
শিরোনামটি সত্তরের দশকে মুক্তি পাওয়া আয়না ও অবশিষ্ট ছায়াছবির, সত্য সাহার সুরে, ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া জনপ্রিয় একটি প্রেমের গানের প্রথম লাইন। সুদূর নিউ জার্সিতে অনলাইনে প্রথম আলো ও অন্যান্য সংবাদপত্রে একজন
সৎ সরকারি কর্মকর্তার নিগ্রহের সংবাদ পড়ে গানের কলিটি মনে পড়ে গেল।
সংবাদটি সংক্ষেপে এ রকম, ‘সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারীরা দাবি জানানোর এক সপ্তাহের মাথায় চট্টগ্রাম কাস্টমসের একজন সহকারী কমিশনারকে ট্রেনিং একাডেমিতে বদলি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। চট্টগ্রাম বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় কাস্টমসের সহকারী কমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আবদুল আহাদের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারীরা এবং তাঁর কক্ষের বাইরে লাগানো নামফলক খুলে নেন।’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সহকারী কমিশনার আহাদ এক টাকাও ঘুষ চাননি বা নেননি কখনো।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কাস্টমস কর্মকর্তা বলেন, ‘আবু হানিফ মোহাম্মদ আবদুল আহাদ কাস্টমসের আনস্টাফিং শাখায় দায়িত্ব পালনের সময় রাজস্ব ফাঁকির অসংখ্য ঘটনা উদ্ঘাটন করেন এবং মোট ১৩২টি
চালানে ৪৩ কোটি টাকার ফাঁকি শনাক্ত করেন। এসব রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় আমদানিকারকদের জরিমানা করা হয়। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। এই বিক্ষোভ ছিল পরিকল্পিত।’ (প্রথম আলো)।
এখন, এ ঘটনা আমার মনের আয়নায় কেন ছায়াপাত করল সে কথায় আসছি। ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে আমি চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনে সহকারী কালেক্টর (এখন কমিশনার) পদে যোগদান করি। আমাকে সহকারী কালেক্টর (জেটি-২) হিসেবে পদস্থ করা হয়। বন্দরের কয়েকটি জেটিতে পণ্যের কায়িক পরীক্ষা করা এবং সল্টগোলা শুল্ক গুদামে দীর্ঘদিন অ–খালাসকৃত পণ্যের নিলাম তদারক করা আমার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সাধারণত দুইভাবে আমদানি করা পণ্য শুল্কায়ন ও খালাস করা হয়ে থাকে। ফার্স্ট আপ্রেইজমেন্ট পদ্ধতিতে বিল অব এন্ট্রি দাখিলের পর, দলিলপত্রের ভিত্তিতে শুল্কায়ন সম্পন্ন করার পর পণ্য চালানের একটি ক্ষুদ্র অংশ পরিদর্শন সাপেক্ষে খালাস প্রদান করা হয়। সাধারণত পণ্যের এইচ, এস কোড বা মূল্য সম্পর্কে সংশয় না থাকলে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অন্যদিকে, সেকেন্ড আপ্রেইজমেন্ট পদ্ধতিতে পণ্যের এইচ, এস কোড বা মূল্য সম্পর্কে সংশয় থাকলে আগে পণ্য পরীক্ষা করে পরে শুল্কায়ন ও খালাস করা হয়। এ ছাড়া আমদানিকারকও সেকেন্ড আপ্রেইজমেন্ট চাইতে পারেন। উভয় ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সেকেন্ড আপ্রেইজমেন্ট পদ্ধতিতে পণ্যের কায়িক পরীক্ষা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পণ্যের কায়িক পরিদর্শনের মূল দায়িত্ব অ্যাপ্রেইজার ও প্রিন্সিপাল অ্যাপ্রেইজারের। সহকারী কমিশনার এ–সম্পর্কিত প্রতিবেদনে প্রতিস্বাক্ষর (কাউন্টার সাইন) করে থাকেন।
যা হোক, চাকরিতে যোগদানের পর আমি কৌতূহলবশত পণ্য পরীক্ষা করে দেখতে আগ্রহ ব্যক্ত করি। আমার সঙ্গে কর্মরত দুজন প্রিন্সিপাল অ্যাপ্রেইজারই বললেন, ‘যাবেন স্যার? ওখানে শেডের ভেতর বেশ গরম, বসার জায়গা নেই। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। আমরাই দেখে রিপোর্ট দেব। আপনি শুধু কাউন্টার সাইন করলেই চলবে।’ যা হোক, আমার পীড়াপীড়িতে তাঁরা আমাকে পণ্য পরীক্ষায় নিয়ে যান। প্রথম দিনই আমি পণ্যের ঘোষণা ও পরিদর্শনের মধ্যে বেশ কিছু অনিয়ম দেখতে পাই। দিনের শেষে আমার দুজন প্রিন্সিপাল অ্যাপ্রেইজার ও নিলাম গোলার দায়িত্বে থাকা দুজন প্রিভেন্টিভ সুপারিনটেনডেন্ট দেখা করেন। তাঁদের হাতে দুটি খাম। অকপটে তাঁরা আমাকে বললেন, এখানে পণ্য পরিদর্শন ও নিলাম–সম্পর্কিত কাজের জন্য কিছু কালেকশন হয়ে থাকে। এটা আমার হিস্যা। এর পরিমাণ দিন ভেদে কমবেশি হয়ে থাকে। বিশেষ করে পাম অয়েল, সিমেন্ট, সেকেন্ড হ্যান্ড ক্লথিং, চিনি প্রভৃতির কায়িক পরীক্ষণ হলে বাড়তি আদায় হয়।
লোভ হতে পারে ভেবে খাম দুটি না খুলেই তাঁদের ফেরত দিলাম। তাঁদের প্রসন্ন মনে হলো না। আমি যথারীতি পণ্য পরিদর্শন করতে লাগলাম। পরদিন বিকেলে একদল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আমার সঙ্গে দেখা করে বললেন, আমার পণ্য পরীক্ষার জন্য জেটিতে যাওয়ার বিষয়টি তাঁরা ভালোভাবে দেখছেন না। এতে তাঁদের পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে। তাঁরা যেকোনো মুহূর্তে জেটি সরকারদের (ক্লিয়ারিং এজেন্টদের প্রতিনিধি) কর্মবিরতির আশঙ্কা করছেন। আমি তাঁদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম যে আমার পণ্য পরীক্ষার ফলে তাঁদের রিপোর্ট পেতে দেরি হবে না এবং এর জন্য কোনো টাকাপয়সাও দিতে হবে না। তৎসত্ত্বেও তাঁরা চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনের কালেক্টরের সঙ্গে দেখা করে আমার নামে অভিযোগ করলেন।
যা হোক, জেটিতে সমস্যা না হলেও গোলমাল বাধল নিলাম নিয়ে। সল্টগোলার সামনে প্রকাশ্যে নিলাম ডাক হচ্ছে। বিস্মিত হলাম একেকটি ফ্রিজের নিলাম মূল্য দেখে। তখন ১৯৮০ সাল। প্রতিটি ফ্রিজের দাম উঠল ২৩ হাজার টাকা। কয়েক দিন আগে, বিপণিবিতানে একই ফ্রিজের দাম দেখে এসেছি ৬ হাজার টাকা। আমার সরকারি বাসাটি ছিল সল্টগোলার কর্মস্থলের পাশেই। তাই দুপুরে বাসায় খেতে যেতাম। খেয়ে সরকারি গাড়িতে ফিরছি। দেখলাম, সেদিন বিক্রি হওয়া ফ্রিজ ডেলিভারি হচ্ছে। কৌতূহলবশত ফ্রিজটি দেখতে চাই। সবার প্রবল আপত্তির মুখে ট্রাকের ওপর উঠে ফ্রিজটির ডালা খুলতেই একগাদা অটো-পার্টস বেরিয়ে আসে। ফ্রিজের অস্বাভাবিক নিলাম মূল্যের কারণটি আমার কাছে স্পষ্ট হয়। আমার এহেন ‘দুর্ব্যবহারের’ প্রতিবাদে, নিলাম ক্রেতারা পরবর্তী তিন নিলামে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। আমার সৌভাগ্য, কালেক্টর শাহ এম আবুল হোসাইন (পরবর্তী সময়ে মেহেন্দীগঞ্জ থেকে বিএনপির এমপি এবং অর্থ প্রতিমন্ত্রী) আমার পাশে দাঁড়ান। ফলে নিলাম বয়কট ব্যর্থ হয়। পরবর্তী কালেক্টর এস এম আকরামও (পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে আওয়ামী লীগের এমপি) আমাকে অনুরূপ সুরক্ষা প্রদান করেন। ফলে আমাকে চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনে অস্বাভাবিকভাবে বদলি হতে হয়নি।
এর ব্যতিক্রমও ছিল। আমার কাছ থেকে ‘কাঙ্ক্ষিত’ সহায়তা না পেয়ে একজন কালেক্টর আমাকে কেবল বদলি করেই ক্ষান্ত হননি; তিনি আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আনেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের তৎকালীন সচিব শেগুফতা বখত চৌধুরী, সামরিক ও বেসামরিক তিনটি সংস্থা দিয়ে তদন্ত শেষে, সংশিষ্ট কালেক্টরকে আমাকে অন্যায়ভাবে বদলি করার জন্য তিরস্কার করেন এবং তদন্তাধীন থাকায় মুলতবি হয়ে থাকা আমার বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদনে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামানের অনুমোদন নিয়ে অনুমতি প্রদান করেন।
এখন দিন বদলেছে। কালেক্টর, সচিব ও মন্ত্রী মহোদয়েরা এখন প্রায়ই সৎ সরকারি কর্মকর্তাদের পাশে দাঁড়ান না। এ ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আবদুল আহাদের বদলির আদেশটি অনেকটা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রের মতো। আরও অবাক হয়েছি পত্রিকায় ঘুষের প্রতি ইঙ্গিত করে অর্থমন্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি বলেছেন, ‘যেটা কোনো কাজের গতি আনে, আমি মনে করি সেটা অবৈধ নয়। কারও কাজ দ্রুত করে দিয়ে উপহার নিলে সেটা অবৈধ মনে করা হয়। কিন্তু আমি মনে করি কাজ দ্রুত করায় যদি কেউ কাউকে উপহার হিসেবে কিছু দেয়, তবে তা অবৈধ নয়।’
আমাদের সময়ে বলা হতো, কর্মকর্তাদের ন্যূনতম মানের জীবনধারণের উপযোগী বেতন–ভাতা না দিলে কর্মকর্তারা
দুর্নীতি করবেন না তো কী করবেন? আসলেই তখন বেতন–ভাতার অবস্থা ছিল করুণ। ভেবেছিলাম, বেতন কমিশন ও কর্মকর্তাদের অন্যান্য সুবিধা বাড়া এবং প্রশাসনিক ও পদ্ধতিগত সংস্কারের ফলে শুল্ক বিভাগের দুর্নীতি কিছুটা হলেও কমবে।
আমাদের সময়েও ঘুষ নেন না এমন শুল্ক ও ভ্যাট ক্যাডার কর্মকর্তার সংখ্যা হাতে গোনা যেত। দৈনিক যুগান্তর–এর ‘ঘুষের হাট চট্টগ্রাম কাস্টমস’ শিরোনামের প্রতিবেদন পড়ে মনে হলো, ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়লেও সংখ্যাটি আজও তা-ই আছে। খুবই দুঃখভারাক্রান্ত নিজের মনের কাছে নিজেরই প্রশ্ন, কী করলে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে? এত বেতন–ভাতা বৃদ্ধি, সংস্কার তাহলে কিসের জন্য?
বাংলাদেশে দুর্নীতি বিকাশের একটি অন্যতম কারণ হলো, আমাদের সমাজে যেসব সরকারি কর্মকর্তা জনস্বার্থ রক্ষার্থে কাজ করেন, আমরা তাঁদের মর্যাদা ও সুরক্ষা দিই না, বরং তাঁদের হয়রানি ও শাস্তির ব্যবস্থা করি। অথচ দেশের বিদ্যমান আইনেই সরকারি কর্মকর্তাদের সুরক্ষার বিধান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শুল্ক আইন, ১৯৬৯-এর ধারা ১৫৬ (৮৫) এবং ৯৮-এর অধীনে একজন শুল্ক কর্মকর্তার ন্যায়ানুগ কাজে বাধা দেওয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং একজন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হলে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ করা হলে সৎ সরকারি কর্মকর্তা নিগ্রহের এ ধরনের ঘটনা ঘটত না।
একই বিষয়ে দ্য ডেইলি স্টার–এর ‘স্ন্যাপশট অব রিয়েলিটি’ শিরোনামের সংবাদের সঙ্গে একটি ছবি ছাপা হয়েছে, যাতে সহকারী কমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আবদুল আহাদের ভূলুণ্ঠিত নামফলক দেখা যায়। আসলে তাঁর দপ্তরে হামলাকারীরা, সহকারী কমিশনার আবদুল আহাদকে নয়, আমাদের সরকার ও সমাজকে ভূলুণ্ঠিত করেছে।
আমরা অবিলম্বে সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল আহাদের বদলির আদেশটি প্রত্যাহারের জোর দাবি জানাচ্ছি এবং তদন্তসাপেক্ষে সংশিষ্ট অপরাধীদের শুল্ক আইন, ১৯৬৯ অনুযায়ী আর্থিক জরিমানা ও কারাদণ্ড দাবি করছি।
সহকারী কমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আবদুল আহাদ, আপনাকে কখনো চেনা-জানার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু বুঝতে পারছি আমাদের সময়ের তুলনায় আপনাদের কাজের পরিবেশ আরও বৈরী হয়েছে। কিন্তু একজন ক্ষমতাহীন বর্ষীয়ান নাগরিক হিসেবে আপনাকে অভিবাদন জানানো এবং অপরাধীদের শাস্তি দাবি করা ছাড়া আমরা আর কী-ইবা করতে পারি!
এম ফাওজুল কবির খান: সাবেক সচিব ও অধ্যাপক।