দেশে নতুন করে ম্যালেরিয়া, এইচআইভি–এইডসের মতো রোগের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবন মিলনায়তনেছবি: প্রথম আলো

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশে নতুন করে ম্যালেরিয়া, এইচআইভি–এইডসের মতো রোগের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। তবে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশাসন ঐক্যবদ্ধভাবে সব রোগের বিরুদ্ধে লড়ছেন। এতে সরকার অনেকাংশে সফলও হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’–এর উদ্বোধন উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, অনেক সময় অসচেতনতা ও অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে মানুষ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের মুখোমুখি হচ্ছে। করোনা মহামারির সময়ের মতো হাত ধোয়া, মাস্ক পরা ও পরিচ্ছন্নতার সঠিক চর্চা বাড়ালে যেকোনো মহামারি প্রতিরোধ করা সম্ভব। রোগমুক্ত থাকতে তিনি সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের প্রতি জোর দেন।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’–এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন। আগামী শনিবার থেকে নির্ধারিত এলাকায় মুখে খাওয়ার কলেরা টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হবে। আর আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে দেওয়া হবে দ্বিতীয় ডোজ।

যাদের জন্য টিকা প্রযোজ্য নয়

অনুষ্ঠানে ক্যাম্পেইন–সংক্রান্ত একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ। তিনি জানান, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের এই টিকা গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়া তীব্র সংক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি টিকার কোনো উপাদানে গুরুতর অ্যালার্জি হলে তাঁদের টিকা গ্রহণে বিরত থাকতে হবে।

হালিমুর রশিদ বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে কলেরাজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুহার ৯০ শতাংশ কমানো। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও স্থায়ী নিয়ন্ত্রণে কাজ করা।

এই টিকা শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় করে কলেরার জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরিতে সাহায্য করে বলে উল্লেখ করেন হালিমুর রশিদ। তিনি বলেন, তবে টিকাদানের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি উন্নয়নে কাজ করতে হবে।

মোট ৫১ লাখ ৭৫ হাজার ২৫ জনকে ১ কোটি ৩ লাখ ৫০ হাজার ৫৪ ডোজ টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এই ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে বলে জানান হালিমুর রশিদ।

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোট ১৪টি এলাকায় এই ক্যাম্পেইন পরিচালিত হবে বলে জানানো হয়। এই ক্যাম্পেইনে সহযোগিতা করছে টিকাবিষয়ক আন্তর্জাতিক জোট গ্যাভি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, আইএফআরসি ও আইসিডিডিআরবি।

১ বছরের বেশি বয়সী সবাই পাবে টিকা

জনগণের স্বাস্থ্যসেবা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার প্রাথমিক চিকিৎসা জোরদারে নানা পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে বলে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, রোগ প্রতিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, এক বছরের বেশি বয়সী সবাইকে টিকা নিতে হবে। কর্মসূচি সফল করতে তিনি এক বছরের বেশি বয়সী সবাইকে টিকাদানকেন্দ্রে নিয়ে যেতে আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী বলেন, প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম শুরু হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে কলেরা ৯০ শতাংশ কমিয়ে পুরোপুরি নির্মূল করার বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে এই কর্মসূচি শুরু হলো। টানা পাঁচ বছরব্যাপী এই টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

ফিরদৌসী কাদরী জানান, এর আগে ট্রায়াল ও ২০২২ সালের প্রাদুর্ভাবের সময় প্রায় ১ কোটি কলেরা টিকা দেওয়া হয়েছিল। তবে এবারই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রোগ প্রতিরোধমূলক টিকা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা এই কর্মসূচির মূল বাস্তবায়নকারী হিসেবে কাজ করছে।

জনসচেতনতা ছাড়া সরকারের কোনো পদক্ষেপই কার্যকর হবে না বলে উল্লেখ করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম। তিনি বলেন, সমন্বিত অভিযানের পরও অসচেতনতার কারণে নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এখন থেকে আইন প্রয়োগ করা হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হবে।

ঢাকায় বায়ু ও শব্দদূষণ রোধ এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক। তিনি বলেন, স্ট্রিট ফুড স্বাস্থ্যসম্মত না হলে তা বিক্রি করতে দেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঢাকাকে ‘গ্রিন’ ও ‘ক্লিন সিটি’ হিসেবে গড়তে সবাইকে নিজ নিজ জায়গা পরিষ্কার রাখাসহ গাছ লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি আহমেদ জামশীদ মোহাম্মেদ, ইউনিসেফের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ পিটার জর্জ এল মাইস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিব মো. হাবিবুর রহমান খান প্রমুখ।