সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন: আধুনিক দৃষ্টিকোণ ও গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ

শিক্ষকতাপ্রথম আলো ফাইল ছবি

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। শিক্ষকদের দক্ষতা ও জীবনমানের উন্নয়ন সরাসরি শিক্ষার গুণগত মানে প্রতিফলিত হয় এবং এটি শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও প্রভাব ফেলে। তবে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেমন সীমিত প্রশিক্ষণ, সুসংগঠিত বেতনকাঠামোর অভাব, সামাজিক মর্যাদা কম থাকা এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা। এসব সমস্যার সমাধান কীভাবে করা যেতে পারে, সেটি এই নিবন্ধে আলোচিত হয়েছে।

১. আধুনিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন

বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষক এখনো ডিজিটাল শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতিতে পিছিয়ে আছেন, যা তাঁদের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তবে উন্নত দেশগুলোয় শিক্ষক প্রশিক্ষণপদ্ধতিতে বিপ্লব ঘটেছে, যা তাঁদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার মানের উন্নতিতে সহায়ক হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ও আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকেরা তাঁদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন, যা শিক্ষার্থীদের ফলাফলে পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়।

বাংলাদেশেও শিক্ষক প্রশিক্ষণপদ্ধতির আধুনিকীকরণ অত্যন্ত জরুরি। প্রতিবছর সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল কৌশল ব্যবহার করে শিক্ষার গুণগত মানে উন্নতি ঘটানো সম্ভব হবে।

২. শিক্ষকদের বেতনকাঠামো ও আর্থিক নিরাপত্তা

লেখক

বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতনকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত এবং তাঁদের জীবনমানের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক উন্নত দেশ তাদের শিক্ষকদের বেতনকাঠামো উন্নত করেছে, যার ফলে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা বেড়েছে এবং তাঁদের মনোবলও শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে শিক্ষকদের বেতনকাঠামো উন্নত করা হয়েছে, সেখানে শিক্ষার গুণগত মানও উন্নত হয়েছে।

বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত বেতনকাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, শিক্ষকেরা যদি তাঁদের প্রাপ্য ও মানসম্মত বেতন পান, তবে প্রতিবছর বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই অর্থ খরচ হলে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং তাঁদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, যা পরোক্ষভাবে দেশের শিক্ষার মানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে।

আরও পড়ুন

৩. শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও মানসিক স্বাস্থ্য

শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও মানসিক স্বাস্থ্য তাঁদের কর্মক্ষমতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁদের দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বেশ কিছু দেশে শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে তাঁরা পেশাগতভাবে আরও সফল ও দক্ষ হতে পেরেছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

যত বেশি শিক্ষক মানসিকভাবে সুস্থ ও পেশাগতভাবে সম্মানিত বোধ করবেন, তত বেশি তাঁরা তাঁদের কাজের প্রতি দায়িত্বশীল ও পেশাদার হবেন, যা শিক্ষার গুণগত মানে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলবে।

আরও পড়ুন

৪. দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন

বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে যথাযথ দক্ষতার অভাব এবং শিক্ষাগত বৈষম্য শিক্ষার গুণগত মানে বাধা সৃষ্টি করছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা চালু করা জরুরি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক, আধুনিক ও প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণপদ্ধতি তৈরি করা উচিত। এর মাধ্যমে শুধু শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে না, বরং শিক্ষার্থীদের শিখনপ্রক্রিয়ায়ও উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে।

এ ছাড়া শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক শিক্ষণকৌশলগুলো শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ সেশন আয়োজন করা প্রয়োজন।

মো. জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী শিক্ষক, কোন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন