
ছোটবেলায় পরিবেশ পরিচিতি সমাজ বইয়ে পড়েছিলাম চিনামাটির পাহাড় বিজয়পুরের কথা। হঠাৎই বিজয়পুর যাওয়ার সুযোগ পেয়ে মনে পড়ে গেল আবার। সেটা জানুয়ারি মাসের কথা। সপরিবারে বেরিয়ে পড়লাম বইয়ের ছবি আর বাস্তব মিলিয়ে নিতে।

ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল। ওয়াইডব্লিউসিএ রেস্ট হাউসে ব্যাগ রেখে বের হলাম। এখানকার রিকশাচালকেরাই গাইডের কাজ করেন। রিকশায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দর্শনীয় জায়গার পরিচিতি দেওয়া শুরু করবেন। শুধু একটাই দোষ, রিকশাভাড়াটা চান অসম্ভব বেশি।
প্রথম গন্তব্য সোমেশ্বরী নদীর ধারে। তার টলটলে পানি দেখে মন ভরে গেল। জানা গেল, এর বালু বেশ কার্যকর দালানকোঠা নির্মাণে। এই শুষ্ক মৌসুমে নদীর বালুতে মিশে আছে কয়লা। সেই কয়লা তোলার কাজ শুরু হয় ভোর থেকেই।
বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা, এক পাশে সরু ফালির মতো বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা নদীটি। খেয়া নৌকায় পার হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। এই জায়গাটা নতুন যে কারও কাছে অপূর্ব। নদী-চর-গ্রাম নিয়ে যারা ‘অভিজ্ঞ’, তাদেরও ভালো লাগবে সোনালি-লাল বালু। নদী পার হয়ে ওপার থেকে রিকশায় বিজয়পুর সাদামাটির পাহাড়ে। নদী পারাপার নৌকায়। এই নৌকায় মানুষের পাশাপাশি মোটরসাইকেলও পার হয়।
বাহন তিন রকম—রিকশা, ভ্যান-রিকশা আর মোটরসাইকেল। যাত্রীবাহী মোটরসাইকেলের চল আছে এ অঞ্চলে। একজন চালক দুজন করে আরোহী নেন। দুর্গাপুর টঙ্ক আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত জায়গা। ভারতের সীমান্তবর্তী বিজয়পুর এবং আরও কিছু এলাকায় আছে সাদামাটির পাহাড়। এ সবই দেখেন পর্যটকেরা। টঙ্ক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ আছে। আন্দোলনে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের নাম লেখা আছে স্মৃতির মিনারে।
যানবাহন নিয়ে যাতে আমরা না ঠকি, তাই সোমেশ্বরীর ওপার পর্যন্ত এসেছেন কয়েকজন সাংবাদিক। দুটি রিকশায় যাত্রা শুরু, গন্তব্য বিজয়পুর সাদামাটির অঞ্চল, রানীখং মিশন, বিজিবি ক্যাম্প। যারা দর-কষাকষিতে পাকা তারা রিকশা নিজেরাই ঠিক করে নিতে পারে। রিকশাচালকেরা ১০০ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা চান। তারপর দুই রিকশা ৬০০ টাকায় রাজি হলো। কথায় কথায় জানা গেল, রিকশাচালকের স্ত্রী ঢাকার নামকরা একটি বিউটি পারলারে কর্মরত। এখানকার অনেক আদিবাসী নারীই ঢাকায় নানা পারলারে কাজ করেন। পুরুষেরা ওসব পারলারে দারোয়ানের কাজ করেন। গ্রামে এলে রিকশা চালান।
পৌঁছে গেলাম বিজয়পুর, রামকৃষ্ণ মিশন। গেরুয়া রঙের চমৎকার এক কারুকাজ করা দালান। মন ভরে যায়। রিকশাচালক জানান, সামনেই খ্রিষ্টানদের মিশন।
সাদামাটির পাহাড়গুলো একটার পর একটা, অনেক। উঁচু, মাঝারি, ছোট—সবগুলোর মাটিই একেবারে মিহি দানার ট্যালকম পাউডারের মতো। এসব পাহাড় থেকে মাটি নিয়েই তো বাংলাদেশের সিরামিক কোম্পানিগুলো চলে। কোনো পাহাড়ের মাটি লাল, বেগুনি এমনকি গোলাপি। পাহাড়ি রাস্তায় চোখে পড়ল আদিবাসীদের যাতায়াত। নারী আর শিশুই বেশি। পিঠে ঝুড়ি নিয়ে তারা যাচ্ছে সীমান্তের বাজারে। রানীখং যাওয়ার পথে পড়বে রাশমনি হাজং স্মৃতিসৌধ।
পাহাড়চূড়ায় গড়ে ওঠা মিশনটির পূর্বপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা পাহাড়ি নদী ‘সোমেশ্বরী’। পা বাড়ালেই ভারতের মেঘালয় রাজ্য। এখান থেকেই উপভোগ করা যায় পাহাড় আর মেঘের খেলা।
যেভাবে যাবেন
বিরিশিরি যাওয়ার জন্য ঢাকার মহাখালীর টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি বাস পাবেন। রাতে থাকার জন্য ওয়াইএমসিএ, ওয়াইডব্লিউসিএ, সরকারি ডাকবাংলো কিংবা দুর্গাপুর বাজারে অল্প খরচে থাকার ও খাবারের মোটামুটি ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। মনে রাখবেন, রিকশা, মোটরসাইকেল ও নৌকাই হচ্ছে ওখানে ঘুরে বেড়ানোর বাহন। সঙ্গে কিছু খাবার রাখা ভালো, কারণ, ওখানে যখন-তখন যেখানে-সেখানে আপনি খাবারের দোকান পাবেন না। আর একটা ব্যাপার, বাস থেকে নেমে ওদিক থেকে ঢাকায় ফেরার বাসের সময়সূচি জেনে নেবেন।