বিকাশ, রবিসহ চার প্রতিষ্ঠান পেল ডিজিটাল ব্যাংকের প্রাথমিক অনুমোদন
দেশে চালু হচ্ছে শুধু অ্যাপ–নির্ভর ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা, যার মাধ্যমে ঘরে বসেই আমানত জমা, ছোট ঋণ গ্রহণ, বিল পরিশোধ ও লেনদেন করা যাবে। এ জন্য নতুন করে চারটি ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেওয়া কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন বহাল রাখা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব ব্যাংক চালুর নীতিগত অনুমোদন প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ সভায় প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া নতুন চার ব্যাংক হলো—ডিজিটাল ব্যাংক অব ভুটান, যার উদ্যোক্তা ভুটানের ডিকে ব্যাংক; বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, উদ্যোক্তা দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিকাশের শেয়ারধারীরা; নোভা ডিজিটাল ব্যাংক, উদ্যোক্তা বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওন ও স্কয়ার গ্রুপ এবং বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক, উদ্যোক্তা রবির মূল প্রতিষ্ঠান আজিয়াটা লিমিটেড।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদনপত্র গ্রহণ করে। তখন ১৩টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থা, মোবাইল অপারেটর, মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিক্ষোভসহ নানা কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেই অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন আহসান এইচ মনসুর। বিএনপি সরকার গঠনের পর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে নতুন করে আর কোনো আবেদন নেওয়া হয়নি। তবে বর্তমান গভর্নরের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ আগের আবেদন থেকেই চারটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি প্রদানে সম্মত হয়েছে।
নতুন অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলো
* ডিজিটাল ব্যাংক অব ভুটান, যার উদ্যোক্তা ভুটানের ডিকে ব্যাংক। * বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, যার উদ্যোক্তা বিকাশের শেয়ারধারীরা। * নোভা ডিজিটাল ব্যাংক, উদ্যোক্তা বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওন ও স্কয়ার গ্রুপ। * বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক, যার উদ্যোক্তা রবির মূল প্রতিষ্ঠান আজিয়াটা লিমিটেড। * কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক, দেশীয় কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী।
জানা গেছে, নতুন অনুমোদন পাওয়া চারটি এবং আগে অনুমোদিত কড়ি ডিজিটাল ব্যাংককে আগ্রহপত্র দেওয়া হবে। এতে নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে তা পরিপালনের জন্য সময় দেওয়া হবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে উত্থাপন করা হবে। শুরুতে ছয় মাস পরীক্ষামূলকভাবে ব্যাংকিং সেবা চালু করতে হবে। সেখানে সফল হলে এরপর চূড়ান্ত লাইসেন্স দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ডিজিটাল ব্যাংকের নতুন শর্তে হলো, উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারদের ৩০০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। আওয়ামী লীগের সময়ে ১২৫ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের শর্ত ছিল। এই টাকা কর পরিশোধিত হতে হবে।
ডিজিটাল ব্যাংক কি করবে
ডিজিটাল ব্যাংক এমন একটি ব্যাংক, যার নিজস্ব কোনো শাখা, উপশাখা, এটিএম বা সিডিএম (নগদ জমা মেশিন) থাকবে না। এর সব সেবা মিলবে শুধু ডিজিটাল মাধ্যমে, যেমন ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপে। এটি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। গ্রাহকদের সুবিধার জন্য ভার্চ্যুয়াল কার্ড ও কিউআর কোডের মতো প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। লেনদেনের জন্য গ্রাহকেরা অন্য ব্যাংকের এটিএম বা এজেন্ট সেবা ব্যবহার করতে পারবেন। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে হিসাব খোলা থেকে শুরু করে যেকোনো সেবা নেওয়ার জন্য কোথাও যেতে হবে না, যেকোনো স্থান থেকে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করেই সেবা নেওয়া যাবে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকের নীতিমালায় বলা হয়েছে, এটি বড় বা মাঝারি শিল্পে ঋণ দিতে পারবে না। কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতের অনেক ব্যবসায়ী এখনো অনানুষ্ঠানিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে তাঁদের দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সেবার আওতায় আনা সম্ভব হলে ব্যবসার প্রসার, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া কোনো ঋণপত্র (এলসি) খোলার অনুমতি থাকবে না। বর্তমানে দেশে বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) চালু থাকলেও সেগুলো ডিজিটাল ব্যাংকের একটি অংশমাত্র। ডিজিটাল ব্যাংক হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক, যা আর্থিক সেবাগুলোকে আরও সর্বজনীন করে তুলবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে উচ্চ পরিচালন ব্যয়, মূলধন সংরক্ষণের চাপ এবং ব্যয়বহুল ভৌত অবকাঠামোর কারণে দেশের অনেক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে প্রচলিত ব্যাংকিং সেবা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ডিজিটাল ব্যাংক শাখাবিহীন ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ডিজিটাল ব্যাংক হবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শাখাবিহীন ভার্চ্যুয়াল ব্যাংকিং সেবা। এর মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ডিজিটাল ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং এর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। ডিজিটাল ব্যাংক ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে গ্রাহক নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় মূলত জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।