ফকির-ফোকরা, হাঁড়িতে ভাত নেই, শানকিতে ঠোকরা

মেধাবী ও খুব ভালো ছাত্র প্রশ্নপত্র কঠিন হলেও পরীক্ষায় পাস করবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। কিন্তু কার্যকর গণতন্ত্রে খুব বড় ও শক্তিশালী দলও যে প্রতিটি নির্বাচনে বিজয়ী হবেই—তা হলফ করে বলার উপায় নেই। কথাটা কূটাভাসের মতো শোনায়, কিন্তু ধ্রুব সত্য হলো, অনেক জনপ্রিয় নেতাও কখনো নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। সে জন্যই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাতিকে বিজয়ী করেও প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল পরাজিত হন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর ঐতিহ্যবাহী দল কংগ্রেসও পরাজিত হয়। পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এই ভয়ে নির্বাচন না দেওয়ার কৌশল খোঁজা অথবা কোনো বাঁকা পথে যাওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অপরাধ। একসময় কোনো নেতার সব দোষ ও দুর্বলতা মানুষ ভুলে যায়, তাঁর অনেক অপরাধও ক্ষমা করে, কিন্তু নির্বাচন বানচাল করার অপরাধটি জনগণ কোনো দিন ক্ষমা করে না। এ অপরাধ ক্ষমার সম্পূর্ণ অযোগ্য।
জাতির কোনো অমঙ্গল বা বিপর্যয়ের জন্য নেতাকেই মানুষ দোষারোপ করে। আসলে তা অনুচিত। নেতা জনগণ থেকে, তাঁর অনুসারী ও সমর্থকদের থেকে, আলাদা কেউ নন। জনগণের স্বভাব-চরিত্র আর নেতার স্বভাব-চরিত্রের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য হতে পারে না। জওহরলাল নেহরু যদি ভারতের শীর্ষ নেতা না হতেন, শুধু লেখালেখি করতেন তা হলেও তিনি হতেন উপমহাদেশের একজন প্রধান লেখক ও বুদ্ধিজীবী। তিনি একজন বড় ইতিহাসবিদ। তাঁর অবিস্মরণীয় গ্রন্থ গ্লিমসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রির একটি অধ্যায়ের শিরোনাম: ‘পার্লামেন্টারি পদ্ধতির ব্যর্থতা’। তাতে তিনি যা বলেছেন তা সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তিনি বলেছেন: ‘নেতাদের হয়তো দোষ আছে। কিন্তু নেতারা তো বর্তমান অবস্থারই সৃষ্টি। সাধারণত দেখা যায়, দেশের প্রকৃতি অনুসারে যেমন শাসক তার উপযুক্ত তেমনতর শাসকই তার ভাগ্যে এসে জোটে।’
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ কথা যে কত বেশি সত্য তা গত ৫০ বছরের ইতিহাসই বলে দেবে। ভবিষ্যতেও আমরা তেমন নেতৃত্বের দ্বারাই শাসিত হব, যেমন নেতৃত্বের আমরা উপযুক্ত। এই সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। আওয়ামী লীগের নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘যেকোনো সময় সংসদ বিলুপ্ত হতে পারে। নির্বাচনের ৯০ দিন আগে, অর্থাৎ ২৪ অক্টোবর সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হবে।’ মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন শনিবার বলেছেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো সমঝোতা না হওয়ায় জনমনে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। দেশ এক অনিবার্য সংঘাত ও সংঘর্ষের দিকে এগোবে। এতে দেশে অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপ আসতে পারে।’ এত বড় বড় নেতারা থাকতে দেশে সংঘাত অনিবার্য হবে কেন? অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপরই বা আশঙ্কা কেন? তা যদি হয়, তার দায় নেতারা কি এড়াতে পারেন?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন এবং মহাজোটের নেতারাও উপলব্ধি করছেন আগামী নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু হলে মহাজোটের ক্ষমতায় ফিরে আসা সম্ভব নয়। বিএনপির নেতৃত্বের জোটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি। তাতে মহাজোটের নেতারা বিচলিত। রাশেদ খান মেনন সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘বিএনপি-জামায়াত শাসনক্ষমতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে কেবল বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।’ প্রবীণ বাম নেতা আতঙ্কিত হলেও আঞ্চলিক শক্তি ভারত বাস্তবতা মেনে নিয়েছে। সে দেশের মিডিয়া থেকে জানা যাচ্ছে, ভারতের নেতারা এবং কর্মকর্তারা যেকোনো নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত। তবে আমরা মনে করি, বাংলাদেশে একটি অসাম্প্রদায়িক ও উদার গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে ভারত সরকার স্বস্তি বোধ করে। কিন্তু জনগণ যদি প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বকেই বেছে নেয়, কারও কিছু করার নেই। আর একটি নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
জনগণ কেন মহাজোট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তার কারণ নেতারা খোঁজার প্রয়োজন বোধ করেন না। প্রায় পাঁচটি বছর তাঁরা কথা দিয়েই চিড়া ভেজাতে চেয়েছেন। কথায় চিড়া ভিজলেও ভিজতে পারে, কিন্তু জনগণের মন ভেজে না। আর কথা যদি হয় হাপরের জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল, তা হলে তাতে জনগণের ব্রহ্মতালু না জ্বলে পারে না। জনগণ যে শুধু সরকারি দলের সাংসদ এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাদের হাত ও পায়ের কারণে বিরূপ তা নয়, তাদের বাগৈবদগ্ধ্যের কারণেও জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
মহাজগতের যেসব বিষয়ে আমেরিকার নাসার বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত কথা বলতে চাইবেন না, সে সম্পর্কেও মহাজোটের মুখপাত্রদের যদি জানতে চাওয়া হয় হড়হড় করে একরাশ মন্তব্য করে বসবেন। কারণ, তাঁদের বুকের ভেতর কথা আঁকুবাঁকু করে, কথা না বলে তাঁরা থাকতেই পারেন না। সাংবাদিকদের প্রশ্ন করা পর্যন্ত তাঁদের তর সয় না, নিজের থেকেই কথা ছেড়ে দেন বানের পানির স্রোতের মতো। সেসব কথায় যে মহাজোটের কপালে পেরেক ঠোকা হয়, সে বোধ তাঁদের বিধাতা দেননি।
মহাজোটের কারও কারও দুর্নীতির অভিযোগ শুধু বাংলার মাটিতে নয়, বিশ্বের মাটি থেকে উত্থাপিত হলো। সেটা যে-সে জায়গা নয়, বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তর। বিশ্বের মহাব্যাংকের এক ম্যাডাম মহাজোটের কারও কারও কিছু বাম হাতি কাজকারবার নিয়ে কথা বলতে বাংলার মাটিতে এলেন। তিনি সরেজমিনে দেখতে গেলেন পাটুরিয়ায় পদ্মাপাড়ে। নদীতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। নদীর ভেতরে ধু ধু বালুচর। বুঝতে পারলেন, এ নদী মহানদী। এই পদ্মার পেটের ওপর দিয়ে যে পুল হবে তাঁদের টাকায়, সেখানে মহাদুর্নীতি হওয়ার ষোলো আনা সম্ভাবনা। ম্যাডাম নাটকীয় স্বগতোক্তির মতো অদৃশ্য কারও উদ্দেশে বললেন, নো করাপশন, নো করাপশন, নো করাপশন। এই হতভাগা ছাড়া তাঁর উপস্থিতিতে সরকারের কেউ তাঁর প্রতিবাদ করলেন না। তা না করে পদ্মা সেতু নিয়ে মহাজোটের সাড়ে তিনজন সংশ্লিষ্ট কর্তা দেড় বছরে প্রায় সাড়ে তিন শ রকমের কথা বললেন। ফলে পদ্মা সেতু এক পরাবাস্তব পুলে পরিণত হলো। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখন টিভির পর্দায় দেখছি তার ওপর দিয়ে দ্রুতগতিতে ভারী যানবাহন পারাপার হচ্ছে।
লাখো শহীদের আত্মার আকুতি ছিল একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচার হোক। শহীদ পরিবারের বেদনা ও বিচারের প্রশ্নে তাঁদের প্রত্যাশার কথা না-হয় বাদই দিলাম। মহাজোটের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও ছিল। ট্রাইব্যুনাল গঠন করায় মানুষ আশান্বিত হয়। চিহ্নিত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করায় এবং তাঁদের বিচার-প্রক্রিয়া শুরু করায় বোঝা গেল সরকার তার কাজ করে যাচ্ছে। এরপর মহাজোটের মহামুখপাত্রদের ও-প্রসঙ্গে প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটি ও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর ফুটপাতে বসে মুখ খোলার দরকার ছিল না। কিন্তু তাঁদের বাণীর স্রোত কে রুধিবে দিয়ে বালির বাঁধ!
যুদ্ধাপরাধী হোক বা মানবতাবিরোধী অপরাধী হোক বা যেকোনো ধরনের অপরাধী হোক—আদালত যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রায় দেবেন। নির্বাহী বিভাগের কাজ তা কার্যকর করা। অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠরা যতই অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হোক, রায় মেনে নিতে তাঁরা বাধ্য। তা ছাড়া মানুষ লক্ষ করবে, অপরাধী কতটা আদিম বর্বর ও জঘন্য তা নয়—যাঁরা বিচার করছেন, তাঁরা কতটা সভ্য ও ন্যায়পরায়ণ। একাত্তরের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদ ও পরে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যখন আন্দোলন শুরু করে, তখন তাদের সহযোগিতা করার কাউকে পাওয়া যায়নি। এখন যখন কাজটি চূড়ান্ত রূপ নিতে যাচ্ছে, উগ্র কথাবার্তা বলার দরকারটা কী? এবং তাতে সরকারের এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কত বড় ক্ষতি হচ্ছে তা দেখার জন্য খুব বেশি দেরি করতে হবে না।
ফাঁসির আসামির রায় কখন কার্যকর হবে তা জেলখানার কারাধ্যক্ষও ২৪ ঘণ্টা আগে বলতে পারেন না। মহাজোটের মাননীয় মুখপাত্ররা অব্যাহতভাবে বলছেন অমুক সময়ের আগেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। যেকোনো স্পর্শকাতর বা বিতর্কিত বিষয়ে খুব সতর্কভাবে কথা বলাই উচিত। কিছু প্রসঙ্গে কোনো কথা বলার চেয়ে না বলাই ভালো। বাধ্য হয়ে বললেও ভাষার শব্দচয়ন হতে হবে খুবই যথাযথ। ভাবাবেগের প্রকাশ তো নয়ই। কার ফাঁসি ঈদ-উদ-জোহার পরে হবে আর কার ফাঁসি বকরি ঈদের আগে হবে—এসব তথ্য আগাম জানানোর প্রয়োজন কী?
শনিবার তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ‘জামায়াতের সাবেক রোকন বাচ্চু রাজাকার, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদরা ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধী। এ জন্য আদালত তাঁদের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন। ঈদের পরই আমরা রায় কার্যকর করব।’ [যায়যায়দিন] টিভি চ্যানেলগুলোও এ বক্তব্য সম্প্রচার করেছে। তিনি অতি দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত। তাঁর কথা তো কথার কথা নয়। আমরা দেশবাসী এজাতীয় কথা শুনতে অভ্যস্ত, কিন্তু বিদেশিরাও এসব কথা গুরুত্বসহকারে নেয়। বলাই বাহুল্য, এ ধরনের কথা শুধু যে তথ্যমন্ত্রীই বলেছেন তা নয়, আওয়ামী লীগের মুখপাত্ররাও প্রতিদিন বলছেন।
আধুনিক সভ্যতার বৈশিষ্ট্যই হলো রাষ্ট্রকে যেকোনো পরিস্থিতিতে মানবিক হতে হবে—ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বর্বর হতে পারে। পৃথিবীর একটি প্রাচীন সভ্য জাতি বাঙালি। হাজার বছরে কত মনীষী জন্মগ্রহণ করেছেন এই মাটিতে। অতীশ দীপঙ্কর থেকে রবীন্দ্রনাথ, শ্রীচৈতন্য থেকে লালন শাহ। কত মহামানব বাঙালির নৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। মানবতাবিরোধী নরপশুদের বিচার কোনো হিংসা-প্রতিহিংসা চরিতার্থ নয়। সেটা করতে হচ্ছে ন্যায়বিচারের স্বার্থে—কারও ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে নয়। কারও প্রতি বা কোনো গোষ্ঠীর প্রতি কারও ব্যক্তিগত আক্রোশ বা ক্রোধ থাকলেও থাকতে পারে, রাষ্ট্রের কাছে তা কোনো বিবেচ্য বিষয়ই নয়। সাংবিধানিক মোতাবেক রাষ্ট্র চলবে তার নিজস্ব গতিপথে।
সরকারি দলের সংসদ সদস্য জনাব নুরুল ইসলাম বিএসসি লিখিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আহ্বান, আপনি সবকিছু হারিয়েছেন। হারানোর আর কিছু বাকি নেই। যেকোনো মূল্যে আপনার সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কার্যকর করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করতে হবে। আপিলের রায় যদি মৃত্যুদণ্ড থেকে যায় তা কার্যকর করে এ নরপশুদের বঙ্গোপসাগরে মাছের খাদ্য হিসেবে নিক্ষেপ করতে হবে। যে দেশের প্রতি এদের মমতা নেই, এ দেশের মাটিতে এদের দাফনের সুযোগ নেই।...মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার হারানোর কিছুই নেই। নিজেকে তো আপনি জাতির জন্য উৎসর্গ করেছেন। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় কে আসবে-যাবে বড় কথা নয়। যেটা আপনি শুরু করেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, তা অবশ্যই শেষ করতে হবে। নতুবা জাতি আবার অন্ধকারে পতিত হবে। কোটি কোটি সমর্থক ও কর্মী বিএনপি-জামায়াতের হাতে নিগৃহীত হবে, শত শত বাড়িঘরে আগুন জ্বলবে।’ [‘বাংলার মাটিতে এদের কবর যেন না হয়’, যুগান্তর, ২১ জুলাই]
এসব বক্তব্য কোনো বাচাল ছেলেপেলে বললে কিছু বলার থাকে না। জনাব বিএসসি একজন সরকারি দলের নেতা ও সাংসদ। তিনি যা বলেছেন তা বিশেষ বেঠিক নয়। তবে একটু ভুলও করেছেন। যে যুদ্ধাপরাধীদের লাশ বঙ্গোপসাগরের মাছদের দিয়ে খাওয়াবেন, সেই সাগরের ভেটকি, রূপচাঁদা, বাগদা চিংড়ি প্রভৃতি বিত্তবান আওয়ামী লীগের নেতাদেরও প্রিয় খাদ্য। তাঁরা কত দিন ওই মাছ না খেয়ে থাকতে পারবেন?
দেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালনা করার একটা সুযোগ ছিল আওয়ামী লীগের। সেই সুযোগটি অতিবুদ্ধিবশত অথবা নির্বুদ্ধিতার কারণে নস্যাৎ হলো। এখন তাঁরা ভয় পাচ্ছেন ক্ষমতার বদল হলে দলের সমর্থক ও কর্মীরা নিগৃহীত হবেন এবং শত শত বাড়িঘরে আগুন জ্বলবে। তখন কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বসে থাকে? তা ছাড়া সেই আক্রমণ প্রতিরোধ করার শক্তি যে-দলের নেই, সে-দল দেশ চালাবে কী করে? জনপ্রিয়তা না-হয় হারালেন, নিজেদের আত্মবিশ্বাস এতটা হারালেন কীভাবে?
বর্তমান নির্বাচন কমিশনারদের কথাবার্তা মহাজোট নেতাদের মতোই। তাঁরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করলেও শুধু তাঁদের ওপর বিরোধী জোট ভরসা করতে পারছে না। মহাজোটও নিজেদের ছাড়া আর কারও ওপর ভরসা করতে পারছে না। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনে পরাজিত হওয়া কোনো লজ্জার ব্যাপার নয়। তা খুবই স্বাভাবিক। তবে এবার মহাজোট হারলে ছোট শরিক দলগুলোর ভবিষ্যৎ বিবর্ণ হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগের মতো ৬৪ বছরের পুরোনো দলের কিছুই যায়-আসে না। শুধু স্পিকারের বাঁ দিকে বসবেন। কিন্তু অপকৌশলের মাধ্যমে ‘আর একটিবার’ ক্ষমতায় যাওয়ার অপচেষ্টা করলেই দলটি শেষ হয়ে যাবে। তখন শুধু আওয়ামী লীগে নয়, দক্ষিণ এশিয়ায়ই দেখা দিতে পারে বিপর্যয়। তবে ক্ষমতায় যাওয়ার আশায় যাঁরা গোঁফে তা দিচ্ছেন, তাঁদের সম্পর্কেও আমাদের কিছু কথা আছে। সে বিষয়ে পরের বার।
১৮-দলীয় জোটের অথবা অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটের সরকারের চেয়ে যাঁরা অসাংবিধানিক শক্তিকে স্বস্তিকর ও শ্রেয় মনে করছেন তাঁরা খুব বড় ভুল করছেন। তখন কোনো নেতাই আর রাজা থাকবেন না, রাজনীতির ভিখেরিতে পরিণত হবেন। রাজনীতিকদের সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার একটি প্রাচীন প্রবচন মনে পড়ছে: ‘ফকির-ফোকরা, হাঁড়িতে ভাত নেই, শানকিতে ঠোকরা’। সুতরাং বিচার-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিন।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।