টিসিবিতে ভুট্টার তেল বেচে বিপাকে পড়েছে ময়মনসিংহের এমআরটি অ্যাগ্রো, ভ্যাট নিয়ে জটিলতা

ভোজ্য তেলপ্রতীকী ছবি

ভুট্টা থেকে তেল উৎপাদন করছে ময়মনসিংহের প্রতিষ্ঠান এমআরটি অ্যাগ্রো। দেশে ভুট্টার মতো নতুন উৎস থেকে তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কাছে তেল সরবরাহের কাজ পেয়েছে।

টিসিবিতে ২০ লাখ লিটার তেল বিক্রি করবে তারা। কিন্তু ১০ শতাংশ ভ্যাট নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। লিটারে সাড়ে ১৭ টাকা ভ্যাট দিতে হবে। এতে লোকসানে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি। দুই মাস ধরে কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ। পুরোপুরি বন্ধের উপক্রম হয়েছে, তাই ভ্যাট প্রত্যাহার চায় এমআরটি অ্যাগ্রো।

প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, তেলের উৎপাদন খরচ ১৭০ টাকা। এখন সব খরচ মিলিয়ে লিটারে ২০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এভাবে টিকে থাকা সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে মোট চুক্তির প্রায় ১৫ শতাংশ বা ৩ লাখ লিটার তেল সরবরাহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

জানতে চাইলে এমআরটি অ্যাগ্রোর পরিচালক রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে ভুট্টার তেলের দাম লিটারে ১৯০ টাকা। সেখানে এখন প্রতি লিটারে ভর্তুকি দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সমস্যার সমাধান না হলে দুই মাস পর প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। স্থানীয় উৎপাদনকারী হিসেবে ভ্যাট দেওয়ার কথা নয়, এমনটাই বলছেন তিনি। কিন্তু এসআরওতে এ তেলের নাম উল্লেখ নেই, তাই ভ্যাটমুক্ত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ

শুধু এমআরটি অ্যাগ্রো নয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবির পক্ষ থেকেও ভ্যাট প্রত্যাহারের সুপারিশ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) গত ২০ জুলাই (এনবিআর) চিঠি দেওয়া হয়েছে। আর তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয় গত ৯ জুন।

চিঠিতে বলা হয়, তেল সরবরাহে প্রতি লিটারের মূল্য ধরা হয়েছে ১৭৫ টাকা। সে হিসাবে ১৫ শতাংশ তেল সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু বিল তুলতে গেলে জানা যায়, প্রতি লিটারে ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট কাটা হবে। এতে প্রতি লিটারের দাম পড়বে ১৫৭ টাকা। কিন্তু এতে লোকসানে পড়বে হবে।

প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্যমতে, পামওয়েলের দাম লিটারে ১৮৫ টাকা। সেখানে ভুট্টার তেল ১৫৭ টাকায় দেওয়া সম্ভব নয়। তাই রাইস ব্রান ও শর্ষে তেলের মতো ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। এতে দেশি প্রতিষ্ঠানের তেল উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা কমবে বলেও দাবি করছে এমআরটি অ্যাগ্রো। অনেক নতুন প্রতিষ্ঠানও ভুট্টার তেল উৎপাদনে এগিয়ে আসবে বলে মনে করছে তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারাও ভুট্টার তেলের সম্ভাবনা দেখছেন। দেশে ভুট্টার উৎপাদন বাড়তে থাকায় এ উপাদান থেকে উৎপাদিত তেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে বলছেন তাঁরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদ কামরুল ইসলাম বলেন, ভুট্টার তেলের পুষ্টিগুণ অন্যান্য তেলের মতোই। ভুট্টা তেলের সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড ও অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেলের সমপরিমাণ। এটার বিপণন ব্যবস্থা ঠিক করা গেলে, পণ্যটির ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

টিসিবি-মন্ত্রণালয়ও ভ্যাট প্রত্যাহার চায়

এমআরটি অ্যাগ্রো ছাড়াও সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের সুপারিশ করে এনবিআরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

টিসিবির চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, দেশি শিল্পের বিকাশে ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টিতে ভ্যাট প্রত্যাহার করা যায়। এতে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস এবং অনেকের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া ভ্যাট না থাকলে ভুট্টার তেল রাইস ব্রান তেলের চেয়ে সাশ্রয়ী হবে। তবে এ বিষয়ে টিসিবির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশে উৎপাদিত তেলের উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। প্রতি মাসে টিসিবির প্রায় ১২ কোটি লিটার তেলের প্রয়োজন হয়। গত অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ২০ লাখ লিটার ভুট্টার তেল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়।

তবে বাজেট শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন এমন ছাড় দেওয়া কঠিন বলছে এনবিআর। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বাজেটের সময় এমন অনেক সুপারিশ আমলা নেওয়া হয়। কিন্তু এখন এমন প্রস্তাব গ্রহণ করা কঠিন। তবে বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখার পর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।