'মাথায় আমার আকাশ ভাইঙ্গা পড়ে'

‘যেদিন প্রথম জাইনতে পারলাম স্বামীর মতো আমারও এইডস হইছে। সেদিন কেবল মনে হইতেছিল, কেন বাঁইচা আছি! আমার মইরা যাওনই ভালো। কোন পাপ কইরছি যে এই রোগ হইব। সারা দিন খালি কানছি।’
কথাগুলো এইডসে আক্রান্ত রুপালী আক্তারের (ছদ্মনাম)। তাঁর সঙ্গে কথা হয় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত বেসরকারি সংস্থা আশার আলো সোসাইটিতে। এখানেই চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি। আবার এখানেই চাকরি করেন। তাঁর কাজ এইডসে আক্রান্ত রোগীদের কাউন্সেলিং করা।
২০০৪ সালের কোনো এক রোদঝরা সোনালি দিনে রুপালী জানতে পারেন এই নির্মম সত্য। দুঃখ-শোকে স্তব্ধ হয়ে যান। এর মাত্র দুই বছর আগেই তাঁর স্বামীর এই ঘাতকব্যাধি ধরা পড়ে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই এইডসে আক্রান্ত। এখন কী হবে। সংসার চলবে কীভাবে, সন্তানদের কী হবে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে রুপালীর।
শুরুতে প্রচণ্ড ধাক্কা খেলেও আস্তে আস্তে সামলে ওঠেন। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঘুরে দাঁড়ান। প্রচণ্ড মনের জোরে সংসারের হাল ধরেন। ১১ বছর ধরে এই রোগের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করে চলেছেন তিনি।
টাঙ্গাইলের ৩৪ বছরের এই নারী ফিরে যান অতীতে, স্মৃতি হাতড়ে খুঁজতে থাকেন সুখের সময়। রুপালী বলেন, ‘মাত্র ১৪ বছর বয়সে আমার বিয়া হয়। তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। স্বামীর বয়স ৩০ বছর। সে বিদেশে থাকত। বিয়া হইয়্যা গেল। বিয়ার ১৩ দিনের মাথায় স্বামী বিদেশে চলে যায়। ফিরা আসে প্রায় আড়াই বছর পর। এরপর আমার পোলা হয়। সুখেই কাটতে ছিল দিন। একদিন জানতে পারি আমার স্বামীর এইডস হইছে। মাথায় আমার আকাশ ভাইঙ্গা পড়ে। ভয়ে কাউরে বলতে পারি নাই। নিজের বাবা-মারেও বলি নাই। স্বামীরে নিয়া নানা হাসপাতালে যাই চিকিৎসার জন্য। এর মধ্যে আমার মাইয়্যার জন্ম হয়।’
বলতে বলতে থেমে যান রুপালী। কিছুক্ষণ চোখের পানি ফেলেন। আবার বলতে শুরু করেন। ‘স্বামীকে বাঁচাতে যখন সংগ্রাম করে বেড়াইতেছি, তখন একদিন জন্ডিসের টেস্ট করানোর জন্য আমি হাসপাতালে যাই। দেখা যায়, আমারও এইডস হইছে। আমি একেবারে ভাইঙ্গা পড়ি। তখন আমার স্বামী আমার পাশে দাঁড়ায়। এইডস হইলেও যে চিকিৎসা নিয়ে অনেক দিন বাঁইচা থাকা যায়, ভালো থাকন যায়, সে কথা আমারে বুঝায়।’
রুপালীর স্বামী প্রবাসে থাকার সময় এইডসে আক্রান্ত হন। অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। এ নিয়ে রুপালীর মনে অনেক কষ্ট-অনুতাপ থাকলেও কোনো অভিযোগ নেই স্বামীর বিরুদ্ধে। এমনকি কোনো দিন স্বামীকে বুঝতেও দেননি তাঁর মনের কথা। সংসারের কথা ভেবে কেবল চোখের পানি ফেলেছেন। শ্বশুরবাড়ি বা বাবার বাড়ির কারও কাছে বলতে পারেননি এই কথা। এলাকায় তাঁদের অসুখের কথা জানাজানি হওয়ার ভয়ে বাড়ি ছাড়েন তাঁরা। ঢাকায় থেকে স্বামীর চিকিৎসা করান। ২০১০ সালে স্বামী চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান।
রুপালীর ছেলেটি এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছে। আর মেয়ে পড়ছে চতুর্থ শ্রেণিতে। তবে বাচ্চা দুটি এইডসে আক্রান্ত নয় বলে সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তাঁর। অসুখের কথা, কেবল ছেলে আর রুপালীর বাবা-মা জানেন। রুপালীর অল্প আয়ে সংসার চলে না, বাবাই সব দেখভাল করেন বলে জানান। বাবা মারা গেলে সন্তানদের কী হবে ভেবে মাঝেমধ্যেই নির্ঘুম রাত কাটে তাঁর।
রুপালী স্বপ্ন দেখেন, এমন দিন আসবে যেদিন এইডস রোগীদের পরিবার-স্বজন ছেড়ে পালিয়ে থাকতে হবে না। তাঁরাও সমাজের অন্য সবার মতো স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারবেন। সবশেষে সরকারের কাছে রুপালীর অনুরোধ, বিদেশে যাওয়ার আগে যেন সবাইকে এইডস রোগ সম্পর্কে ভালোভাবে জানানো হয়। কারণ, এ রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই।