ইইউর চিহ্নিত ৬১ অশুল্ক বাধার মধ্যে ৪৮টির সমাধান করেছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যে ৬১টি অশুল্ক বাধা চিহ্নিত করেছিল, তার মধ্যে ৪৮টির সমাধান করেছে বাংলাদেশ। বাকি বাধাগুলোও দ্রুত দূর করার উদ্যোগ চলছে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
আজ রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত যৌথ সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এ সময় অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি ও ইইউর রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত মার্চে ইইউর রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরে। এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে এসব সমস্যা সমাধানে কাজ শুরু করা হয়। দ্রুততম সময়ে ৪৮টি সমস্যার সমাধান করা হয়েছে।
সমাধান হওয়া বাধাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন পণ্য পরিবহন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমতিপত্র নবায়নের জটিলতা। বাণিজ্যিক নমুনা আমদানির বার্ষিক সীমাও বাড়ানো হয়েছে। এত দিন এই সীমা ছিল ১০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। এখন তা বাড়িয়ে ২০ হাজার ডলার করা হয়েছে।
রপ্তানি পণ্যের উৎস ও চলাচল শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত পণ্য শনাক্তকরণ স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন জটিলতাও দূর করা হয়েছে। এসব পণ্যের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ইইউ বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। এ কথা উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য সহজ করার লক্ষ্যে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট বাধাগুলোও দ্রুত সমাধানের প্রক্রিয়ায় আছে।
ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির বিষয়ে চলতি সপ্তাহেই কারিগরি আলোচনা শুরু হবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, এ ধরনের চুক্তি হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধসহ বিভিন্ন শিল্পের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে বাণিজ্য বাধা কমলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও বাড়তে পারে।
উত্তরণ পেছাতে ইইউর সমর্থন চায় বাংলাদেশ
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইইউর বাজারে বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তুতিমূলক আলোচনা শুধু রপ্তানি বাড়ানোর জন্য নয়; বরং ভবিষ্যতে ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের কাঠামো নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ।
এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) ও অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ ইতিবাচক সুপারিশ করেছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। এ ক্ষেত্রে ইইউর জোরালো সমর্থন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানির বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সব সময় জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও খাদ্যশস্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দাম, পণ্যের মান ও অপচয়ের হার বিশ্লেষণ করে সরকারি ক্রয় কমিটি সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে বলে জানান তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি নির্দিষ্ট কোনো দেশের প্রভাবে পরিচালিত হয় না। দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণই সব সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।
এফটিএর আলোচনা নিয়ে ইইউ রাষ্ট্রদূত
ইইউর রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মুক্ত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়ার পর ইউরোপীয় কমিশন ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। ইইউর সদস্যদেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে চলতি সপ্তাহ থেকেই এ বিষয়ে দুই পক্ষের কারিগরি আলোচনা শুরু হতে পারে।
মাইকেল মিলার আরও বলেন, দুই পক্ষের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা থাকলে বাংলাদেশ ও ইইউ—উভয় পক্ষই লাভবান হবে।
বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে বিমান চলাচল ও বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে এয়ারবাসের বিমান কেনার আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন মাইকেল মিলার। এয়ারবাস ইউরোপের বিমান প্রস্তুতকারী কোম্পানি।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ বিমানের সঙ্গে মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি হয়েছে। সম্প্রতি জানা গেছে, বাংলাদেশ আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে।