বিদ্যুৎ–জ্বালানিসংকট: সমাধান আছে, দরকার বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া

কে এম রেজাউল হাসনাতফাইল ছবি

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংকটের মধ্যে রয়েছে। সেই সংকটের ভুক্তভোগী দেশের মানুষ ও শিল্প খাত। সংকটের মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া।

কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ প্রায় বন্ধ। রাশিয়ার সরবরাহও সীমিত হয়ে পড়েছে। ইউরোপের দেশগুলোর এলএনজির মজুত কমে গেছে। তারা অনেকটা আগ্রাসীভাবে খোলা বাজার বা স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করছে। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো প্রয়োজনমতো এলএনজি কিনতে পারছে না।

এদিকে সরকার নিয়মিত সরবরাহকারীর বাইরে কিছু সরবরাহকারীর সঙ্গে এলএনজি কেনার চুক্তি করেছে, যারা আসলে পরীক্ষিত নয়। তারা যথাসময়ে সরবরাহ করছে না।

আরও পড়ুন

শিল্পের জন্য বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুতের সংকট হলে প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। ১ ডলার ব্যয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলে তা অর্থনীতিতে ৩০ ডলারের সমপরিমাণ মূল্য যোগ করে। তাই সরকারকে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সমাধানও আছে।

দ্রুত সমাধানের একটি পথ হলো অব্যবহৃত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানো।

বর্তমানে এসব কেন্দ্রের প্রায় ৬০ শতাংশ সক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে। অথচ সরকার চুক্তি অনুযায়ী এসব কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট (বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া) দিচ্ছে। অব্যবহৃত সক্ষমতার একটি বড় অংশ কাজে লাগানো গেলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্যাসভিত্তিক কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখা যেতে পারে। সেই গ্যাস শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা যাবে।

ধরা যাক, দেড় হাজার মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা হলো। এতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট সাশ্রয় করে তা শিল্পে দেওয়া যাবে।

কেউ কেউ বলতে পারেন, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালালে সরকারের খরচ বাড়বে। কিন্তু সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। বর্তমানে এলএনজির ওপর করভার মাত্র ২ শতাংশ। ফার্নেস তেলের ওপর তা ৩০ শতাংশের বেশি। এটা কমিয়ে দিলেই ফার্নেস তেল আমদানির ব্যয় কমবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কম হবে।

দেশে আগামী নভেম্বর থেকে তাপমাত্রা কমবে। তখন বিদ্যুতের চাহিদাও কমবে। ফলে সরকারকে মূলত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর—এই দুই মাসে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে, শিল্প খাতকে বাঁচাতে হবে।

মধ্য মেয়াদে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের বিকল্প নেই। দেশে গ্যাসের মজুত আছে ৭ টিসিএফ (লাখ কোটি ঘনফুট)। তা নিয়ে সাত বছরের মতো চলা যাবে। কিন্তু যে পরিমাণ কয়লা আছে, তা দিয়ে বহু বছর চলা যাবে। দেশের সম্পদ মাটির নিচে রেখে দিয়ে লাভ কী, যেখানে জ্বালানির কারণে পুরো দেশই সংকটে পড়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়া উচিত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান। সমুদ্রের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

দীর্ঘ মেয়াদে ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) নিয়েও এখন থেকেই পরিকল্পনা করা দরকার। ছোট আকারের এসব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ১০০, ২০০ বা ৩০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। বড় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৫০০ বা ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা বিভিন্ন অঞ্চলে সঞ্চালন করতে হয়। কিন্তু কোনো একটি অঞ্চলের চাহিদা যদি তুলনামূলক কম হয়, তাহলে বড় কেন্দ্রের বিদ্যুৎ সেখানে পৌঁছাতে দীর্ঘ সঞ্চালনব্যবস্থার প্রয়োজন হয়।

এসএমআরের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ছোট কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ থাকবে। যেমন সিলেট বা চট্টগ্রামের মতো অঞ্চলে ছোট ক্ষমতার কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে ওই অঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদার একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবেই পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।

এসএমআর এখনো বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য হবে।

সৌরবিদ্যুতের ওপরও জোর দেওয়া যায়। তবে মনে রাখা দরকার, শিল্পের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের উৎস হিসেবে সৌরবিদ্যুতের কার্যকর নয়। সৌরবিদ্যুৎকে প্রচলিত জ্বালানির সরাসরি বিকল্প হিসেবে না দেখে সহায়ক উৎস হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে আমার শেষ কথা হলো, জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

কে এম রেজাউল হাসনাত: বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি