দীঘিরপাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়
ভবন নির্মাণের কাজ সাড়ে ৫ বছরেও শেষ হয়নি, দুর্ভোগ
বরিশালের উজিরপুরের বাইনের দীঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের নির্মাণকাজ সাড়ে পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি।
বিদ্যালয়ের ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল সাত বছর আগে। এর এক বছর পর বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভবন নির্মাণের কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এখন একটি অস্থায়ী টিনের ঘরে গাদাগাদি করে পাঠদান করতে হচ্ছে। ছোট ছোট কক্ষে পাঠদান করায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকেরাও ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।এই চিত্র বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জল্লা ইউনিয়নের বাইনের দীঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগ, ঠিকাদারের গাফলতি ও অনিয়মের কারণে নির্মাণকাজ শেষ হচ্ছে না। শ্রেণিকক্ষসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের বসার জায়গা না থাকায় পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উজিরপুর উপজেলার জল্লা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় ১৯৭০ সালে বাইনের দীঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই সময় নির্মিত বিদ্যালয়ের ভবনটি ২০১৬ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়। পরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বরিশাল কার্যালয় একটি নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ৭৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬০৫ টাকা বরাদ্দ দেয়। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওই বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ওই বছর ৩০ নভেম্বর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিকদার কনস্ট্রাকশনকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত সাড়ে পাঁচ বছরেও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, বাইনের দীঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১১০ জন শিক্ষার্থী আছে। দুই পালায় চারজন শিক্ষক তাঁদের পাঠদান করেন।
রোববার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। দীঘির উত্তরপাড়ে একটি টিনের ঘর তুলে সেখানে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয়। ওই টিনের ঘরে তিনটি কক্ষ আছে। এর মধ্যে একটি কার্যালয় ও অপর দুটি শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিটি কক্ষের দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ও প্রস্থ ৮ ফুট। শ্রেণিকক্ষগুলো ছোট হওয়ায় শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসে ক্লাস করতে হয়।
সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের ভিত, নিচের বিম, কলাম ও ছাদের সেন্টারিং করা হয়েছে। এর পর থেকে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় বিম ও কলামে ব্যবহৃত রড মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষক ও অবিভাবকরা জানান, অত্যধিক ঝুকিপূর্ণ হওয়ার কারণে ২০১৮ সালে পরিত্যক্ত ভবনটির ভেঙ্গে ফেলা হলে ছোট শিশুদের রোদ–বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করা হতো। পরে দীঘির উত্তর পাড়ে যেনতেনভাবে একটি টিনের ঘর তোলা হয়। সেখানের কক্ষগুলো ছোট হওয়ায় বসতে কষ্ট হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থীই বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দেয়। ঠিকাদার সাড়ে পাঁচ বছরেও কাজ শেষ করতে পারেননি।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়া বালা, অসীম হালদার, আমিনা খানম বলে, ‘এখানে ক্লাস করতে কষ্ট হয়, বসার জায়গা থাকে না। মোরা অনেকেই জায়গা না পাইয়া বাড়ি চইললা যাই। আবার রোদে টিন গরম হয়ে গেলে ক্লাসে বসা যায় না।
বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক প্রবীর কুমার মণ্ডল জানান, ২০১৮ সালে ঠিকাদার পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলেন। পরে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেনতেনভাবে একটি টিনের ঘর নির্মাণ করে পাঠদান করা হয়। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি উজিরপুর উপজেলা প্রকৌশলীকে জানানোর পরেও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেননি।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিকদার কনস্ট্রাকশনের মালিক ফয়সাল আহম্মেদের মুঠোফোনে ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। প্রকল্পের তদারকি কাজে নিয়োজিত এলজিইডির উজিরপুর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, কাগজপত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ফয়সাল আহম্মেদ হলেও প্রকৃত ঠিকাদার মো. লিটন সেরনিয়াবাত। নানা অজুহাতে তিনি নির্মাণকাজ শেষ করতে বিলম্ব করছেন। বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও কাজটি বন্ধ রয়েছে। এ ব্যাপারে লিটন সেরনিয়াবাতের কাছে জানতে তাঁর মুঠোফোনে কল করলেও তিনিও ধরেননি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রকল্প তদারককারী মো. মামুন বলেন, কিছুদিন কাজ করার পরে রাজমিস্ত্রি না পাওয়ায় কাজ বন্ধ ছিল। শিগগিরই কাজ শেষ করা হবে।
এ বিষয়ে উজিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহনাজ বেগম বলেন, বিদ্যালয়ের ভবনটি নির্মিত না হওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। উপজেলা প্রকৌশলীকে অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী সুব্রত রায় বলেন, দ্রুত কাজ শেষ করতে ঠিকাদারকে গত ছয় মাসে বেশ কয়েকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।