থানায় এসে রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন, অন্যদিকে আইনের একটি প্রক্রিয়াগত শর্ত পূরণ না হওয়ায় সেই আবেদন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

অভিযোগকারী মনে করেন, পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না; আবার পুলিশ মনে করে, আদালতের অনুমতি ছাড়া তার কিছু করার নেই।

ফলে যে আইনি বিধান নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য করা হয়েছিল, বাস্তবে সেটিই অনেক ক্ষেত্রে নাগরিককে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত করছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রাণনাশের হুমকি, খুন-জখমের আশঙ্কা বা গুরুতর ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অভিযোগকারী ব্যক্তিরা।

অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত, তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, তাহলে বহু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। এই আলোচনার উদ্দেশ্য আদালতের ক্ষমতা বা বিচারিক তদারকির গুরুত্বকে খাটো করা নয়।

এসব জিডির উদ্দেশ্যই হলো সম্ভাব্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই রাষ্ট্রকে সতর্ক করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা।

কিন্তু তদন্ত শুরুর আগেই যদি আদালতের অনুমতির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে সেই প্রতিরোধমূলক উদ্দেশ্য অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়ে যায়।

বিরোধ আরও তীব্র হয়, উত্তেজনা বাড়ে, কখনো কখনো হামলা বা গুরুতর অপরাধও সংঘটিত হয়। পরে তদন্ত শুরু হলেও ক্ষয়ক্ষতি আর পূরণ করা যায় না।

অথচ বাস্তবে আমরা ভিন্ন চিত্রও দেখি। নিখোঁজ ব্যক্তির জিডির ক্ষেত্রে পুলিশ সাধারণত আদালতের অনুমতির জন্য অপেক্ষা না করে তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান শুরু করে।

কারণ, সেখানে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময় নষ্ট হলে একজন মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে। একই যুক্তি প্রাণনাশের হুমকি বা সহিংসতার আশঙ্কাসংক্রান্ত জিডির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত, তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, তাহলে বহু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। এই আলোচনার উদ্দেশ্য আদালতের ক্ষমতা বা বিচারিক তদারকির গুরুত্বকে খাটো করা নয়।

বরং প্রশ্নটি হলো—তদন্ত শুরুর আগেই আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত, নাকি তদন্ত শেষে আদালতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের মাধ্যমে বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করাই অধিক কার্যকর হতে পারে?

বিচারিক তদারকি অবশ্যই থাকতে হবে; তবে সেটি এমন হওয়া উচিত, যাতে নাগরিক দ্রুত সেবা থেকে বঞ্চিত না হন।

বিশেষ করে প্রাণনাশের হুমকি, খুন-জখমের আশঙ্কা, গুরুতর ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা জননিরাপত্তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট ধরনের জিডির ক্ষেত্রে আইনি সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।

এসব ক্ষেত্রে পুলিশকে আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়াই সীমিত পরিসরে তদন্ত শুরু করার ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে।

তদন্ত শেষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হলে বিচারিক তদারকি অক্ষুণ্ণ থাকবে, আবার তদন্তও অযথা বিলম্বিত হবে না। এতে আইনের শাসন ক্ষুণ্ণ হবে না; বরং নাগরিকবান্ধব আইন প্রয়োগ আরও শক্তিশালী হবে।

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। অপরাধের ধরন বদলেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, নাগরিকের প্রত্যাশাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তাই বহু বছর আগে প্রণীত আইনের কিছু বিধান বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দায়িত্ব।

আইন স্থির নয়; সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আইনেরও পরিমার্জন হওয়া উচিত।

এই মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু আইনবিদ বা নীতিনির্ধারকদের মতামতই নয়, মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের বাস্তব অভিজ্ঞতাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কারণ, তাঁরা প্রতিদিন নাগরিকের অভিযোগ গ্রহণ করেন, আইনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন এবং বাস্তব সমস্যাগুলো সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেন।

একই সঙ্গে বিচার বিভাগ, আইনজীবী, গবেষক ও সাধারণ মানুষের মতামতও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

একটি কার্যকর ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু বিচার নিশ্চিত করা নয়, বরং সম্ভাব্য অপরাধ প্রতিরোধ করাও। জিডি সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

যদি আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে সেই হাতিয়ার কার্যকারিতা হারায়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

সুতরাং ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৫৫-এর বর্তমান প্রয়োগ, বিশেষ করে প্রাণনাশের হুমকি ও জননিরাপত্তাসংক্রান্ত জিডির ক্ষেত্রে, নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, নাগরিকের প্রত্যাশা এবং বিচারিক তদারকির মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।

আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের কাছে ন্যায়বিচারকে আরও দ্রুত, কার্যকর ও সহজলভ্য করা। সেই লক্ষ্যেই জিডি তদন্তে আদালতের পূর্বানুমতির বর্তমান বিধান নিয়ে এখন গভীর, দায়িত্বশীল ও সময়োপযোগী জাতীয় আলোচনা শুরু হওয়া প্রয়োজন।

  • মো. ইমরান আহম্মেদ, লেখক ও গবেষক।
    ই–মেইল: [email protected]
    *মতামত লেখকের নিজস্ব।