সুন্দরবনে ২৩ বছরে ২৭ বার আগুন, কীভাবে লাগে, তদন্ত প্রতিবেদন কী বলে

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের তেইশের ছিলা এলাকায় আগুন লেগেছে। রোববার সকালেছবি: প্রথম আলো

পরপর দুই দিন সুন্দরবনের আলাদা দুটি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের কলমতেজী টহল ফাঁড়ির টেপার বিলে গতকাল শনিবার সকালে আগুন লাগে। ওই আগুন নিয়ন্ত্রণে আসতে না আসতে আজ রোববার সকালে পাশের তেইশের ছিলা এলাকায় আগুন লেগেছে। গতকালের তুলনায় এই আগুনের তীব্রতা বেশি এবং দ্রুত ছড়াচ্ছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

এ নিয়ে গত ২৩ বছরে সুন্দরবনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে ২৭ বার। যার সব কটিই পূর্ব সুন্দরবন এলাকায় এবং লোকালয়-সংলগ্ন ভোলা নদীর পাশের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের বনাঞ্চলে।

এসব আগুনের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, বেশির ভাগ আগুন লেগেছে জেলে-মৌয়ালদের অসাবধানতায়। যদিও এ নিয়ে বনজীবীদের দ্বিমত আছে।

আরও পড়ুন

এর আগে গত বছরের ৪ মে ভোলা নদী থেকে সোয়া দুই কিলোমিটার দূরে আমোরবুনিয়া টহল ফাঁড়ির লতিফের ছিলা এলাকায় আগুন লাগে। ওই আগুনে প্রায় পাঁচ একর বনভূমির গাছপালা পুড়ে যায়। সব মিলিয়ে ২০০২ সাল থেকে গতকালের আগপর্যন্ত ২৫টি অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত করেছে পূর্ব বন বিভাগ।

তদন্ত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২৫টি আগুনের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৫ লাখ টাকার বেশি। অগ্নিকাণ্ডে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ক্ষতি ধরা হয়েছে আনুমানিক হিসাবে। ফলে হিসাবে যে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আসেনি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অধিকাংশ আগুনের সূত্রপাতের কারণ হিসেবে জেলে-মৌয়ালদের অসাবধানতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ জেলে-মৌয়ালদের বিড়ি-সিগারেট বা মৌমাছি তাড়াতে জ্বালানো মশাল থেকেই সবচেয়ে বেশি আগুনের সূত্রপাত হয়।

সুন্দরবনে লাগা আগুন নেভানোর কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

তবে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আগুন লাগার কারণ নিয়ে দ্বিমত আছে বনজীবীদের। ২০২১ সালে আগুনের ঘটনার পর প্রথম আলো কথা বলেছিল বনজীবী শরণখোলার আফজাল হোসেনের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। তখন তিনি কাজ করতেন কমিউনিটি প্যাট্রল গ্রুপের (সিপিজি) হয়ে। বিনা বেতনের এই কাজের সূত্রে দাসের ভারানির অগ্নিকাণ্ডের সময় টানা চার দিন তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

আফজাল হোসেন বলেছিলেন, মশাল বা বিড়ি-সিগারেট থেকে আগুন তখনই লাগতে পারে, যখন ওই জেলে-মৌয়াল অসচেতন থাকেন। কিন্তু নিজের একমাত্র জীবিকার স্থানে কেউ অসচেতন থাকেন না। তাঁদের সচেতন থাকতেই হয়। কারণ প্রথমত, মধু বা মাছ সংগ্রহের জন্য তাঁদের একই জায়গায় বারবার যেতে হয়। দ্বিতীয়ত, অপরাধ প্রমাণিত হলে বন আইনের কঠোর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ তাঁদের নেই।

গতকাল শনিবার টেবিল বিল এলাকায় আগুন নেভাতে যাওয়া গুলিশাখালী এলাকার বনজীবী মাহবুব তালুকদার ও মজিবর সরদার প্রথম আলোকে বলেন, এখানে আগুন লাগে না; আগুন দেওয়া হয়। ভোলা নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে ভেতরে বিল এলাকা তৈরি হয়েছে। সুন্দরবনের এই বিলে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। ওই মাছ ধরার সুবিধার জন্য একশ্রেণির অসাধু লোক বনে আগুন দেয়। তারা কারেন্ট জাল দিয়ে বর্ষায় মাছ ধরে। গতকাল আগুন নেভাতে গিয়ে তাঁরা বনমোরগ ধরার ফাঁদ দেখতে পেয়েছেন।

আগুনের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সন্দেহ থাকে মৌয়ালদের মশাল নিয়ে। মধু সংগ্রহের জন্য প্রতি মৌসুমে কয়েক দিনের জন্য বনে প্রবেশ করেন মধু-গবেষক সৈয়দ মুহাম্মদ মঈনুল আনোয়ার। বিভিন্ন বহর নিয়ে বনে যাওয়া মঈনুল আনোয়ার প্রথম আলোকে মশাল বানানো আর তা নিভিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার কথা জানিয়েছিলেন। মঈনুল বলেন, ‘ভেতরের শুকনা পাতা বেঁধে বাইরের দিক কাঁচা পাতা দিয়ে মশাল বানানো হয়। স্থানীয় মানুষ “কারু” নামে ডাকে। ভেতরের শুকনা পাতা বেশি থাকে না। সেটা পুড়ে কাঁচা পাতায় আগুন ধরার চেষ্টা করলে ধোঁয়া ছড়ায়। এই “কারু” একটি চাক কাটতে কাটতেই নিভে যায়। যদি অবশিষ্ট থাকেও, তাহলে তা পানি বা ভেজা মাটিতে গুঁজে নিভিয়ে দেওয়া হয়।’

২০২১ সালে সুন্দরবনের দাসের ভারানি এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে
ফাইল ছবি

প্রতিবারই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হয় সংশ্লিষ্টদের। গতবার আগুনের ঘটনায়ও ‘কর্ডন’ বা ‘ফায়ার লাইন’ (আগুন নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখতে চারদিকে নির্দিষ্ট গভীরতায় নালা খনন) তৈরি করতে হিমশিম খেয়েছেন কর্মীরা। এবারের দুটি আগুন লাগা এলাকাও লোকালয় থেকে দূরে ও পানির উৎসের দূরত্বের পর দ্রুত ফায়ার লাইন কাটায় আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়। রোববার যে নতুন এলাকায় আগুন লেগেছে, তা দ্রুত ছড়াচ্ছে উল্লেখ করলেও নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু হয়েছে দ্রুত।

আরও পড়ুন

সুন্দরবনে বারবার আগুনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ পরিবেশকর্মীরা। ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’র সমন্বয়কারী নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের কলমতেজী এলাকায় আগুন এবারই প্রথম নয়। আগেও অন্তত দুবার এখানে আগুন লেগেছে। সেই পোড়া গাছের কয়লা হয়ে যাওয়া গোড়ার অংশ এখনো আছে। এখানে চলাচলের পথ আছে। গরু-মহিষের গোবর দেখা যাচ্ছে। এতে বোঝা যায়, মানুষের অবাধ বিচরণ আছে। কিন্তু সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এমন অবাধ বিচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রতিবছর বর্ষার আগেই এই আগুন দেওয়া হয়। যেকোনো মূল্যে এদের প্রতিহত করতে হবে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন