মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে করপোরেট অনুদান রেকর্ড ৬৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার

যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাছবি: এএফপি

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে করপোরেট অনুদান রেকর্ড গড়েছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে বিভিন্ন কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রচারে ৬৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছে।

২০২৪ সালের পুরো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী পর্বে কোম্পানিগুলো যে অর্থ দিয়েছিল, এবার মাত্র ১৮ মাসেই তার চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি অনুদান এসেছে। নির্বাচনী অর্থের ওপর নজরদারি করা সংগঠন পাবলিক সিটিজেনের নতুন বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

করপোরেট অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে আছে উৎপাদন খাতের বড় প্রতিষ্ঠান কোচ ইনকরপোরেটেড। পাশাপাশি অনলাইনে স্পোর্টস বেটিং কোম্পানিগুলোও বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েছে। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে দুই দলের প্রার্থীদের পক্ষে এসব কোম্পানি এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। বড় তামাক কোম্পানিগুলোও বিপুল অর্থ দিয়েছে, যার বড় অংশ গেছে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পেছনে।

নির্বাচনে করপোরেট অর্থ ব্যয়ের বিরোধিতা করে আসা ভোক্তা অধিকার সংগঠন পাবলিক সিটিজেন ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন। তারা ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের (এফইসি) নথি বিশ্লেষণ করেছে। কোম্পানির দেওয়া অনুদান আলাদাভাবে শনাক্ত করতে তথ্যগুলো হাতে ধরে যাচাই করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির নির্বাহী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দেওয়া একই ধরনের অনুদান বাদ দেওয়া হয়েছে।

তবে এই হিসাবের মধ্যে তথাকথিত ডার্ক মানি সংগঠনগুলোকে দেওয়া অনুদান নেই। এসব সংগঠনও নির্বাচনী প্রচারে অর্থ ব্যয় করে, কিন্তু তাদের দাতাদের নাম বা মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক নয়। এ ছাড়া অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনে দেওয়া অর্থও এই হিসাবে ধরা হয়নি। ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারের শেষ দুই মাসে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই তীব্র হলে এসব অনুদান আরও বাড়তে পারে।

পাবলিক সিটিজেনের গবেষণা পরিচালক রিক ক্লেপুল বলেন, নির্বাচনে করপোরেট অর্থ যে হারে ঢুকছে, তা ‘সতর্কসংকেত’। কার্যকর গণতন্ত্রের স্বার্থে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন।

২০১০ সালের পর বেড়েছে করপোরেট অর্থ

২০১০ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক প্রচারে অনুদান ও ব্যয়ের ওপর থাকা কিছু বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পর করপোরেট অর্থের প্রবাহ দ্রুত বেড়েছে। এর ফলে কোম্পানি ও ধনী ব্যক্তিরা স্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে কত অর্থ দিতে পারবেন, তার সীমা নেই।

সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত মার্কিন নির্বাচনে কোম্পানিগুলো মোট ১৭০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এসেছে চলতি নির্বাচনী পর্বে।

তবে করপোরেট অর্থের এমন প্রবাহ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। পাবলিক সিটিজেনের মতো নির্বাচনী অর্থ পর্যবেক্ষণকারী সংগঠনগুলোর যুক্তি, কোম্পানিগুলোর বিপুল অর্থ ব্যয়ের ফলে বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীগুলো রাজনীতিতে তাদের প্রভাবের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা সংগঠনগুলোর কেউ কেউ মনে করেন, গণতন্ত্রে এই অধিকার সুরক্ষার জন্য রাজনৈতিক ব্যয় প্রয়োজন।

ইনস্টিটিউট ফর ফ্রি স্পিচের ভাইস প্রেসিডেন্ট টম গ্যারেট বলেন, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে পুরোপুরি স্বীকৃতি দেওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থারই অংশ। তাঁর মতে, সব মার্কিন নাগরিকের নিজেদের মত প্রকাশ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার অধিকার রয়েছে।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াইয়ে অনুদান বাড়ছে

পাবলিক সিটিজেনের তথ্য বলছে, রিপাবলিকানদের সমর্থক রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটিগুলোতে অনুদান দ্রুত বাড়ছে। আগামী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকানরা যখন কঠিন লড়াইয়ের মুখে, তখনই এই অর্থপ্রবাহ বাড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেট সিলভারের সর্বশেষ মধ্যবর্তী নির্বাচন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের হাতে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ যাবে, এমন সম্ভাবনা ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ। সেই সঙ্গে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ যাবে, তেমন সম্ভাবনা ৮৪ শতাংশ।

রিপাবলিকান দলের বড় দাতা চার্লস কোচের নিয়ন্ত্রণাধীন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কোচ ইনকরপোরেটেড জুনে কোচ নেটওয়ার্কের রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি আমেরিকানস ফর প্রসপারিটি অ্যাকশনকে দুই কোটি ডলার দিয়েছে। এ বিষয়ে কোম্পানির বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা মন্তব্য করেনি।

সিগারেটের ব্র্যান্ড ক্যামেল ও নিউপোর্টের মূল কোম্পানি রেনল্ডস আমেরিকান এপ্রিলের শেষ দিকে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ট্রাম্পের সুপার পিএসি এমএজিএ ইনকরপোরেটেডকে ৫০ লাখ ডলার দিয়েছে।

গাঁজা প্রস্তুতকারক কোম্পানিও এই তালিকায় আছে। এই খাতের ছয়টি কোম্পানি—যার মধ্যে কারিউলিফ ও ট্রুলিভ রয়েছে—জুনে আমেরিকা ফার্স্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যাকশন ইনকরপোরেটেডকে সম্মিলিতভাবে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার দিয়েছে। এফইসির তথ্য বিশ্লেষণ করে পাবলিক সিটিজেন এ তথ্য জানিয়েছে।

ক্রিপ্টো, বেটিং ও এআই কোম্পানির বড় ভূমিকা

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে করপোরেট দাতাদের মধ্যে ক্রিপ্টো খাত এখনো সবচেয়ে এগিয়ে। এরপর রয়েছে অনলাইন বেটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাত। এই তিন খাত মিলেই কোম্পানিগুলোর মোট অনুদানের অর্ধেকের বেশি দিয়েছে—প্রায় ৩৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা ক্যামেরন ও টাইলার উইঙ্কলভসও বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েছেন। ১৯ জুন তাঁরা জেমিনি ট্রাস্ট কোম্পানির মাধ্যমে ট্রাম্পের এমএজিএ ইনকরপোরেটেডকে এক কোটি ডলার অনুদান দেন। এর প্রায় তিন সপ্তাহ আগে মার্কিন প্রশাসন একটি মামলায় জেমিনির বিরুদ্ধে দেওয়া রায় বাতিলের জন্য ফেডারেল আদালতে আবেদন করেছিল। জেমিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।

অনলাইন স্পোর্টস বেটিং কোম্পানি ড্রাফটকিংস, ফ্যানডুয়েল, ফ্যানাটিকস ও বেট৩৬৫ দ্বিতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাতের সুপার পিএসি উইন ফর আমেরিকায় ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার দিয়েছে। এই অর্থ দুই সহযোগী পিএসির মাধ্যমে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে দুই দলের প্রার্থীদের সমর্থনে ব্যয় করা হচ্ছে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে স্পোর্টস বেটিং খাতের মোট অনুদান দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

ভবিষ্যৎ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে পূর্বাভাস দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেটও এবার এই প্রথম নির্বাচনী রাজনীতিতে অর্থ দিয়েছে। এপ্রিলে তারা ১০ হাজার ডলার দিয়েছে ভি-পিএসি: ভিক্টরস, নট ভিকটিমস নামের এক পিএসিকে। এটি রিপাবলিকান উদ্যোক্তা ও সাবেক ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সির সহসভাপতি বিবেক রামাস্বামীর ওহাইওর গভর্নর পদে নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন দিচ্ছে।

জুন মাসে পলিমার্কেটের মূল কোম্পানির মাধ্যমে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়া সিএলএফ পিএসিকে আরও ১০ লাখ ডলার দেওয়া হয়।

এদিকে চ্যাটজিপিটির মূল কোম্পানি ওপেনএআই-সমর্থিত সুপার পিএসি লিডিং দ্য ফিউচারে এ পর্যন্ত ৫ কোটি ডলার পেয়েছে। ফলে এআই খাতের কোম্পানিগুলোর নির্বাচনী অনুদানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ২০ লাখ ডলারে। সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, পিএসিটি অনুদান ও দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১৪ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে।

তবে ওপেনএআই আগে বলেছে, কোনো বাইরের রাজনৈতিক সংগঠন ওপেনএআইয়ের হয়ে কথা বলে না বা তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।

ইলন মাস্ক ও ডার্ক মানি হিসাবে নেই

পাবলিক সিটিজেনের হিসাবকে করপোরেট রাজনৈতিক ব্যয়ের পুরো চিত্র বলা যাচ্ছে না। এফইসির তথ্যের মধ্যে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচনে কোম্পানিগুলোর ব্যয় নেই। ফলে ইনস্টাগ্রামের মালিক মেটা অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে ব্যয়ের জন্য যে ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার আলাদা করে রেখেছে, সেটিও এই হিসাবে নেই।

এ ছাড়া অনেক কোম্পানি এখন ডার্ক মানি সংগঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অনুদান দিচ্ছে। এসব অলাভজনক সংগঠনকে এ নামে ডাকা হয়, কারণ তাদের দাতাদের পরিচয় বা অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তা পুরোপুরি প্রকাশ করতে হয় না।

ক্লড এআইয়ের নির্মাতা অ্যানথ্রপিক এমন এক সংগঠন পাবলিক ফার্স্ট অ্যাকশনকে চার কোটি ডলার দিয়েছে। সংগঠনটি মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্যয়ের জন্য মোট ১০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে বলে তাদের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন।

অ্যানথ্রপিক অবশ্য আগে বলেছে, তাদের অনুদান শিক্ষা খাতে ব্যয় করা যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট নির্বাচনী আসনের পক্ষে সরাসরি ব্যয় করা যাবে না। পাবলিক ফার্স্ট অ্যাকশনের মুখপাত্রও অন্য দাতাদের পরিচয় প্রকাশ করেননি। তিনি বলেন, এআইয়ের নতুন ঝুঁকি মোকাবিলায় ভোক্তা সুরক্ষার আইন পাসে কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জোরদার করাই সংগঠনটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

করপোরেট অনুদানের হিসাবের বাইরে আরও অনুদান আছে। এর মধ্যে কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের ব্যক্তিগত ব্যয়ও আছে, যেমন স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক এ পর্যন্ত ফেডারেল নির্বাচনে ৯ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন। গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিনও ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রস্তাবিত সম্পদ করসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ১০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন। তবে ব্রিনের প্রতিনিধি ও মাস্কের মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি।