পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারে জুড়ে দেওয়া হয় বিশেষ শর্ত: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকারি কেনাকাটায় পছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে অনেক সময় দরপত্রে (টেন্ডার) বিশেষ শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়, যেন নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ যোগ্য না হয়। এ ধরনের ঘটনা বাস্তব এবং অডিটররা অনেক সময় তা ধরে ফেলেন।
আজ বুধবার সকালে রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য–ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয়দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণাটি করেছে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)।
উন্মুক্ত আলোচনায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) মেনে কাজ করলেও অডিট আপত্তি এড়াতে অডিটরকে ৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সততার সঙ্গে নিয়ম মেনে কাজ করলে অডিটরকে কোনো ঘুষ দিতে হবে না। কেউ অর্থ দাবি করলে সরাসরি তাঁকে অবহিত করার নির্দেশ দেন মন্ত্রী।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, প্রায় এক মাস আগে তাঁর মন্ত্রণালয়ের একটি ফাইল দেখে তাঁর সন্দেহ হয়। এ কারণে তিনি সাত দিন ফাইলে সই করেননি। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে একাধিকবার ব্যাখ্যা চাইলেও সন্তোষজনক জবাব পাননি। পরে বাধ্য হয়ে সই করেন।
মন্ত্রী বলেন, পরে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা কাজ না পেয়ে রিভিউ বোর্ডে আপিল করলে আগের সিদ্ধান্ত বাতিল হয় এবং তাঁকেই কাজ দেওয়া হয়। এতে তাঁর প্রাথমিক সন্দেহ যে সঠিক ছিল, সেটি প্রমাণিত হয়েছে।
সরকারি ক্রয়ে অনিয়মের আরেকটি উদাহরণ তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১১ কোটি টাকা মূল্যের ২টি রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকায় কেনা হয়েছিল। কিন্তু মেশিন দুটি বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় বাংকার নির্মাণ না করায় একটি ফরিদপুরে এবং অন্যটি খুলনায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। পরিকল্পনাহীন ক্রয়ের কারণে এভাবে জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গবেষণায় যা উঠে এসেছে
কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। ৯ মাস ধরে দেশের ৮টি বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে ৯৫টি গভীর সাক্ষাৎকার, একটি জ্ঞান-দৃষ্টিভঙ্গি-চর্চা (কেএপি) জরিপ এবং ১৮টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় বাজেট ব্যয়ের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। তবে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেই অর্থবছর শেষে কিছু অর্থ অব্যয়িত থেকে যায়। বাজেট বাস্তবায়নে অডিট আপত্তির আশঙ্কা, প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকদের বাজেট ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণের অভাব এবং বরাদ্দ পুনর্বণ্টনে দীর্ঘসূত্রতাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে জরুরি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা উদ্বেগজনকভাবে কম। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা ২২ দশমিক ৭ শতাংশ, জেলা হাসপাতালে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে মাত্র ১১ দশমিক ৫ শতাংশ।
বর্তমানে সরকারি হাসপাতালের প্রায় ৬২ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ করে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি সময়মতো চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহ করতে পারলে এ হার প্রায় ৯০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
যন্ত্র আছে, সেবা নেই
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় রিএজেন্টের অভাব, যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে থাকা এবং প্রশিক্ষিত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের সংকটের কারণে অনেক হাসপাতালে পরীক্ষাগারসেবা ব্যাহত হচ্ছে। সেবা ব্যাহত হওয়ার ৪৩ শতাংশের জন্য দায়ী রিএজেন্টের ঘাটতি, ৩৪ শতাংশের জন্য অকেজো যন্ত্রপাতি এবং ১৯ শতাংশের জন্য দক্ষ জনবলের অভাব।
দক্ষ জনবলের সংকট
গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের অনুমোদিত ৬ হাজার ৪০৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩ হাজার ৮৯২ জন। অর্থাৎ, প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শূন্য পদের হার ২৭ শতাংশ, জেলা হাসপাতালে ১২ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ৩৬ শতাংশ। ফলে অনেক হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী নেই।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য শুধু কত টাকা বরাদ্দ বা ব্যয় হলো, তা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়; বরং সময়মতো অর্থছাড়, সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে রোগীরা ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সচল যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন কি না—সেটিই মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত।