ইউপি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দিলেন এমপি, ইউএনওর হাততালির ভিডিও ভাইরাল

ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন চাচ্ছেন। পাশে (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) বসে থাকা ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার ইউএনও হাততালি দিয়ে সমর্থন জানানছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

পূজামণ্ডপে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্থানীয় বিএনপির এক নেতাকে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান। তাঁকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি এলাকায় প্রচার চালানোর আহ্বানও জানান তিনি। এ সময় সংসদ সদস্যের (এমপি) পাশে বসে হাততালি দেন পীরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদার। ঘটনাটির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর নির্বাচনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ ঘটনার একটি ভিডিও গতকাল শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এর পর থেকে পীরগঞ্জ উপজেলার ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনা নিয়ে এক সাংবাদিকের সঙ্গে ইউএনওর উত্তপ্ত কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডও ছড়িয়ে পড়েছে।

এমপি মহোদয় পরিদর্শনের সময় আমাকে ও ওসি সাহেবকে নিয়ে গেছেন। সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেবেন, সেটা জানতাম না। হাততালির ঘটনাটি অনিচ্ছাকৃত হয়ে গেছে।
গোলাম রব্বানী সরদার, ইউএনও, পীরগঞ্জ

অভিযোগের বিষয়ে পীরগঞ্জের ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদার বলেন, ‘এমপি মহোদয় পরিদর্শনের সময় আমাকে ও ওসি সাহেবকে নিয়ে গেছেন। সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেবেন, সেটা জানতাম না। হাততালির ঘটনাটি অনিচ্ছাকৃত হয়ে গেছে।’ তবে সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনের বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, ‘ওই সাংবাদিকের সঙ্গে মন খুলে কথা বলেছিলাম।’

স্থানীয় রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ভাষ্য, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এর আগে ইউএনওর এ ধরনের আচরণ মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ঠাকুরগাঁও জেলার সাধারণ সম্পাদক আবু সায়েম বলেন, এমপি আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীকে পরিচয় করে দিচ্ছেন, আর ইউএনও অতি উৎসাহী হয়ে সেখানে হাততালি দিয়ে সমর্থন জানাচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নির্বাচনের সময় ইউএনও একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করলে ওই প্রার্থী প্রশাসনিকভাবে বাড়তি সুবিধা পাবেন কি না, সে প্রশ্নও তৈরি হবে।

একই রকম বক্তব্য সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলার সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. নাজমুল ইসলামেরও। তিনি বলেন, ইউএনওর এমন আচরণ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।

ঘটনাটি ১৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার সেনগাঁও ইউনিয়নের আমতলী পূজামণ্ডপে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে মণ্ডপ পরিদর্শনে যান ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ উপজেলা ও রানীশংকৈল উপজেলার আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান। বিএনপিদলীয় এ সংসদ সদস্যের সঙ্গে ছিলেন পীরগঞ্জের ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদারসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

মণ্ডপে বক্তব্য দেওয়ার এক পর্যায়ে জাহিদুর রহমান সেনগাঁও ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান সাইদুর রহমানকে আগামী ইউপি নির্বাচনের জন্য বিএনপির দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘সাইদুর আপনাদের রানিং চেয়ারম্যান। আবারও সাইদুর রহমান অত্র ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী থাকবে।’

এ কথা বলার পর সাইদুর রহমান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান। এ সময় সংসদ সদস্যের পাশে বসা ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদার হাততালি দেওয়া শুরু করেন। পরে উপস্থিত লোকজনও হাততালি দিয়ে সাইদুর রহমানকে সমর্থন জানান। এরপর জাহিদুর রহমান বলেন, ‘সবাই তাঁকে মনোনীত করবেন, ভোট দেবেন এবং এলাকায় আপনারা প্রচার চালাবেন। আমরা তাঁকে নমিনেশন দেব।’

বক্তব্যের এক পর্যায়ে সংসদ সদস্য বলেন, ‘কোনো দিন আপনারা ধানের শীষের এমপি বানাননি। স্বাধীনতার পর থেকে এইবারই প্রথম আপনাদের ভোটে আমরা নির্বাচিত হয়েছি।’ এ সময়ও উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে ইউএনওকে হাততালি দিতে দেখা যায়।

পরে জামায়াতকে ইঙ্গিত করে জাহিদুর রহমান বলেন, ‘এখানে আর একটা শক্তি ছিল, যারা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। সেই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ একত্রিত হয়ে তাদের পরাজিত করেছি। ঠিক স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ও আমরা তাদের পরাজিত করেছিলাম। সামনের প্রতিটি নির্বাচনেও তাদের প্রার্থী থাকবে। এ নিয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ আমরা এক থাকব।’

ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিক ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদারের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন। ওই কথোপকথনের একটি অংশও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক বক্তব্যে হাততালি দেওয়া প্রসঙ্গে প্রশ্ন করতেই ইউএনওকে বলতে শোনা যায়, ‘শুধু কি আমি হাততালি দিছি, ওসি সাহেব দেয় নাই। ভালো করে দেখেন। না হলে ভালো করে লিখে দেন এমপির সঙ্গে ইউএনও নির্বাচনী প্রচারণায়। লিখে দেন।’

বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে—সাংবাদিক এমনটি জানালে ইউএনও বলেন, ‘আপনি এভাবে বলেন...ইউএনও হচ্ছে- নাও ওয়ান অব দ্য বিএনপি লিডারস অব পীরগঞ্জ। যে দলের সরকার থাকবে, আমি সেই দলেরই নেতা। বোঝা গেছে মেসেজটা। আমার দল আছে, আমার দল সরকারি দল। আমার আদর্শ সরকারি দলের আদর্শ। আপনি লিখে দেন, যাতে সারা দেশে ভাইরাল হই। আই ওয়ান্ট টু বি ভাইরাল।’

কথোপকথনের এক পর্যায়ে ইউএনও আরও বলেন, ‘এমপির বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা আমার কেন, আমার সেক্রেটারিরই নাই। আমার ডিসি স্যারের নাই। আমার কমিশনার স্যারের নাই। তাহলে আমি কোন হেডমওয়ালা হইলাম। আমি হলাম ছোট্ট ইউএনও। পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা।’

ইউএনও আরও বলেন, ‘সব কাজ মাননীয় সংসদ সদস্যকে জিজ্ঞেস করে করতে হবে, চিঠিও আছে আমার কাছে। সব কাজ এমপি মহোদয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে করতে হয়। সবাই তালি দিচ্ছে, আমি না দিলে এমপি স্যার তো মাইন্ড করবে।’

কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকে প্রকাশ্যে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাঁর পক্ষে সমর্থন চাওয়ার সময় একজন ইউএনওর এ ধরনের আচরণ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেননা, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৫ নম্বর বিধিতে সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, ‘ভিডিওটি আমি দেখেছি। বিষয়টি নিয়ে আমি তাঁকে সতর্ক করেছি।’