ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি রিচার, জমে উঠেছে লড়াই
(লেখাটিতে হালকা স্পয়লার আছে)
অ্যালান রিচসন অভিনীত জ্যাক রিচার আবারও ফিরেছেন। তবে এবারের গল্পে শুধু অ্যাকশন, রহস্য আর অপরাধীদের ধরার লড়াই নেই; রিচারের ব্যক্তিগত জীবনও এবার বড় এক বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে নারীকে দেখে তিনি সহানুভূতিশীল হয়েছিলেন, যাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই লিলা হথই শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এসেছেন ভয়ংকর এক খুনি হিসেবে।
চতুর্থ মৌসুমে এসে ‘রিচার’ তাই তাঁর পরিচিত ছক ভেঙেছেন। প্রতিটি মৌসুমে নতুন নারীর সঙ্গে রিচারের সম্পর্ক তৈরি হবে, কিছুটা ঘনিষ্ঠতা হবে, তারপর দুজন আলাদা হয়ে যাবেন—এত দিন সিরিজটির গল্পে এই ধারাই ছিল মোটামুটি অনুমেয়। এবার সেই প্রেমের গল্পই হয়ে উঠেছে ষড়যন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে চতুর্থ মৌসুমের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—জ্যাক রিচার কীভাবে এই বিপদ থেকে বের হবেন?
সবকিছুর শুরু একটি ট্রেন–যাত্রায়
চতুর্থ মৌসুমের শুরুতে গভীর রাতে ফিলাডেলফিয়ার পাতাল রেলে ওঠেন রিচার। ট্রেনের এক কোণে এক নারীকে অস্বাভাবিকভাবে কাঁদতে দেখে তাঁর সন্দেহ হয়, ওই নারী হয়তো আত্মঘাতী বোমা হামলা চালাতে পারেন।
পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন রিচার। নিজেকে পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ওই নারীর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। কিন্তু মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে যায়। নারীটি ব্যাগ থেকে বন্দুক বের করে নিজেকেই গুলি করেন।
শেষবার ওই নারীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন রিচার। ফলে তদন্তের শুরুতেই সন্দেহের তালিকায় চলে আসেন তিনি। এর মধ্যে আরও রহস্য তৈরি হয়। মৃত নারীর কাছে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্ল্যাশ ড্রাইভও পাওয়া যায় না।
পরে জানা যায়, ওই নারী আনা মেরিক, পেন্টাগনের মানবসম্পদ বিভাগের একজন কর্মী। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ চাকরি করলেও তাঁর কাছে ছিল অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য। সেই ফ্ল্যাশ ড্রাইভটি খুঁজছে একাধিক পক্ষ—সিআইএ, কংগ্রেসম্যান জন স্যাম্পসন এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা দুই রহস্যময় নারী।
রিচার বুঝতে পারেন, ঘটনাটি কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। এর পেছনে রয়েছে বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।
লিলা এলেন রিচারের জীবনে
এই তদন্তের মধ্যেই রিচারের পরিচয় হয় লিলা হথের সঙ্গে। লিলা তাঁর মা আমিশা হথকে নিয়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। তাঁদের দাবি, লিলার মার্কিন বাবা ১৯৯৮ সালের ইন্দোনেশিয়ার দাঙ্গার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাবার খোঁজ করতেই তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে আসা।
লিলার গল্প শুনে রিচারের সহানুভূতি তৈরি হয়। দুজনের মধ্যে দ্রুত আকর্ষণও জন্ম নেয়। একটি পর্বে তাঁরা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়ান।
দর্শকের কাছে প্রথম দিকে সবকিছুই মনে হয় ‘রিচার’–এর চেনা গল্পের মতো। একজন বিপদে থাকা নারী, তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসা রিচার এবং তাঁদের মধ্যে তৈরি হওয়া সম্পর্ক।
কিন্তু এবার গল্পটি অন্যদিকে মোড় নেয়।
রিচারের পুরোনো প্রেমের ছক ভাঙল
প্রথম মৌসুমে রিচারের জীবনে এসেছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা রস্কো কনক্লিন। দ্বিতীয় মৌসুমে ছিলেন তাঁর সাবেক সহকর্মী কার্লা ডিক্সন। তৃতীয় মৌসুমে ডিইএ কর্মকর্তা সুসান ডাফির সঙ্গে তৈরি হয় ঘনিষ্ঠতা। তিন মৌসুমেই একটি বিষয় মোটামুটি একই ছিল—রিচার কোনো নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবেন, তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি স্থায়ী হবে না।
রিচারকে অবশ্য প্রচলিত অর্থে ‘প্লেবয়’ বলা যায় না। তিনি খুব একটা রোমান্টিক মানুষও নন। বরং তাঁর জীবনে নারীদের আগমন সাধারণত কোনো তদন্ত বা বিপদের সূত্র ধরে। তারপর পরিস্থিতির কারণে তৈরি হয় আকর্ষণ। এই পুনরাবৃত্তিই হয়ে উঠেছিল সিরিজটির অন্যতম পরিচিত ‘ট্রোপ’ বা গল্পের ছক। চতুর্থ মৌসুমে নির্মাতারা সেটিই বদলে দিয়েছেন।
প্রেমিকা নন, লিলা আসলে খুনি
লিলার গল্পে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে খুব দ্রুত। একটি অপরাধে ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের বাঁকানো ছুরি—কারামবিট—চিহ্নিত হওয়ার পর জানা যায়, লিলা ও তাঁর মা আমিশা এই অস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ।
পঞ্চম পর্ব ‘ব্রিজ’–এ এসে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। লিলা ও আমিশা আসলে ঠান্ডা মাথার খুনি। তাঁদের মধ্যে হত্যার পর কোনো অনুশোচনাও নেই।
পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ, গাড়ি নিয়ে পালানো, নদীর তীব্র স্রোতে ঝাঁপ দিয়ে পুলিশের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া—সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়, তাঁরা যে পরিচয় দিয়েছেন, সেটি ছিল সাজানো।
আর সবচেয়ে বড় ধাক্কা রিচারের জন্য। কারণ, তিনি এত দিন লিলাকে একজন অসহায় নারী হিসেবে দেখেছেন। তাঁর প্রতি আকৃষ্টও হয়েছেন।
রিচার অবশেষে স্বীকার করতে বাধ্য হন, ‘আমি ভুল করেছিলাম।’ এই স্বীকারোক্তিই এবারের মৌসুমে তাঁর চরিত্রের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
ভুলটা শুধু লিলাকে বিশ্বাস করা নয়
রিচার সাধারণত তাঁর চারপাশের মানুষকে খুব দ্রুত পড়ে ফেলতে পারেন। কে মিথ্যা বলছে, কে বিপজ্জনক, কে কোনো তথ্য লুকাচ্ছে—এসব বুঝতে তাঁর বিশেষ দক্ষতা আছে। কিন্তু লিলার ক্ষেত্রে সেই দক্ষতাই যেন ব্যর্থ হয়েছে।
অ্যাগনেজ মো, যিনি লিলা চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তাঁর কাছে এই মোড়টি বিশেষ আকর্ষণীয়। কারণ, এতে শুধু লিলার আসল পরিচয় প্রকাশ পায় না, রিচারের চরিত্রেরও নতুন একটি দিক সামনে আসে। রিচার লিলার প্রতি সত্যিই আকৃষ্ট হচ্ছিলেন কি না—এই প্রশ্নও গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আগের মৌসুমগুলোতে রিচারের এমন আবেগপ্রবণ দিক খুব বেশি দেখা যায়নি।
লিলার চরিত্রটিও একমাত্রিক নয়। কখনো তিনি মানসিকভাবে অস্থির, কখনো সমাজবিরোধী, আবার কখনো আকর্ষণীয় ও প্রলোভনসংকুল। অ্যাগনেজ মো জানিয়েছেন, চরিত্রটি তৈরি করার সময় তিনি এই বিভিন্ন দিক নিয়েই কাজ করেছেন।
ফলে লিলা শুধু ‘ভিলেন’ নন; তিনি এমন একজন প্রতিপক্ষ, যিনি রিচারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটিকে কাজে লাগিয়েছেন।
এবার বিপদে রিচারের দল
লিলা ও আমিশার আসল পরিচয় জানার পর পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। রিচার, জ্যাকব মেরিক ও তামারা শেষ পর্যন্ত হথদের মুখোমুখি হন। কিন্তু হথরা আগেই একটি গুরুত্বপূর্ণ চাল দিয়ে রেখেছেন। তাঁরা জ্যাকবকে জিম্মি করে ফেলেন।
জ্যাকব হলেন আনা মেরিকের ভাই। নিজের ভাগনে বেনের হত্যার পর তিনি প্রতিশোধ নিতে মরিয়া। তামারা তাঁকে সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু জ্যাকব কথা শোনেননি।
এবার আমিশা তাঁর গলায় ছুরি ধরে দাঁড়ান। রিচার ও তামারা আত্মসমর্পণ না করলে এবং তাঁদের কাছে থাকা থাম্ব ড্রাইভটি না দিলে জ্যাকবকে হত্যা করার হুমকি দেন তিনি।
মজার ব্যাপার, রিচারের ধারণা ওই ড্রাইভটির কোনো মূল্যই নেই। অথচ সেটিই এখন হয়ে উঠেছে একজন মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
‘রিচার’ কি এবার নিজের ফর্মুলা ভাঙতে পারলেন
চতুর্থ মৌসুম নিয়ে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়াও একেবারে এক রকম নয়। কেউ এটিকে সিরিজের সেরা মৌসুমগুলোর একটি বলছেন, আবার কেউ মনে করছেন, এত দিন ধরে চলে আসা ফর্মুলা এখন কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
তবে লিলা হথের মোড়টি যে সিরিজের পরিচিত কাঠামো বদলে দিয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহ কম।
কারণ, এবার রিচারের প্রেমের গল্পের শেষটা শুধুই বিচ্ছেদ নয়। তাঁর ঘনিষ্ঠ হওয়া নারীই তাঁর অন্যতম বড় শত্রু।
এতে রিচারের চরিত্রেও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এত দিন রিচার ছিলেন প্রায় অজেয় এক নায়ক—শারীরিক শক্তি, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতায় যিনি প্রতিপক্ষের চেয়ে সব সময় এগিয়ে থাকেন। কিন্তু এবার তাঁকে বুঝতে হচ্ছে, সব বিপদ মুষ্টির জোরে সামলানো যায় না।
কখনো কখনো সবচেয়ে বড় বিপদ আসে এমন জায়গা থেকে, যেখানে মানুষ সবচেয়ে কম সন্দেহ করে।
রক্ত, রহস্য আর রাজনীতি
চতুর্থ মৌসুমের গল্প শুধু রিচার ও হথদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে আটকে নেই। সেই রহস্যময় ফ্ল্যাশ ড্রাইভের সূত্র ধরে সামনে আসছে আরও বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। সিআইএ থেকে শুরু করে কংগ্রেসম্যান, পেন্টাগনের গোপন তথ্য এবং ইন্দোনেশিয়ার অতীত—সবকিছু মিলিয়ে গল্পের পরিধিও এবার আগের চেয়ে বড়।
এর সঙ্গে রয়েছে সিরিজটির পরিচিত অ্যাকশন। বন্দুকযুদ্ধ, গাড়ির ধাওয়া, হাতাহাতি থেকে ছুরি নিয়ে লড়াই—সবই আছে। বরং এবারের মৌসুমকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে রক্তাক্ত মৌসুম বলেও অনেকে উল্লেখ করেছেন। তবে অ্যাকশনের পাশাপাশি রাজনৈতিক মন্তব্যও গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ রিচার এবার শুধু ‘নায়ক বনাম খলনায়ক’ গল্প নয়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং অতীতের গোপন ঘটনা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে আরও জটিল এক রহস্য।
কেউ কি নিরাপদ
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, সামনে কী অপেক্ষা করছে। মূল লি চাইল্ডের বই ‘গন টুমরো’ থেকে চতুর্থ মৌসুমে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফলে বইয়ের গল্প জানা দর্শকেরাও সবকিছু আগেভাগে অনুমান করতে পারবেন না।
রিচার নিজে মারা যাবেন—এমন আশঙ্কা অবশ্য খুব কম। কারণ, তাঁর উপস্থিতির সঙ্গে জড়িত আরও প্রকল্প রয়েছে এবং পঞ্চম মৌসুমের কাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু অন্যদের ভাগ্য নিয়ে নিশ্চয়তা নেই।
লিলা ও আমিশার নির্মমতা দেখার পর এখন মনে হচ্ছে, রিচারের আশপাশের কোনো চরিত্রই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বিশেষ করে জ্যাকব যেভাবে তাঁদের হাতে বন্দী, তাতে পরবর্তী পর্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় উত্তেজনা।
অ্যালান রিচসনের ‘রিচার’ কেন এত জনপ্রিয়
‘রিচার’–এর সাফল্যের কেন্দ্রে অবশ্যই অ্যালান রিচসন। বিশালদেহী এই অভিনেতা জ্যাক রিচার চরিত্রে এমন একটি উপস্থিতি তৈরি করেছেন, যেখানে খুব বেশি কথা না বলেও চরিত্রটি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
রিচারের শুষ্ক রসবোধ, আক্ষরিক অর্থে কথা নেওয়ার অভ্যাস এবং মুহূর্তে বিস্ফোরক হয়ে ওঠার ক্ষমতা চরিত্রটিকে অন্য অ্যাকশন নায়কদের থেকে আলাদা করেছে।
রিচার খুব কম কথা বলেন, কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে তাঁর একটি সংলাপই দৃশ্যের আবহ বদলে দেয়। আর যখন কথায় কাজ হয় না, তখন তাঁর মুষ্টি কথা বলে।
চতুর্থ মৌসুমেও এই বৈশিষ্ট্যগুলো অটুট। তবে এবার রিচারের চরিত্রে আরও বেশি আবেগ ও দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।
এ কারণেই লিলার প্রতারণা গুরুত্বপূর্ণ। একজন অপরাজেয় নায়ককে এবার নিজের ভুল স্বীকার করতে হচ্ছে।
দর্শকেরা জানেন, রিচার সাধারণত শেষ পর্যন্ত জয়ী হন। কিন্তু এবার সমস্যাটি শুধু কোনো অপরাধীকে খুঁজে বের করা নয়। এবার তাঁর লড়াই এমন একজনের সঙ্গে, যাকে তিনি নিজের চোখে অন্যভাবে দেখেছিলেন।
যে নারীকে রিচার বাঁচাতে চেয়েছিলেন, তিনিই এখন তাঁকে ফাঁদে ফেলেছেন। যে সম্পর্ককে হয়তো তিনি নিছক ক্ষণিকের আকর্ষণ ভেবেছিলেন, সেটিই হয়ে উঠেছে প্রাণঘাতী।
ফলে চতুর্থ মৌসুমে ‘রিচার’–এর পুরোনো প্রশ্ন—‘রিচার কীভাবে শত্রুকে হারাবেন’—এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন প্রশ্ন—রিচার কি নিজের ভুলের পরিণতি সামলে আবারও পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন? উত্তর জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে পরের পর্বগুলোর জন্য। আট পর্বের চতুর্থ মৌসুমের পাঁচ পর্ব মুক্তি পেয়েছে, শেষটি আসবে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর।
দ্য হলিউড রিপোর্টার, কোলাইডার ও স্ক্রিন র্যান্ট অবলম্বনে