রক যেভাবে রেসলিংয়ের দুনিয়ায় পা রাখলেন

সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনয়শিল্পীদের একজন ডোয়াইন জনসন। রেসলিং–দুনিয়ায় যিনি ‘রক’ নামেই বেশি পরিচিত। দক্ষিণ আফ্রিকান কমেডিয়ান ও লেখক ট্রেভোর নোয়ার সঙ্গে এক পডকাস্টে সম্প্রতি নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন হলিউডের এই পরিশ্রমী অভিনেতা। পড়ুন নির্বাচিত অংশ।

ডোয়াইন জনসনছবি: ডোয়াইন জনসনের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

ছেলেবেলায় রেসলিং (কুস্তি) খুব ভালোবাসতাম। রেসলিং দেখেই বেড়ে ওঠা। সত্তর বা আশির দশকের শুরুতে রেসলিং দেখে যাঁরা বড় হয়েছেন, তাঁরা জানেন, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা একদমই অন‍্য রকম ছিল। অধিকাংশ মানুষই খেলাটাকে সত‍্যি বলে ধরে নিতেন। প্রতি সপ্তাহে পছন্দের তারকাকে দেখবে বলে টিভি খুলে বসে থাকতেন। গ‍্যালারির একদম সামনের সারিতে বসে বাবা ও দাদাকে রেসলিং করতে দেখেছি। তাই মনে হতো, এটার জন‍্যই হয়তো আমার জন্ম।

তবে সত‍্যি বলতে মাথায় পুরোপুরি রেসলিংয়ের ভূত চাপে যখন হাওয়াই থেকে আমাদের উচ্ছেদ করা হয়। একটা ছোট অ‍্যাপার্টমেন্টে থাকতাম। বয়স ১৩ কি ১৪। একদিন মায়ের সঙ্গে বাড়ি ফিরে দেখি, বড় একটা তালা ঝোলানো সঙ্গে নোটিশ। তাতে লেখা, এক সপ্তাহের মধ‍্যে বাড়ি ছাড়তে হবে। মা কাঁদতে শুরু করলেন। বাবা তখন রেসলিংয়ের জন‍্য টেনেসিতে ছিলেন।

ভাবছিলাম, কীভাবে মাকে সাহায‍্য করতে পারি। ছোটবেলা থেকে যাঁদের দেখে বড় হয়েছি, যাঁরা আমার ‘হিরো’, তাঁরা শক্তিশালী, বিশালদেহী ও পেশাদার কুস্তিগির। কিন্তু আমার তো ভালো লাগত ফুটবল। সেই সময় বুঝতে পারি, জীবনে কিছু করতে হলে আমাকে রেসলিংয়েই মন দিতে হবে। এভাবেই বদলে গিয়েছিল জীবনের লক্ষ‍্য।

ডোয়াইন জনসন
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

বাবার কাছে শেখা

আমার বাবা রকি জনসন ১৩ বছর বয়সে তাঁর বাবাকে হারিয়েছিলেন। কিছুদিন পরই বাবার মা অর্থাৎ আমার দাদি হাজির হয়েছিলেন এক বয়ফ্রেন্ডকে সঙ্গে নিয়ে। একদিন মাতাল হয়ে দাদির গায়ে হাত তুলে বসল সেই বয়ফ্রেন্ড। বাবা বসে থাকেননি। কোদাল দিয়ে মাটিতে একটা দাগ টেনে বলেছিলেন, ‘এই দাগের এ পাড়ে আসার চেষ্টাও যদি করো, আমার হাতেই তোমার মৃত্যু হবে।’ একটা ১৩ বছরের কিশোরের হুমকি লোকটা কানে তোলেনি। পা বাড়িয়েছে। বাবাও অপেক্ষা করেননি। কোদাল দিয়ে এক ঘা বসিয়ে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসেছে। এসে দাদিকে বলেছে, ‘লোকটা এখনো মরেনি। জ্ঞান ফিরে এলে দুটি ঘটনা ঘটতে পারে। হয় সে তোমার ছেলেকে মেরে ফেলবে, নয় তোমার ছেলের হাতে মারা পড়বে। একসঙ্গে দুজনকে নিয়ে তুমি থাকতে পারবে না। যেকোনো একজনকে তোমার বিদায় জানাতেই হবে।’

তারপর? দাদি আমার বাবার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘বেরিয়ে যাও।’ এভাবেই ১৩ বছর বয়সে বাবা পথে নেমে এসেছিলেন। গল্পটা কেন বললাম? বোঝানোর জন‍্য, আমার বাবার ভালোবাসার প্রকাশ ছিল একটু অন‍্য রকম। সেই মানুষটা আমাকে বড় করেছেন, প্রতিনিয়ত তৈরি করেছেন। ভোরবেলা ঘুম থেকে তুলে বলতেন, ‘চলো, জিমে যাই।’ আমি বলতাম, ‘জিমে গিয়ে আমি কী করব!’ সত‍্যিই তো, বয়স তখন মাত্র পাঁচ! তিনি বলতেন, ‘কিছু করতে হবে না। তুমি শুধু কোনায় বসে দেখবে।’ এভাবেই আমার বেড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন খুব কঠোর, কড়া...তাঁর ভালোবাসার প্রকাশটাই এমন।

মেয়ের সঙ্গে রক, ২০১৭ সালের ছবি
ছবি: ডোয়াইন জনসনের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

আমার পালা

এবার আমি যখন বাবা হলাম, মনে হলো নিজের বাবার কাছ থেকে তো অনেক কিছু শিখেছি। নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা। অন‍্যকে সম্মান করলে তুমিও সম্মান পাবে, তুমি যা, তা নিয়েই গর্বিত থাকো, গায়ের রং নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগো না ইত‍্যাদি। কিন্তু বাবা তো কখনো আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেননি, গালে চুমু খাননি। তাই এখন যখন মেয়েদের সঙ্গে খেলি, নিজেকে উজাড় করে দিই। ‘আমার মুখে রং করতে চাও? বেশ! যত রং আছে নিয়ে আসো!’

হ‍্যাঁ, বাবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। বাবা আমাকে গড়েছেন। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাকে পরিপূর্ণ করেছে আমার মেয়েরা। বাবার কাছে যা পাইনি, তা-ই আমার মেয়েদের দিতে চেষ্টা করি।

রকও ভেঙে পড়ে

সবার কাছে আমি শক্তিশালী পুরুষের প্রতীক। কিন্তু হ‍্যাঁ, কখনো কখনো আমিও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি, বিষণ্নতায় ভুগি।

২০ বছর আগেও জানতাম না, ‘মানসিক স্বাস্থ‍্য’ কিংবা ‘বিষণ্নতা’ বলে কিছু আছে। এখন জানি। এখন মানুষ অনেক সচেতন। আবার এটাও ঠিক, অনেকে ভাবেন, মন ভালো-খারাপ নিজের ওপর। চাইলেই আমি মন ভালো রাখতে পারি, আবার খারাপ রাখতে পারি। আদতে তো তা নয়। এটা তো সুইচ নয়, যে চাইলেই অন করব, অফ করব।

আরও পড়ুন

প্রথমবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম ১৮ বছর বয়সে, তখন ইউনিভার্সিটি অব মায়ামিতে পড়ি। সবকিছু ভালো চলছিল। এর মধ‍্যে হঠাৎ ইনজুরিতে পড়লাম, কাঁধের হাড় সরে গেল। ব্যস। মিটিং, অনুশীলন সবকিছু থেকে ছিটকে পড়লাম। একে তো প্রথমবার বাড়ি থেকে দূরে থাকা, তার ওপর ক্লাসেও যেতে পারছিলাম না। বিচ্ছিন্ন বোধ করতে শুরু করি। হতাশা পেয়ে বসে। এরপর আরও অনেকবার এমন হয়েছে। কখনো কারণ ছিল আর্থিক সমস্যা, কখনো বিচ্ছেদ।

কীভাবে এই সমস্যা সামাল দিতে হয়, বুঝতে অনেক সময় লেগে গেছে। বুঝেছি তখন, যখন টের পেয়েছি, ‘কথা বলার’ শক্তি কত প্রবল! তাই এখন ছেলে, মেয়ে, নারী, পুরুষ সবাইকে বলি, তোমার একটা সুপারপাওয়ার আছে। সেটা হলো সমস্যা যা-ই হোক, তুমি অন‍্যকে বলতে পারো। এই সুপারপাওয়ার কাজে লাগাও। মন খুলে দাও। সব সময় যে মন খারাপের কারণ তোমার জানতেই হবে, তা নয়। এমনও হতে পারে, দিনের পর দিন ঘুম থেকে উঠছ, কিছুই ভালো লাগছে না। প্রথমত, মনে রেখো, তুমি একা নও। পৃথিবীতে আরও বহু মানুষের এমন হয়। কথা বলো।