মাটির নিচে চাপা ইতিহাস, নীরবে দাঁড়িয়ে বুরুজপোতা ঢিবি

ঐতিহাসিক বুরুজপোতা ঢিবি। শুক্রবার সকালে খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বড়বাড়ি গ্রামেছবি: প্রথম আলো

দিনের আলোয় বুরুজপোতা ঢিবির কাছে পৌঁছাতেই মনে হয় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বিশাল গাব, কাঁঠাল আর বাঁশঝাড়ের ঘন ছায়ায় ঢেকে আছে চারপাশ। গাছের শিকড় যেন শক্ত করে জড়িয়ে আছে উঁচু মাটির ঢিবিকে। পাশে ছোট্ট একটি মনসামন্দির। চারদিকে নীরবতা। অথচ এই নীরবতার আড়ালেই আছে কয়েক শ বছরের ইতিহাস।

খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বড়বাড়ি গ্রামের এই বুরুজপোতা ঢিবিকে স্থানীয়রা রাজা প্রতাপাদিত্যের দুর্গের অংশ বলেই চেনেন। ইতিহাসবিদদের লেখাতেও সেই ইঙ্গিত মিলেছে। সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঢিবিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগ নিলেও জমির মালিকানা–সংক্রান্ত জটিলতায় সেই প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, বড়বাড়ি গ্রামের মূল সড়ক থেকে একটু ভেতরে বাঁশঝাড় পেরিয়ে উঁচু ঢিবির অবস্থান। রাস্তার সমতল থেকে এখনো প্রায় ১০–১২ ফুট উঁচু এটি। ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল গাব ও কাঁঠালগাছ। গাছের বিস্তৃত শিকড়ের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে পুরোনো ইটের অংশ।

স্তূপাকারে ও ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে প্রাচীন ইট। শুক্রবার সকালে কয়রার বড়বাড়ি গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

ঢিবির ছবি তুলতে দেখে এগিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা মধুমিতা রানী। হাসিমুখে প্রশ্ন করেন, ‘ঢিবির ওপরের পুরোনো গাছের ছবি তুলছেন নাকি?’ এরপর নিজেই বলতে শুরু করেন ঢিবির গল্প। তিনি বলেন, একসময় ঢিবিটি আরও অনেক উঁচু ছিল। বছরের পর বছর বৃষ্টির কারণে ক্ষয় আর মানুষের মাটি কাটার কারণে এটি অনেকটাই নিচু হয়ে গেছে। পাশের মনসামন্দিরটির দিকে ইশারা করে বলেন, এটিও বহু প্রাচীন।

কথা বলতে বলতে মধুমিতা রানী ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গাব ও কাঁঠালগাছ দুটি দেখান। তাঁর মতে, গাছ দুটির বয়স ১৫০ বছরেরও বেশি। তিনি বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে শুনেছি, এটা রাজা প্রতাপাদিত্যের আমলের বুরুজ। এখানে নাকি রাজার সৈন্যরা পাহারা দিত, কামানও ছিল।’

স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘোরে আরও নানা গল্প। গাবগাছটি নিয়ে একটি লোকবিশ্বাসও রয়েছে এলাকায়। কয়েক বছর আগে ঝড়ে গাছটি কাত হয়ে পড়েছিল। পরে সেটি কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হলে কয়েকজন স্বপ্নে দেখেন, তাঁদের গাছটি কাটতে নিষেধ করা হচ্ছে। তারপর গাছটি আর কাটা হয়নি। এরপর ধীরে ধীরে গাছটি আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়—এমনটাই বললেন স্থানীয়রা।

ঢিবি থেকে কয়েক শ গজ দূরের বড়বাড়ি গ্রামেও ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের চিহ্ন। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় বা চাষের জমিতে এখনো মেলে প্রাচীন ইট, নকশাখচিত পাথর ও পুরোনো স্থাপনার ভগ্নাংশ। কোথাও স্তূপ করে রাখা হয়েছে ছোট আকারের পুরোনো ইট, কোথাও পড়ে আছে খোদাই করা পাথর। কিছু পাথরে এখনো স্পষ্ট ফুল-লতাপাতা, দেব-দেবীর অবয়বসহ বিভিন্ন অলংকরণের নকশা।

গ্রামের প্রবীণদের ভাষ্য, মাটি খুঁড়লেই বেরিয়ে আসে পুরোনো আমলের ইট, খোদাই করা পাথর, এমনকি কখনো কখনো ইটের গাঁথুনিযুক্ত দেয়ালের অংশও। গ্রামের অলিগলি, বাড়ির আঙিনা বা পুকুরপাড়ে হাঁটলেই ইতিহাসের সেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা চিহ্ন চোখে পড়ে।

একসময় বড়বাড়িজুড়ে রাজা প্রতাপাদিত্যের দুর্গের নানা চিহ্ন ছিল বলে জানান স্থানীয়রা। শীলপুকুর, পদ্মপুকুর, দুই সতিনের পুকুর, দুর্গের পরিখা ও প্রাচীরের অনেক অংশ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। তবে সেই ইতিহাসের শেষ সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে বুরুজপোতা ঢিবি।

বসতবাড়ির পাশে পড়ে আছে পুরোনো প্রত্নবস্তু। শুক্রবার সকালে কয়রার বড়বাড়ি গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই স্থান। স্থানীয় বাসিন্দা মনোরঞ্জন মণ্ডল বলেন, আইলার সময় নদীর বাঁধ ভেঙে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। চারপাশের সব জায়গা পানির নিচে চলে গেলেও ঢিবি ডোবেনি। কয়েক দিন ধরে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ বহু মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

বুরুজপোতা ঢিবির ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্র। তাঁর ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে শাঁকবাড়িয়া নদীর পশ্চিম তীরে বেদকাশী এলাকায় রাজা প্রতাপাদিত্যের দুর্গ, প্রাচীর, পরিখা ও বিভিন্ন স্থাপনার ভগ্নাবশেষের উল্লেখ রয়েছে।

‘কয়রা উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ বইয়ে ইতিহাস গবেষক ও কয়রা কপোতাক্ষ মহাবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আ ব ম আবদুল মালেক লিখেছেন, মোগল আমলে বারভূঁইয়াদের অন্যতম প্রতাপশালী শাসক রাজা প্রতাপাদিত্য আনুমানিক ১৫৮৭ থেকে ১৫৯৫ সালের মধ্যে এখানে দুর্গ নির্মাণ করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বুরুজপোতা ঢিবি ছিল দুর্গের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ। এখান থেকে সৈন্যরা চারদিকে নজরদারি করতেন এবং প্রয়োজন হলে তোপধ্বনির মাধ্যমে সংকেত দিতেন।

ক্ষয়ে যাওয়া প্রাচীন পাথরখণ্ড। শুক্রবার সকালে কয়রার বড়বাড়ি গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

স্থানটি সংরক্ষণে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি প্রশাসন প্রয়োজনীয় তথ্য ও মতামত পাঠিয়েছে। উপজেলা ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর বেদকাশী মৌজার এসএ ২০৫২ নম্বর দাগের জমিতে অবস্থিত ঢিবিটি এখনো রাস্তার সমতল থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু। ঢিবির ওপর উঠলে এটি প্রাচীন পুরাকীর্তির নিদর্শন বলে মনে হয়।

সম্প্রতি বুরুজপোতা ঢিবি পরিদর্শন করে উপজেলা ভূমি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন বলে জানান খুলনা বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী কাস্টোডিয়ান শাহিন মিয়া। তিনি জানান, ঢিবিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মধ্যে রয়েছে। জমির মালিকেরা এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে দিতে রাজি হননি। তাঁর ভাষ্য, ‘ভূমির মালিকদের সম্মতি না থাকলে আমাদের পক্ষে সংরক্ষণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া কঠিন।’

গাছের শিকড়ে ঢাকা বুরুজপোতা ঢিবি যেন নীরবে অপেক্ষা করছে। হয়তো একদিন বৈজ্ঞানিক খননে মাটির নিচ থেকে উঠে আসবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসের বহু অজানা অধ্যায়।