‘রেল তো মেসেজ দেয়নি, স্টেশনে এসে বিপদে পড়লাম’
রেলের রানিং স্টাফদের কর্মবিরতির কারণে আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম স্টেশন ছাড়েনি কোনো ট্রেন। সকালে স্টেশনে এসে বিপাকে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। তাঁদের প্রায় সবারই জরুরি প্রয়োজনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল।
এ রকম একজন যাত্রী জিয়াউল হোসেন। পেশায় প্রভাষক জিয়াউল হোসেনের সকালে কক্সবাজার এক্সপ্রেসে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে যাওয়ার কথা। তিনি বলেন, পারিবারিক জরুরি কাজে কক্সবাজার যাওয়া প্রয়োজন। এ জন্য আগেই টিকিট কেটেছিলেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই স্টেশনে চলে আসেন। কিন্তু স্টেশনে এসে শোনেন ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে জিয়াউল হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রস্তুতি নিয়ে স্টেশনে এসেছি। ট্রেন চলাচল না করলে রেল থেকে মুঠোফোনে মেসেজ দিয়ে জানানো যেত। রেল তো কোনো মেসেজ দেয়নি, স্টেশনে এসে বিপদে পড়লাম। খুব অমানবিক হয়ে গেল বিষয়টি।’ তিনি আরও বলেন, যাত্রীরা তো দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন। যদি আগে জানানো হতো, তাহলে এত সকালে কষ্ট করে আসতে হতো না। এখন আবার বিকল্প পথে যেতে হবে।
আজ সকাল সাড়ে ছয়টায় চট্টগ্রাম স্টেশনে কথা হয় জিয়াউল হোসেনের সঙ্গে। স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে যাত্রীদের ভিড়। শত শত যাত্রী স্টেশন ভবনে জড়ো হয়ে রয়েছেন। তাঁদের কেউ পরিবার, কেউ আত্মীয়স্বজন, কেউ একাকী এসেছেন। বেশির ভাগই ট্রেন বন্ধের বিষয়টি জানতেন না। স্টেশনে এসে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার খবর শুনে কাউন্টারগুলোতে ভিড় করেন। এ সময় রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন যাত্রীরা।
মাইলেজের ভিত্তিতে পেনশন ও আনুতোষিক দেওয়া এবং নিয়োগপত্রের দুই শর্ত প্রত্যাহারের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। তাঁরা ২৭ জানুয়ারির মধ্যে দাবি মানার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। দাবি না মানায় তাঁদের কর্মবিরতির কারণে গতকাল মধ্যরাত থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
রেলওয়ের রানিং স্টাফ বলতে ট্রেনের চালক, সহকারী চালক, গার্ড ও টিকিট পরিদর্শকদের (টিটিই) বোঝানো হয়। তাঁরা ১৬০ বছর ধরে মাইলেজ সুবিধা পাচ্ছিলেন। অর্থাৎ দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ করলে বেসিকের (মূল বেতন) হিসেবে বাড়তি অর্থ পেতেন। এ ছাড়া অবসরের পর বেসিকের সঙ্গে এর ৭৫ শতাংশ অর্থ যোগ করে অবসরকালীন অর্থের হিসাব হতো। তবে ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর এই সুবিধা সীমিত করে অর্থ মন্ত্রণালয়।
রানিং স্টাফ সংগঠনের নেতারা জানান, সুবিধা সীমিত করায় ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিলও ট্রেন ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করেছিলেন তাঁরা। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিলে ওই কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এই দাবি আদায়ে আবার নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল মধ্যরাত থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ রানিং স্টাফ ও কর্মচারী ইউনিয়নের চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর সম্পাদক গোলাম শাহরিয়ার প্রথম আলোকে বলেন, ১৬০ বছর ধরে আইন মেনে তাঁদের মাইলেজ সুবিধা দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু সরকার আইন না মেনে এই সুযোগ-সুবিধা সীমিত করেছে। তাই তাঁদের দাবি মেনে নিতে হবে। নইলে এই ধর্মঘট কর্মসূচি চলবে।
আজ সকালে লাকসামে যাওয়ার জন্য চট্টগ্রাম স্টেশনে এসেছিলেন কলেজশিক্ষার্থী মো. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, একটি কাজে চট্টগ্রামে বড় ভাইয়ের বাসায় এসেছিলেন। কাজ শেষে ফিরে যাচ্ছেন। চট্টলা এক্সপ্রেসে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। আগামীকাল বুধবার তাঁর স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষের পরীক্ষা আছে। এখন ট্রেন চলাচল বন্ধ, কিন্তু তাঁকে যেতেই হবে। এখন বিকল্প হিসেবে বাসে যাওয়ার কথা চিন্তা করছেন।
ব্যবসায়িক কাজে সম্প্রতি চট্টগ্রামে এসেছিলেন ঢাকার ব্যবসায়ী মো. আলমগীর। ঢাকায় যাওয়ার জন্য সুবর্ণ এক্সপ্রেসের টিকিট কেটেছিলেন। স্টেশনে এসেছিলেন নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগে। আজ সকাল সাড়ে ছয়টায় তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ট্রেন চলাচল করবে না, এ রকম কিছু আগে জানতেন না। তাহলে সকাল সকাল আসতেন না। এখন বাসে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
ট্রেন না চলার কারণে বিপাকে পড়েছেন মো. সোহেল। ৭৫ বছর বয়সী নানিকে চিকিৎসক দেখাতে চট্টগ্রামে মামার বাসায় এসেছিলেন তিনি। চিকিৎসক দেখানোর পর আজ বরিশালে ফিরে যাবেন। প্রথমে সুবর্ণ এক্সপ্রেসে ঢাকায় এবং এরপর লঞ্চে বরিশাল যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।
ট্রেন না চলার কারণে বিপদে পড়েন অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ আকাশ। হবিগঞ্জের এ বাসিন্দা থাকেন চট্টগ্রাম নগরের রৌফাবাদে। বাড়িতে বাবা মোহাম্মদ আলী (৭৫) অসুস্থ। তিনি বলেন, অসুস্থ বাবা তিন বছর বয়সী নাতনি মোহাম্মদ রমজান মিয়াকে দেখতে চেয়েছেন। এ জন্য আজ বাড়ি যাওয়ার জন্য স্টেশনে এসেছিলেন। সকাল ৭টা ২০ মিনিটে পাহাড়িকা ট্রেনে সিলেট যাবেন, এমন পরিকল্পনা ছিল। ট্রেনে গেলে ভাড়াও কম। এখন কীভাবে যাবেন, তা বুঝতে পারছেন না। বাসে গেলে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা লাগবে। বাস না পেলে বাসায় চলে যাবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে ধর্মঘট চলাকালে চট্টগ্রাম স্টেশনে রেল ব্যবস্থাপক, স্টেশনমাস্টারসহ দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দেখা যায়নি। এ নিয়েও যাত্রীদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ট্রেন চলাচল না করার বিষয়ে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। জানানো হয়, রানিং স্টাফদের কর্মবিরতির কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
তাই সকালে চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে ঢাকাগামী চট্টলা এক্সপ্রেস ও সুবর্ণ এক্সপ্রেস, কক্সবাজারগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়। যাঁরা অনলাইনে টিকিট কিনেছেন, তাঁরা অনলাইনে টাকা ফেরত পাবেন। আর যাঁরা সরাসরি কাউন্টার থেকে সংগ্রহ করেছেন, তাঁরা কাউন্টারে ফেরত দিয়ে টাকা পাবেন। ট্রেন চলাচল না করার কারণে দুঃখ প্রকাশ করেন ঘোষক। চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকার উদ্দেশে ৩টি, কক্সবাজারের উদ্দেশে ২টি এবং সিলেটের উদ্দেশে ১টি ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল।