ব্যাংক শাখার আয়তন ৬ হাজার বর্গফুটের বেশি হতে পারবে না
ব্যাংকগুলো শাখা বা সেবাকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে ভাড়ার চুক্তি হতে হবে কমপক্ষে ছয় বছরের। চুক্তি চলাকালীন প্রথম তিন বছরের মধ্যে কোনোভাবেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না। তিন বছর পর ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন হলে তা মূল ভাড়ার ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। এ ছাড়া সার্ভিস চার্জ কোনোভাবেই মূল ভাড়ার ১০ শতাংশের বেশি হবে না।
দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর শাখা, উপশাখা, বুথসহ বিভিন্ন ব্যবসায় কেন্দ্র স্থাপন, স্থানান্তর এবং ভবন ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে আজ রোববার নতুন একটি সমন্বিত নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ভাড়াসংক্রান্ত বিষয় সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। মূলত ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং শহর ও পল্লি অঞ্চলে সুষম ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ’ থেকে ‘ব্যাংক ব্যবসা কেন্দ্র স্থাপন, স্থানান্তর, ভাড়া/ইজারা গ্রহণ ও চুক্তি নবায়ন সংক্রান্ত নীতিমালা’ শীর্ষক এই নির্দেশনা জারি করা হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শহর এলাকায় একটি শাখার আয়তন হবে সর্বোচ্চ ছয় হাজার বর্গফুট। আর পল্লি এলাকায় সর্বোচ্চ তিন হাজার বর্গফুট হতে পারবে। উপশাখার জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার বর্গফুট, কালেকশন বুথের জন্য ৩৫০ বর্গফুট এবং এটিএম বুথের জন্য ১০০ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো চাইলেই যেকোনো জায়গায় ব্যবসায় কেন্দ্র স্থাপন করতে পারবে না। কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব সিদ্ধান্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নতুন শাখা (শহর ও পল্লি), উপশাখা, কালেকশন বুথ এবং ফরেন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ বুথ স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘নীতিগত অনুমোদন’ এবং পরবর্তী সময়ে ‘চূড়ান্ত অনুমোদন’ নিতে হবে। এ ছাড়া বিদ্যমান ব্যবসা কেন্দ্র একীভূতকরণ, রূপান্তর বা বন্ধ করার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি লাগবে। কোনো শাখা বা ব্যবসা কেন্দ্র স্থানান্তরের জন্যও বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
তবে ব্যাংকগুলোর ইলেকট্রনিক বুথ (এটিএম, সিআরএম, সিডিএম), এক মাসের কম সময়ের জন্য অস্থায়ী বুথ (মেলা বা কোনো অনুষ্ঠানের জন্য) এবং বিমানবন্দর লাউঞ্জ স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হবে না। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদ বা নির্বাহী কমিটির অনুমোদনই যথেষ্ট। তবে এসব স্থাপনার তথ্য এক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হবে। এ ছাড়া নীতিমালায় নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে আয়তন বাড়ানো বা বিদ্যমান ভাড়ার চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রেও ব্যাংক নিজস্ব পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলে নির্দেশনায় বলা হয়।
তবে ভাড়া ও অগ্রিম প্রদানের নিয়মের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো এলাকার বিদ্যমান ভাড়ার চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি ভাড়ায় জায়গা নেওয়া যাবে না। এ ছাড়া ব্যাংক যদি ভবনমালিককে মাসিক ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য অগ্রিম দেয়, তবে তা চুক্তির মেয়াদভেদে ১৮ থেকে ৩০ মাসের ভাড়ার সমান হতে পারবে। আর যদি চুক্তি শেষে ফেরতযোগ্য ‘নিরাপত্তা জামানত’ হিসেবে অগ্রিম দেওয়া হয়, তবে তা সর্বোচ্চ ৬ মাসের ভাড়ার সমান হতে পারবে। কোনো ব্যাংকের পরিচালক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মালিকানাধীন ভবন ভাড়া নিতে হলে তা আবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে এবং একই এলাকার অন্য ভবনের তুলনায় তার ভাড়া বেশি হওয়া চলবে না।
নতুন ব্যবসা কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে ইন্টেরিয়র বা অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় প্রতি বর্গফুটে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় করা যাবে। যদি ব্যবসা কেন্দ্রটি স্থানান্তর করা হয়, তবে এই ব্যয় প্রতি বর্গফুটে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। শহর ও পল্লি শাখার ভারসাম্য রক্ষায় এই অনুপাত ৫০: ৫০–এ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ ব্যাংক এক বছরে যতগুলো শাখা খোলার অনুমতি পাবে, তার অন্তত অর্ধেক হতে হবে পল্লি অঞ্চলে। একই বছরে একই শহরে একটির বেশি শাখা খোলা যাবে না। পল্লি অঞ্চলের শাখাকে কোনোভাবেই শহর অঞ্চলে স্থানান্তর করা যাবে না। সান্ধ্য ব্যাংকিংয়ের সময় স্বাভাবিক ব্যাংকিং সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা বেশি হতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন লাগবে। সন্ধ্যায় কেবল নগদ টাকা জমা নেওয়া যাবে, অন্য কোনো লেনদেন করা যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নীতিমালার কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হলে ব্যাংকগুলোর ওপর বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হবে। ভুল তথ্য দিয়ে অনুমোদন নিলে বা নিয়মবহির্ভূতভাবে শাখা স্থানান্তর করলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় কেন্দ্রের অনুমোদন বাতিল করতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এই সমন্বিত নীতিমালা কার্যকর হওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমবে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক ব্যাংকিং সেবা আরও বিস্তৃত হবে।