রূপে–গুণে অনন্য শঙ্করজাতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানে শঙ্করজাতা ফুল ও পাতাছবি: লেখক

কয়েক বছর আগে সারদা পুলিশ একাডেমির আমন্ত্রণে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মাকে নিয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। রাজশাহীর সারদায় আমাদের এই সফরের উদ্যোক্তা ছিলেন সেখানকার তৎকালীন এসপি অ্যাডমিন সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তিনি ছিলেন আন্তরিক, সদালাপী এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ। সবকিছু ছাপিয়ে একজন অনন্য বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও তাঁর আলাদা পরিচয় আছে। আমার ওপর দায়িত্ব ছিল সারদায় যাওয়ার জন্য দ্বিজেনদাকে রাজি করানো। কারণ, বার্ধক্যের কারণে দাদা তখন দূরের ভ্রমণ এড়িয়ে বেশির ভাগ সময় বাসায় থাকতেই আরাম বোধ করতেন। দাদাকে সারদায় যাওয়ার প্রস্তাব দিতেই সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করলেন। কিন্তু হাল ছাড়ি না আমি। অবশেষে রাজি হলেন এক শর্তে, রাজশাহী গেলে তাঁকে খাওয়াতে হবে আম! এ যে নিছক দুষ্টুমি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

অবশেষে দুদিনের জন্য আমরা সারদায় গেলাম। প্রথম দিন ঘুরে ঘুরে দেখা হলো সেখানকার গাছগুলো। বেশ কিছু শতোর্ধ্ববর্ষী বৃক্ষ আছে সেখানে। দেখে মনে হলো গাছগুলো বেশ যত্নেই আছে। সারদার সুসজ্জিত উদ্ভিদরাজির মধ্যে বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়ল একচিলতে ঔষধি বাগান। এই বাগানেই দেখা মিলল অপূর্ব শঙ্করজাতা ফুলের। পরে অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানসহ প্রাকৃতিক আবাসেও ফুলটির দেখা পেয়েছি।

শঙ্করজাতা (Uraria picta) শাখাবহুল, বহুবর্ষজীবী বীরুৎ বা ছোট গুল্ম। প্রাচীনকাল থেকেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলোয় বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এই গাছের ব্যাপক ব্যবহার করে। এটি শতাধিক আয়ুর্বেদিক ফর্মুলেশনের একটি মূল উপকরণ এবং ভারত, চীন, জাপান ও আমেরিকায় অনেক পেটেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই উদ্ভিদ বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ভারত এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে বেশ চাহিদা রয়েছে। প্রচুর পরিমাণে আহরণ করায় বর্তমানে গাছটি প্রাকৃতিক আবাসে বিপন্ন হয়ে উঠেছে। শঙ্করজাতার বেশ কিছু ঔষধি গুণ রয়েছে যেমন, ক্যানসার প্রতিরোধী, প্রদাহরোধী, ডায়াবেটিক, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ইত্যাদি। গবেষণাপত্রের তথ্য অনুসারে এই গবেষণাগুলো মূলত উদ্ভিদের নির্যাসের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, পৃথক বিপাককে কেন্দ্র করে নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানে শঙ্করজাতা ফুল
ছবি: লেখক

এই উদ্ভিদ একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আয়ুর্বেদিক সূত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যাতে ১০টি ভেষজ উদ্ভিদের শিকড় রয়েছে। দশমুলা ছাড়াও এটি ১০০টির বেশি আয়ুর্বেদিক ফর্মুলেশন যেমন অমৃতরিষ্ট, দশমূলচূর্ণ, অভ্রক ভস্ম, ব্রহ্ম রসায়ন, দহমুলা তৈলা, রাজন্যাদি চূর্ণ, অনু তাইলা ইত্যাদির মূল উপাদান হিসেবে পরিচিত। উদ্ভিদটি সাধারণ দুর্বলতা, হৃদ্‌রোগ, রক্তরোগ এবং সাপের বিষের প্রতিষেধক হিসেবেও বেশ কার্যকর। এ ছাড়া শঙ্করজাতা কৃমির ভালো প্রতিষেধক। মূলের নির্যাস উদ্দীপক, ক্বাথ কফ, ঠান্ডা এবং জ্বরে ব্যবহৃত হয়। ফল শিশুদের গলাব্যথায় কাজে লাগে।

  • মোকারম হোসেন, প্রকৃতি পরিবেশবিষয়ক লেখক