শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রতিবাদে আম্মারের উপস্থিতিতে রাজশাহী রেলস্টেশনে ভাঙচুর, চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত

রেলস্টেশনের বিভিন্ন অংশে ভাঙচুর চালান বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। গতকাল রোববার রাতে তোলাছবি: প্রথম আলো

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রতিবাদে মধ্যরাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ভাঙচুর করেছেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। রেলওয়ে থানা, পার্সেল অফিস, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয়সহ স্টেশনের বিভিন্ন স্থানে তাঁরা ভাঙচুর চালান।

এ ঘটনায় গতকাল রোববার রাত ১১টা ২০ মিনিটের ঢাকা অভিমুখী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়। ওই সময় যাত্রী, স্টেশনের কর্মকর্তা–কর্মচারী ও নিরাপত্তায় নিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক যাত্রী ট্রেন বাতিলের খবরে দ্রুত স্টেশন এলাকা ত্যাগ করেন। পরে রাত ১টা ২০ মিনিটে শিক্ষকদের হস্তক্ষেপে শিক্ষার্থীরা স্টেশন ছেড়ে ক্যাম্পাসে ফিরে যান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, শিক্ষার্থীরা গাছের ডাল, বাঁশ, লাঠি ও ইটপাটকেল দিয়ে স্টেশনের কাচের জানালা, ডাস্টবিন, দোকানপাট, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কক্ষ, কার্যালয়, সাইনবোর্ড ও সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করেন। ভাঙচুরের সময় আতঙ্কে স্টেশন ছেড়ে যান যাত্রীরা।

এর আগে গতকাল রাত সাড়ে নয়টার দিকে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে আইয়ুব আলী নামের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। স্টেশনে দায়িত্ব পালনরত রেলওয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আইয়ুব ওই শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বললে তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ।

আইয়ুব ইসলাম ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

রাজশাহী রেলস্টেশনে ভাঙচুর চলাকালে ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা বাতিল হয়। এ সময় আতঙ্ক নিয়ে স্টেশন ছাড়েন যাত্রীরা
ছবি: প্রথম আলো

এ ঘটনায় রোববার রাতেই রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রাজশাহী রেলওয়ের চিফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলামের সই করা এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বরখাস্ত হওয়া সদস্যরা হলেন আরিফ হোসেন, রোকন উদ্দীন, শফিকুল ইসলাম ও শাহাদত হোসেন।

রাজশাহী রেলস্টেশনে রাতের ঘটনার পর বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের স্টেশনমাস্টার মো. জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাত সাড়ে চারটা পর্যন্ত রেললাইন অবরুদ্ধ ছিল। এরপর কার্যক্রম শুরু হয়। তিনি জানান, রাতে দুটি ট্রেন আটকে ছিল। এর মধ্যে একটি সারদা রোড এলাকায় এবং অন্যটি মধুমতি এক্সপ্রেস হরিয়ানে অবস্থান করছিল। পরে ভোরে ট্রেনগুলো স্টেশনে আসতে শুরু করে। সকালে কয়েকটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যায়। তবে মধুমতি এক্সপ্রেস দেরিতে আসায় বনলতা এক্সপ্রেস প্রায় ৪০ মিনিট দেরিতে ছেড়ে যায়। সিল্ক সিটি ও মহানন্দা এক্সপ্রেস সময়মতো ছেড়ে যায়।

রাতের ঘটনার সময় স্টেশনের কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য ভেতরে অবস্থান না করে বাইরে চলে যেতে বলা হয়েছিল জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, কর্তৃপক্ষ তাঁদের জীবন রক্ষার জন্য স্টেশনে তালা দিয়ে বাইরে থাকতে বলেছিল। পরে হামলাকারীরা চলে গেলে তাঁরা আবার স্টেশনে ফিরে আসেন। এরপর ঊর্ধ্বতন রেল কর্মকর্তারা স্টেশনে এসে পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেন।

রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে
ছবি: সংগৃহীত

‘শিক্ষার্থীদের এক ফোঁটা রক্তের হিসাবও আমরা নিব’

মারধরের প্রতিবাদে রাত ১১টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজারসংলগ্ন রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হামলায় জড়িত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ট্রেন থামিয়ে দুই কর্মকর্তাকে আটক করা হবে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কেউ ঘটনাস্থলে উপস্থিত না হওয়ায় সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ‘মার্চ টু রাজশাহী রেলস্টেশন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষার্থীদের একাংশ বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন রেললাইন ধরে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে যান। সেখানে প্রবেশের পর তাঁরা ভাঙচুর শুরু করেন।

শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে রেললাইন অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন স্টেশন বাজার এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

রাত ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। তিনি শিক্ষার্থীদের শান্ত হয়ে স্টেশন ত্যাগ করার অনুরোধ করেন। তবে তাঁরা তাতে সাড়া দেননি। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদের উদ্দেশে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা।

পরে প্রক্টরিয়াল বডি ও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে তাঁদের স্টেশন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি শান্ত করা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বুঝতে পেরে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে ক্যাম্পাসে ফিরে গেছেন। আশা করি, সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করবেন।
মাহবুবর রহমান, প্রক্টর ও অধ্যাপক

ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের প্রক্টর মাহবুবর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি শান্ত করা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বুঝতে পেরে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে ক্যাম্পাসে ফিরে গেছেন। আশা করি, সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করবেন এবং ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।’

এদিকে ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার লিখেছেন, ‘আমার শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আমি বিন্দু পরিমাণ অ্যাপোলজি (ক্ষমাপ্রা র্থনা) করব না। কথায়–কথায় শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তোলার পরিমাণ ভয়ানক, সেটা আজ বুঝেছে হয়তো। একজন সাধারণ মানুষেরও বিন্দু পরিমাণ ক্ষতি হয়নি। যদি ক্ষতিপূরণ নিতে হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারীদের থেকে নিবেন। যদি মামলা করতে হয়, তাহলে তাদের নামে মামলা করেন। আমার শিক্ষার্থীদের এক ফোঁটা রক্তের হিসাবও আমরা নিব।’