শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসিএ নাকি ম্যানেজিং কমিটির হাতে, বিতর্কের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী বললেন, সিদ্ধান্ত হয়নি

ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার আলোচনার মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। ১০ আগস্ট ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএর (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) কাছ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হচ্ছে—এমন দাবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল–সংগঠনও বিবৃতি ও বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত হলে একটি পক্ষ আগাম আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, এখনো এমন কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি।

বিরোধী দল–সংগঠনের নেতা–কর্মীদের সমালোচনার মুখে আজ সোমবার সন্ধ্যা থেকে সরকার–সমর্থকদের পাল্টা পোস্ট করে গুজব–অপপ্রচার থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানাতে দেখা গেছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ফেসবুকে পোস্ট দেন রাত ৯টার দিকে।

বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ হয় এনটিআরসিএর অধীন পরীক্ষা ও সুপারিশের ভিত্তিতে। তবে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ এবং প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং কর্মচারী পদে নিয়োগ পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে হয়ে আসছিল। সম্প্রতি অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ এবং প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং কর্মচারী পদে নিয়োগও এনটিআরসিএর মাধ্যমে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে লিখিত পরীক্ষাও হয়েছে।

এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত এক সভায় এ নিয়ে আলোচনা হয়। ওই সভার কার্যবিবরণী ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা শুরু হয়। ১৯তম এনটিআরসিএ শিক্ষক (প্রবেশ পর্যায়) নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণের আলোচনার সিদ্ধান্ত হিসেবে সেখানে উল্লেখ রয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’ অনুযায়ী এখন থেকে এনটিআরসিএ কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে। ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী আর নিয়োগ সুপারিশ করবে না। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

ওই কার্যবিবরণীতে আরও বলা হয়, এনটিআরসিএর বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে আগের মতো তাদের মাধ্যমে শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং প্রত্যয়ন করা শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানের নিজ নিজ ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি কর্তৃক নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে বর্তমান সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে বলে সভায় অভিমত ব্যক্ত করা হয়।

বিষয়টি সামনে আসার পর গতকাল রোববার রাতে এক ফেসবুক পোস্টে আন্দোলনের আগাম ঘোষণা দেন এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী। আজ বিকেলের পর থেকে চাকরিপ্রত্যাশী আরও অনেকেই এটা নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন।

আরও পড়ুন

পাল্টাপাল্টি পোস্ট, বিবৃতি, মিছিল

আজ সন্ধ্যা থেকে সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি চাকরিপ্রত্যাশীদের অনেকেই শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি এনটিআরসিএর কাছ থেকে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নেওয়ার বিরুদ্ধে ফেসবুকে সরব হন। তাঁদের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার পোস্ট বেশ আলোচিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হলে বড় ধরনের আন্দোলনের মুখে পড়তে হবে সরকারকে। স্কুলগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেওয়া হবে না। বেকার তরুণদের জন্য কোটি কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলে উল্টো কর্মসংস্থান কেড়ে নিয়ে স্কুলগুলোকেও দলীয়করণ করতে চাচ্ছে বিএনপি সরকার।’

বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে একাধিক পোস্ট দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া
ছবি: আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট

সন্ধ্যার পর জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে। বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় প্রবেশ পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়ার উদ্যোগের নিন্দা জানিয়ে দলটি বলেছে, সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয় প্রভাব ও ঘুষ-বাণিজ্যের পুরোনো চক্র আবার সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তার এবং আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হবে।

জামায়াত বলেছে, বিদ্যমান নিয়োগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও জটিলতাগুলো দূর করে সেটিকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও বাস্তবমুখী করার পরিবর্তে যদি আবার ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে তা শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ অতীতের মতো আবার তৈরি করবে। এ উদ্যোগ বাতিল করার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছে দলটি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি আজ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। রাতে এক বিবৃতিতে ম্যানেজিং কমিটির পরিবর্তে এনটিআরসিএ–কেই শিক্ষক নিয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র আন্দোলন। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।

আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ছাত্রসংগঠন ছাত্রপক্ষ এক বিবৃতিতে বলেছে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে মানেই ঘুষ-বাণিজ্যের পুনরুত্থান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগটিকে ‘মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ ধ্বংসের পাঁয়তারা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তারা বলেছে, মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিবর্তে অর্থ ও তদবিরভিত্তিক নিয়োগ প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে।

শিক্ষামন্ত্রীর পোস্ট

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছিল, তখন সরকার–সমর্থক ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা এ ব্যাপারে সবার আগে সরব হন। একপর্যায়ে রাতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন পৃথক ফেসবুক পোস্টে একই ধরনের বার্তা দেন। তাঁরা বলেন, ‘সবাইকে গুজবনির্ভর অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করছি। এনটিআরসিএ নিয়ে সঠিক তথ্য খুব শিগগির জানা যাবে।’

বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন রাতে ফেসবুকে পোস্ট এই তথ্য দিয়েছেন
ছবি: শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া

পরে রাত ৯টার দিকে শিক্ষামন্ত্রীর ফেসবুক পেজ ‘এহছানুল হক মিলন মিডিয়া সেল’–এ এক পোস্টে এ বিষয়ে একটি বক্তব্য দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘এনটিআরসিএ ২০০৫ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এনটিআরসিএর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দরভাবে কীভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পর্যালোচনা অব্যাহত রেখেছে। ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া–সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। এ বিষয়ে কোনো অপতথ্য প্রচার না করার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ রইল।’ শিক্ষামন্ত্রীর এই পোস্ট ছাত্রদলের সভাপতি–সাধারণ সম্পাদকসহ সরকার–সমর্থক অনেককেই শেয়ার করতে দেখা গেছে।