মন্ত্রীর আগ্রহে নেওয়া ৩৬৭ কোটি টাকার সাইলো প্রকল্প বাতিল, ১৫ একর জমিতে এখন কী হবে

সাইলো নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা ১৫ একর জমি। নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর ইউনিয়নেছবি: ওমর ফারুক

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের আগ্রহে তাঁর জেলা নওগাঁয় ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। ধান সংরক্ষণের জন্য ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাইলো নির্মাণ প্রকল্পটি বাতিল করেছে বিএনপি সরকার। গত মঙ্গলবার পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। ওই জমিতে সাইলোর পরিবর্তে কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম বা সিএসডি নির্মাণে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়া হয়।

নওগাঁর মহাদেবপুরে ভীমপুর ইউনিয়নে স্টিল সাইলো নির্মাণের জন্য ১৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। পুরো এলাকা ছিল আবাদি জমি। সাইলো নির্মাণের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। মাটি ভরাটের কাজও হয়েছিল। আড়াই বছর ধরে জায়গাটি খালি পড়ে আছে। এখন আর সাইলো নির্মাণ হবে না—এমন সিদ্ধান্তের ফলে জায়গাটি আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য খালি পড়ে থাকবে।

সাধন চন্দ্র মজুমদার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৮ থেকে ২০২৪ মেয়াদে খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আগ্রহে ২০২৩ সালে সাইলো নির্মাণের প্রকল্পটি নেওয়া হয়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি এখন কারাগারে আছেন।

ধান, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য নওগাঁ জেলা বিখ্যাত। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, খাদ্যশস্য সংরক্ষণে জেলায় ২০টি খাদ্যগুদাম রয়েছে, যার ধারণক্ষমতা ৪১ হাজার ৫০০ টন। সরকার চাইলে সেসব স্থানে আরও ৩০ শতাংশ বেশি খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করতে পারে।

নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এ জেলায় খাদ্যশস্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত গুদাম রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যে খাদ্যশস্য বিতরণ করা হয়, তা জেলার গুদাম থেকে পাঠানো হয়। যেসব জেলায় খাদ্যশস্য কম উৎপাদন হয়, নওগাঁ থেকে সেসব জেলায় পাঠানো হয়। এর মধ্যে আলোচনায় এসেছে জেলায় আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণ প্রকল্পটি।

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, মহাদেবপুরে স্টিলের সাইলো নির্মাণ বাস্তবায়নযোগ্য নয়। প্রকল্পটি বাতিলের পেছনে পরিকল্পনা কমিশনের সভায় যুক্তি হিসেবে বলা হয়, সাইলোতে নৌপথে বা রেলপথে বাল্কের মাধ্যমে মালামাল পরিবহন করা হয়। কিন্তু নওগাঁর মহাদেবপুরে মালামাল পরিবহনের জন্য নৌপথ বা রেলপথ নেই। ওই স্থানে স্টিলের সাইলো করলে বাল্কের মাধ্যমে মালামাল পরিবহন করা সম্ভব হবে না। সড়কপথে মালামাল পরিবহন করতে পরিবহন খরচ অনেক বেশি হবে। সভায় প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখেই শেষ করার সিদ্ধান্ত হয় বলে জানান পরিকল্পনা কমিশনের সচিব কবির আহমাদ।

নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মহাদেবপুরে স্টিলের সাইলো করার কোনো উপযোগিতা নেই। কারণ, সাইলোতে ধান নিতে হয় জাহাজে করে বাল্কে বা ঢেলে। যেখানে সাইলো নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে জাহাজ যাওয়ার পথই নেই। অন্যদিকে বস্তায় করে সেখানে ধান নিলে প্রতি কেজিতে ৬ টাকা খরচ বেশি পড়ত।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) জসীম উদ্দিন খান প্রথম আলোকে বলেন, বস্তা ছাড়া চাল সরবরাহ করা যায় না। ওই জায়গায় স্টিলের সাইলো নির্মাণের কোনোভাবেই কার্যকর নয়। স্টিলের সাইলো নির্মাণ যুক্তিযুক্ত হবে না। তাই প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। ভবিষ্যতে ওই স্থানে সিএসডি নির্মাণ করা হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মহাদেবপুরে সাইলো নির্মাণের স্থান থেকে আত্রাই নদের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। অন্য দিকে ছোট যমুনা নদী থেকে সাইলো নির্মাণ প্রকল্পের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। এত দূর থেকে মালামাল পরিবহন করা কঠিন।

সাইলো প্রকল্প নেওয়ার সময়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সভায় উপস্থিত থাকা সরকারের এক যুগ্ম সচিব প্রথম আলোকে বলেন, তখনো সেখানে সাইলো প্রকল্প না নিতে কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তৎকালীন মন্ত্রীর একান্ত আগ্রহে তখন প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। তখন কারও কিছু করার ছিল না।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত সাইলো নির্মাণ প্রকল্পে তেমন কোনো টাকা খরচ হয়নি। শুধু জমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাটে টাকা খরচ হয়েছে। তবে অধিগ্রহণ করা জায়গাটি খালি রাখা যাবে না। কর্মকর্তারা বলছেন, স্টিল সাইলো নির্মাণের পরিবর্তে সেখানে ১ হাজার টন ধারণক্ষমতার ২৫টি গুদাম নির্মাণ করা সম্ভব। এতে মোট ২৫ হাজার টন খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা যাবে।

নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবদুল্লাহ আল ইমরান প্রথম আলোকে বলেন, নওগাঁয় খাদ্যশস্য সংরক্ষণে পর্যাপ্ত স্থানীয় খাদ্যগুদাম (এলএসডি) রয়েছে। যদি সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, সে স্থাপনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না, তা জানতে আগে একটি সমীক্ষা করা প্রয়োজন। তারপর সেখানে স্থাপনা করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার কারাগারে থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া যায়নি।