কুটিরশিল্পের বিশৃঙ্খল বিকাশ

কুটিরশিল্প
কুটিরশিল্প

দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন আট লাখ ৩০ হাজার। এসব শিল্পে বছরে ৩৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। মূল্য সংযোজিত হচ্ছে ৩১ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকার। সমপরিমাণ অর্থই প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) যুক্ত হচ্ছে।
অথচ এ শিল্পের বড় অংশই কোনো ধরনের নিবন্ধন না নিয়ে গড়ে উঠেছে। এমনকি খাদ্যপণ্যে উৎপাদন করছে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স ছাড়াই। এ শিল্পকে সঠিকভাবে দেখভাল করছে না কেউ। শিল্প উদ্যোক্তারা বহু ক্ষেত্রেই পাচ্ছেন না সুবিধা প্রণোদনা। সব মিলিয়ে মূলত বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই বিকশিত হচ্ছে দেশীয় কুটিরশিল্প।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত কুটিরশিল্প জরিপ ২০১১তে এসব তথ্য ও চিত্র উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তবে এ শিল্পে কিছু বিশৃঙ্খলা আছে। বিশৃঙ্খলা এই অর্থে যে, তারা নিয়ম অনুসরণ করছে না।’
জাতীয় শিল্পনীতি ২০১০ অনুযায়ী, ১০ জনের কম শ্রমিক নিয়ে গঠিত শিল্পগুলো কুটিরশিল্পের আওতায় পড়বে। জমি ও ভবন বাদ দিয়ে এসব শিল্পের পুঁজি সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা।
দেশে প্রথমবারের মতো ২০১১ সালে কুটিরশিল্পের ওপর জরিপ চালায় বিবিএস। এ জন্য সারা দেশে এক হাজার ১৭১টি কুটিরশিল্পের ওপর জরিপ চালানো হয়। খাদ্যপণ্য, পানীয়, বস্ত্র ও ক্ষুদ্র পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, কাঠ ও আসবাব, কাগজ থেকে উৎপাদিত পণ্য, তামাকজাত পণ্য, মুদ্রণ, রাসায়নিক ও রাসায়নিক পণ্য, রাবার ও প্লাস্টিক পণ্য, মৌলিক মেটাল ও নন-মেটালিক মিনারেল পণ্য, ইলেকট্রনিকস ও চশমা, ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জাম, পরিবহন সরঞ্জাম, মেরামত কাজসহ মোট ৩৪ ধরনের কুটিরশিল্পকে জরিপের আওতায় এনেছে বিবিএস।
৬৫ শতাংশই নিবন্ধনের বাইরে: বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, কুটিরশিল্পগুলোর মাত্র ৩৫ শতাংশ কোনো না কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত হয়েছে। অবশিষ্ট ৬৫ শতাংশই নিবন্ধন নেয়নি।
দেশে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের পোষক কর্তৃপক্ষ বিসিক। অর্থাৎ এমন শিল্প গড়তে বিসিকের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। জরিপ বলছে, নিবন্ধিত কুটিরশিল্পগুলোর মাত্র ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ নিবন্ধিত হয়েছে বিসিকে। ৯১ দশমিক ৮ শতাংশ উদ্যোক্তাই নিবন্ধন করেছেন স্থানীয় সরকারের আওতায়।
কুটিরশিল্প নিবন্ধনের হার বেশি সিলেটে। সেখানকার ৪৫ শতাংশ কুটিরশিল্পই নিবন্ধিত। নিবন্ধন না নিয়ে বেশি শিল্প গড়ে উঠেছে রংপুরে (২০ শতাংশ)।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সমিতির (নাসিব) সভাপতি মির্জা নুরুল গণি অবশ্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুটিরশিল্পগুলোর বিসিকের কাছ থেকে নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। যাঁর প্রয়োজন হয়, তিনি নিবন্ধন নেন।’
অন্যদিকে বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, ‘আইনে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পগুলোকে বিসিক থেকে নিবন্ধন নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু নিবন্ধন না নিলে কী করা হবে তা বলা নেই। সে দিক থেকে নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে আমরা নিবন্ধনের জন্য উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করছি। এ জন্য সারা দেশে বিসিকের কর্মকর্তাদের নিবন্ধনহীন শিল্পগুলো চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে।’
লাইসেন্স ছাড়া পণ্য উৎপাদন: দেশীয় কুটিরশিল্পগুলোর মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের জন্য বিএসটিআইয়ের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়েছে। এমন শিল্পের সংখ্যা ১৮ হাজার ৩৪৪। আরও ১৩ শতাংশ (এক লাখ আট হাজার ২৬টি) শিল্প অন্যান্য সংস্থা থেকে লাইসেন্স নিয়েছে।
তবে কোনো ধরনের লাইসেন্স ছাড়াই ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ শিল্পেরই পণ্য উৎপাদন ও বিপণন চলছে। আর ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ কুটিরশিল্প উদ্যোক্তাই মনে করেন, পণ্য উৎপাদনের জন্য বিএসটিআই কিংবা অন্য সংস্থার কাছ থেকে তাঁদের লাইসেন্স নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
লাইসেন্স না নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নাসিবের সভাপতি বলেন, ‘অনেকে জানেও না যে খাদ্যপণ্য উৎপাদন করতে হলে বিএসটিআই থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। খাদ্যপণ্য অন্তত লাইসেন্স নিয়েই উৎপাদন করা উচিত।’ সরকারের সহযোগিতা পেলে নাসিব বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে কুটিরশিল্প উদ্যোক্তাদের সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেবেন বলে জানান তিনি।
ঢাকায় বেশি, কম সিলেটে: বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, কুটিরশিল্প সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে, দুই লাখ ৫০ হাজার ১১২টি। এটি দেশের মোট কুটিরশিল্পের ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে সিলেট বিভাগে কুটিরশিল্পের সংখ্যা সবচেয়ে কম, মাত্র ২৭ হাজার ৭৯১টি।
এর বাইরে রাজশাহী বিভাগে এক লাখ ৩০ হাজার ১৩৩টি, খুলনা বিভাগে এক লাখ ২২ হাজার ৮৭টি, চট্টগ্রাম বিভাগে এক লাখ ১৫ হাজার ৯৬৮টি, রংপুর বিভাগে ৮২ হাজার ৭৪৪টি এবং বরিশাল বিভাগে ৫১ হাজার ৪৭০টি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
জরিপ বলছে, শহরের তুলনায় পল্লি অঞ্চলে কুটিরশিল্প বেশি গড়ে উঠেছে। ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ শিল্প হয়েছে পল্লি অঞ্চলে। পল্লি অঞ্চলের শিল্পের সংখ্যা চার লাখ ৬৭ হাজার ৪৭৪টি। আর শহরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে তিন লাখ ৬২ হাজার ৮৩১টি (৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ)।
বিবিএস কুটিরশিল্প উদ্যোক্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার চিত্রও তুলে এনেছে। জরিপ বলছে, দেশের কুটিরশিল্প উদ্যোক্তাদের ৮৩ শতাংশই মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর অতিক্রম করতে পারেননি। এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছেন ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ। আর মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ উদ্যোক্তা ডিগ্রি কিংবা এর চেয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৯৬ দশমিক ২ শতাংশ কুটিরশিল্প একক মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত। আর প্রায় ৪ শতাংশ শিল্প অংশীদারির ভিত্তিতে গড়ে তোলা হয়েছে।

কোনটি কুটিরশিল্প?
১০ জনের কম শ্রমিক নিয়ে গঠিত শিল্পগুলো কুটিরশিল্পের আওতায় পড়ে। জমি ও ভবন বাদ দিয়ে এসব শিল্পের পুঁজি সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা
একনজরে দেশের কুটিরশিল্প
৮ লাখ ৩০ হাজার প্রতিষ্ঠান
৯৩% সারা বছর চালু থাকে
৫৬.৩% শিল্প হয়েছে পল্লি অঞ্চলে
২০% গড়ে উঠেছে বাড়ির আঙিনায়
২৯ লাখ ৬৩ হাজার শ্রমিক নিয়োজিত
১৬% শ্রমিক উদ্যোক্তার পরিবারের সদস্য হওয়ায় বেতন পান না
৮৩% উদ্যোক্তা এসএসসি পাস করেননি

“কুটিরশিল্পে কিছু বিশৃঙ্খলা আছে। বিশৃঙ্খলা এই অর্থে যে, তারা নিয়ম অনুসরণ করছে না
শ্যাম সুন্দর সিকদার
চেয়ারম্যান, বিসিক