রিকশা চালানো থেকে শুরু করে ফুটপাতে হকারি, রাজমিস্ত্রির কাজ—এখন শতাধিক কর্মীর বেতন দেন তিনি

রাজধানীর নীলক্ষেতে ১৭ মার্চ সন্ধ্যায় নিজের বইয়ের দোকানে মো. নুর আলম চৌধুরীছবি: প্রথম আলো

মো. নুর আলম চৌধুরীর কাছ থেকে এখন সময় পাওয়া খুব কঠিন। ৭৬ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও তাঁকে সামলাতে হয় অনেক কিছু। গত সোমবার দুপুরে রাজধানীর নীলক্ষেতের ২ নম্বর গলিতে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষার পর তিনি এলেন। কথা বলতে অনাগ্রহী। বললেন, ‘আমি বয়স্ক মানুষ, রোজার সময় কষ্ট হয় বেশি কথা বলতে। অন্যদিন আসবেন?’

তবে অন্যদিন যেতে হয়নি। প্রবীণ মানুষটির কাছে পুরোনো বই, ঢাকা শহরের দাঙ্গা, ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের মতো প্রসঙ্গগুলো তুললে নিজেই শুরু করলেন কথার পিঠে কথা। গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শেষে সন্দ্বীপে নদীভাঙনে সব হারানো নুর আলমের জীবনের গল্প শুনলে আশ্চর্যই হতে হয়। হয়তো একেই বলে ‘শূন্য থেকে পূর্ণ হওয়া’।

মো. নুর আলম মাত্র ১২ বছর বয়সে ঢাকা শহরে এসে টিকে থাকতে রিকশা চালিয়েছেন। কখনো রাজমিস্ত্রির জোগালি হয়ে আধুলি পেয়েছেন পারিশ্রমিক হিসেবে। নীলক্ষেতের ফুটপাতে হকারি করে বিক্রি করেছেন মানুষের বাড়ি থেকে আনা পুরোনো বইপত্র, ম্যাগাজিনও। এখন শতাধিক কর্মচারীর বেতন দেন তিনি।

জীবনের বাঁকে বাঁকে পোড় খেয়ে অভিজ্ঞতা কুড়ানো নুর আলম আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের গত ৫০ বছরের সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী আমাকে একনামে চেনেন। বিশ্বাস না হলে জিজ্ঞেস করে দেখবেন। আমার দোকানের বই তাঁদের ভরসা।’

সেই ঢাকার কথা আপনাদের প্রজন্ম বুঝতেই পারবে না। এই নীলক্ষেতে ছিল কয়েক ঘর বস্তি। তালগাছটা নাই, একটা বটগাছও ছিল। এখন দোকানে ঢাকা পড়ে গেছে বড় মাঠ। বিশ্বাস হয় এই নীলক্ষেতে ফাঁকা মাঠ ছিল, রেললাইন ছিল?
মো. নুর আলম চৌধুরী, নীলক্ষেতের ফ্রেন্ডস বুক কর্নারের স্বত্বাধিকারী

কথা সত্যি। নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানের ২ নম্বর গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো তেঁতুলগাছটাও হয়তো নুর আলমের কথার সাক্ষী। এখানকার ফ্রেন্ডস বুক কর্নারের বয়স এখন ৫৮ বছর। বইয়ের দোকানটি শুরু করার আগে তিনি ঢাকা নিউমার্কেটের ২ নম্বর গেটের বিপরীতে ফুটপাতে বসে পুরোনো ম্যাগাজিন বিক্রি করতেন। এরপর বেঁচে থাকার তাগিদে করেছেন আরও বহু কাজ। তবে বই বিক্রির পেশাই তাঁকে বেশি টেনেছে।

‘তখন এমন পাঠক ছিল, যারা সত্যিকারের বইয়ের সমঝদার। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—এসব ঘটনায় অনেকের স্থানান্তর হয়েছে। ঘরবাড়ি বদলালেই বইপত্রে নাড়াচাড়া পড়ে। সেখান থেকে পুরোনো বই আমাদের কাছে কেজি হিসেবে বিক্রি করতেন ভাঙারিওয়ালারা। তাঁদের কাছ থেকে ইংরেজি ম্যাগাজিন কিনে বিক্রি করতাম। নীলক্ষেতে তখন বেশি হলে সাত থেকে আটজন বই বিক্রেতা ছিলেন,’ বলেন নুর আলম।

নীলক্ষেতে ১৯৬৬ সালে মোস্তফা চাচার বইয়ের দোকান। ছবিটি উইকলি ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়
ছবি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সংগৃহীত।

নুর আলম বলছিলেন গত শতকের ষাটের দশকের কথা। সেই ফুটপাতে বসে বই বিক্রি করা মানুষটি এত দিন পর কেমন আছেন, জানতে চাইলে নিজের প্রতিষ্ঠা করা ফ্রেন্ডস বুক কর্নার বইয়ের দোকান থেকে ইংরেজি বই প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় কয়েকটি ক্ল্যাসিক সাহিত্যের বই বের করে দিলেন। জানালেন, এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষের পাঠ্য। অরিজিনাল বইয়ের দাম কোনো কোনোটির দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। শিক্ষার্থীদের পক্ষে এই বই কিনে পড়া সম্ভব কি না, প্রশ্ন করলেন তিনি।

নুর আলম চৌধুরীর জবাব, একটা কথা মনে রাখবেন, চালাক হওয়ার চেয়ে সরল হওয়া অনেক কঠিন। জীবনে যদি কিছু করতে চান, সরল হতে চেষ্টা করবেন। কেউ আপনার ক্ষতি করতে পারবে না। আর নিজের কথা কম বলা ভালো, তাতে কাজের শক্তি নষ্ট হয় না। আলাদা করে লক্ষ্য কিছু ছিল না, সততার সঙ্গে পরিশ্রম করেছি। মানুষকে সম্মান দিয়েছি, আল্লাহ প্রতিদান দিয়েছেন।

ফ্রেন্ডস বুক কর্নার হুবহু আসল বইয়ের মতো একেকটি বই ফটোকপি করে দেয়, যার মূল্য থাকে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে ওই বইয়ের কপিরাইট তাঁকে কিনতে হয় অনেক টাকা দিয়ে। আর যেসব বইয়ের প্রথম প্রকাশের বয়স ৫০ বছরের বেশি, সেগুলোর কপিরাইট কিনতে হয় না।

নুর আলম জানান, সত্তরের দশকে তিনি ১০ টাকা করে বই ভাড়াও দিতেন শিক্ষার্থীদের। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন অল্প টাকায় বই নিয়ে পড়ে নোট করতে পারতেন, তেমনি তিনি নিজেও সেই টাকা দিয়ে আরও নতুন বই তৈরি করতে পারতেন। এভাবে বই দেওয়া-নেওয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করে তাঁর ফ্রেন্ডস বুক কর্নার।

দোকানের পাশাপাশি বড় হতে শুরু করে নুর আলমের স্বপ্নও। ফুটপাত থেকে উঠে আসেন নীলক্ষেতের ২ নম্বর গলির ভেতর সরকারের কাছ থেকে লিজ নেওয়া দোকানে। পরে নিজের ছোট ভাইদেরও এনে যুক্ত করেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। আরও বড় হয় ফ্রেন্ডস বুক কর্নার। নীলক্ষেতের রাফিন প্লাজার তৃতীয় তলায় শুরু হয় ফ্রেন্ডস বুক কর্নারের আরেকটি দোকান। এরপর শুরু হয় বই বাঁধাইয়ের কাজও। নুর আলমের জীবনের বাঁকবদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে ঢাকা শহরের দৃশ্যপটও। তাঁর ভাষায়, ‘সেই ঢাকার কথা আপনাদের প্রজন্ম বুঝতেই পারবে না। এই নীলক্ষেতে ছিল কয়েক ঘর বস্তি। তালগাছটা নাই, একটা বটগাছও ছিল। এখন দোকানে ঢাকা পড়ে গেছে বড় মাঠ। বিশ্বাস হয় এই নীলক্ষেতে ফাঁকা মাঠ ছিল, রেললাইন ছিল?’

কাজের সূত্রে বিভিন্ন দেশে গেছেন পঞ্চাশের দশকে নদীভাঙনে সব হারানো নুর আলম চৌধুরী
ছবি: সংগৃহীত

ফ্রেন্ডস বুক কর্নারের ভেতর দাঁড়িয়ে নুর আলম চৌধুরীকে তখন কথায় পেয়ে বসেছে। বললেন, ‘তখন কী সব মানুষ বই কিনতে আসতেন। তাঁরা সত্যিকার অর্থেই পাঠক ছিলেন। আমরাও বই সংগ্রহ করতাম পাঠকের কথা মাথায় রেখে। এখনকার বই বিক্রেতারা এসব কিছু ভাবেন না। ষাটের দশকে অনেক মানুষ তাঁদের বাড়ি ছেড়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গেছেন। তাঁদের বাড়ির বইপত্র নিয়ে আসতেন ভাঙারির দোকানদারেরা।’

‘বইয়ের সঙ্গে একটা সম্মান আছে, এই সম্মান আমাকে টানে’

নুর আলম চৌধুরীর জন্য ফুটপাত থেকে এত বড় দোকান তৈরির পথটা খুব সহজ ছিল না। সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়ে তিনি বিভিন্ন পেশায় কাজ করার চেষ্টা করেছেন। মিন্টু রোডে বিভিন্ন বাসায় শ্রম দেওয়া থেকে শুরু করে ঢাকা শহরে টিকে থাকতে রিকশাও চালিয়েছেন। কিন্তু কোনো পেশায় তিনি বইয়ের ঘ্রাণ পাননি। বারবার ফিরে এসেছেন বইয়ের কাছে।

‘সত্যি কথা বলি, আমি নিজে পড়ালেখা করি নাই। এখনো বই পড়ি না। তবে বইয়ের সঙ্গে একটা সম্মান আছে। এই সম্মান আমাকে টানে। সেটা ফুটপাতে বসে পুরোনো বই বিক্রিই হোক আর নতুন কেনা বিদেশি বই হোক। অন্য কোনো পেশায় এ সম্মান আমি দেখি না। তবে নিজে পড়ালেখা করি নাই বলে এখন আর আফসোস নাই। আমার সন্তানেরা পড়ালেখা করেছে,’ বললেন নুর আলম চৌধুরী।

কাজের সূত্রে বিভিন্ন দেশে গেছেন নুর আলম চৌধুরী। পরিচয়ও ঘটেছে অনেকের সঙ্গে
ছবি: সংগৃহীত

নুর আলমের চার সন্তানের একজন চিকিৎসক। আরেকজন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থিওরিটিক্যাল ফিজিকসে পিএইচডি করেছেন। বর্তমানে মহাকাশ গবেষণা নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন বলে জানান নুর আলমের বড় ছেলে জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী। জাহাঙ্গির বাবার সঙ্গে তাঁর ব্যবসায় দেখাশোনা করেন। তাঁকে পাওয়া যাবে রাফিন প্লাজার ফ্রেন্ডস বুক কর্নারে। বাবা প্রসঙ্গে জাহাঙ্গির আলম বলেন, ‘আমার আব্বার সবচেয়ে বড় গুণ, সারা জীবন কাজকে কাজ হিসেবে সম্মান করে আসছেন। দায়িত্বশীল মানুষ। নিজের ব্যবসার পাশাপাশি পাঠক কী চায়, তা নিয়ে ভাবেন।’

কাজের সূত্রে নুর আলম চৌধুরী ঘুরেছেন পৃথিবীর অনেক দেশ। দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, ভারতে গেছেন কখনো বইমেলা, কখনো বই বাঁধাই প্রক্রিয়া নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে অংশ নিতে। বর্তমানে রাজধানীর কলাবাগানে বশিরউদ্দিন লেনের বাসিন্দা তিনি। ঢাকা শহরেই আছে তাঁর আরও চারটি বাড়ি।

তবে বশিরউদ্দিন রোডের বাড়িটা নিয়ে নুর আলমের বিশেষ অভিজ্ঞতা আছে। ২০০৩ সালে বাড়িটি বরেণ্য অভিনেতা প্রয়াত আলী যাকের বিক্রি করেছিলেন তাঁর কাছে। সেই সময় তাঁদের মধ্যে স্মৃতিচারণা হয়, সারা যাকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ফ্রেন্ডস বুক কর্নার থেকে বই কিনতেন। এই দোকানের কথা অবশ্য নীলক্ষেতের অন্য বর্ষীয়ান দোকানির কাছ থেকে শুনেই আসা। এখানকার ‘আকন বই বিতান’–এর বয়স ৪০ বছরের বেশি। পুরোনো বইয়ের এ দোকানের মালিক সুলতান মাহমুদ। তিনিই সন্ধান দিয়েছিলেন ফ্রেন্ডস বুক কর্নারের।

সোমবার সন্ধ্যায় নুর আলম চৌধুরীর জীবনের সাফল্যের গল্প শুনতে শুনতে জানা গেল, ষাট ও সত্তরের দশকের ঢাকা শহরের বদলে যাওয়ার কিছু গল্প। মুক্তিযুদ্ধের সময় নীলক্ষেতের এই তেঁতুলগাছের তলায় বসে একজন বিহারি ব্যক্তি মলম বিক্রি করতেন। নুর আলম শোনালেন সেই মানুষের মৃত্যুর ঘটনা, নিউমার্কেটের পাশে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যালয়ের গল্পও। ফিরে আসার আগে জানতে চাই, জীবনের এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল আপনার?

নুর আলম চৌধুরী মনে করেন, কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও সততা থাকলে সাফল্য আসবেই
ছবি: সংগৃহীত।

নুর আলম চৌধুরী জবাব, ‘একটা কথা মনে রাখবেন, চালাক হওয়ার চেয়ে সরল হওয়া অনেক কঠিন। জীবনে যদি কিছু করতে চান, সরল হতে চেষ্টা করবেন। কেউ আপনার ক্ষতি করতে পারবে না। আর নিজের কথা কম বলা ভালো, তাতে কাজের শক্তি নষ্ট হয় না। আলাদা করে লক্ষ্য কিছু ছিল না, সততার সঙ্গে পরিশ্রম করেছি। মানুষকে সম্মান দিয়েছি, আল্লাহ প্রতিদান দিয়েছেন।’