কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং: রতনের পাশাপাশি ‘পয়েন্ট সাব্বির’ ও ‘কিং মেকার’ গ্রেপ্তার

কুমিল্লা নগরের আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা নগরের আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াডের’ প্রধান হিসেবে পরিচিত ইমরান হোসেন ওরফে রতনকে গতকাল শুক্রবার কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। একই অভিযানে তাঁর সহযোগী ও ‘আর স্কোয়াডের’ ডান হাত হিসেবে পরিচিত সাইফুল ইসলামকেও (২০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কুমিল্লায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ‘ক্রাইম সেটআপ’ নামের আরেকটি কিশোর গ্যাংয়ের গ্যাংয়ের শীর্ষ নেতা মো. সাব্বির ওরফে ‘পয়েন্ট সাব্বির’ (২৪) ও তাঁর সহযোগী রবিউল ইসলাম নবী ওরফে ‘কিং মেকারকে’ (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান আজ শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের নির্দেশনায় কিশোর গ্যাংবিরোধী চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ডিবি সদস্যরা কক্সবাজার ও কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা রয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ১০ দিন ধরে ধারাবাহিক অভিযান চলছে। এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন দুই হাজারের বেশি কিশোর ও তরুণকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে যাঁদের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

রতনের বিরুদ্ধে ৯ মামলা

পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইমরান হোসেন ওরফে রতন (২৫) নগরের ছোটরা মফিজাবাদ কলোনির বাসিন্দা। তাঁর বাবা মৃত আবুল কাশেম। পুলিশ তাঁকে ‘আর স্কোয়াডের’ মূল চালিকা শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে খুনসহ গুরুতর অভিযোগে ৯টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ।

কুমিল্লা নগরে কিশোর গ্যাং নিয়ে পুলিশের বক্তব্য ও বিভিন্ন সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনে রতন গ্রুপের নাম এসেছে। পুলিশের ভাষ্য ও বিভিন্ন মামলার তথ্য অনুযায়ী, এই গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার, সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

রতনের বিরুদ্ধে আলোচিত মামলাগুলোর একটি ২০২২ সালের শাহাদাত হোসেন হত্যা মামলা। ওই বছরের ১৯ আগস্ট কুমিল্লা নগর উদ্যানের সামনের সড়কে আওয়ার লেডি অব ফাতেমা স্কুলের সামনে শাহাদাতকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় র‍্যাব কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তখন র‍্যাবের পক্ষ থেকে রতনকে মামলার প্রধান আসামি এবং রতন গ্রুপের প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। রতন গ্রুপ ও ঈগল গ্রুপের বিরোধের জেরে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল বলেও তখন র‍্যাব জানিয়েছিল।

সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান জোরদার হলে রতনের নাম আবার আলোচনায় আসে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফার অভিযানে ২৫৪ জনকে আটক করেছিল পুলিশ। তখন পুলিশ জানিয়েছিল, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রতন গ্রুপের চার সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তাঁদের একজন আনিসুর রহমান ওরফে আনিক (১৯)। পুলিশ তাঁকে রতনের ভাগনে এবং গ্রুপটির ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। পুলিশের ভাষ্য ছিল, রতন আত্মগোপনে থাকায় আনিক তখন গ্রুপটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।

কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিনের নেতৃত্বে মিছিলের পেছনে হাঁটছেন ‘রতন গ্রুপের’ প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতন (গোল চিহ্নিত)
ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

রতনের ‘ডান হাত’ সাইফুলের বিরুদ্ধেও ১০ মামলা

রতনের সঙ্গে কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাইফুল ইসলামকে (২০)। পুলিশ তাঁকে ‘আর স্কোয়াডের’ নেতা রতনের ডান হাত হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাঁর বাবার নাম আক্তার হোসেন মোল্লা। সাইফুল রতনের এলাকার বাসিন্দা। জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাইফুলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে ১০টি মামলা চলমান রয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য, রতন আত্মগোপনে থাকার সময় তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে গ্রুপের কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল। ওই নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে সাইফুলকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।

আরও পড়ুন

‘ক্রাইম সেটআপের’ দুই নেতা গ্রেপ্তার

রতন ও সাইফুলের পাশাপাশি কুমিল্লা নগর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরেক আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘ক্রাইম সেটআপের’ দুই নেতাকে। তাঁরা হলেন গ্যাংটির শীর্ষ নেতা মো. সাব্বির ওরফে ‘পয়েন্ট সাব্বির’ (২৪) এবং তাঁর সহযোগী রবিউল ইসলাম নবী ওরফে ‘কিং মেকার’ (২৪)।

পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, সাব্বিরের বাবার নাম আবদুল করিম। তাঁর বিরুদ্ধে আগের একটি মামলা রয়েছে। রবিউল ইসলাম নবীর বাবার নাম নাসির উদ্দিন। তাঁর বিরুদ্ধেও একটি মামলা রয়েছে।

আরও পড়ুন

জেলা পুলিশ এই দুই গ্যাংকে কুমিল্লার আলোচিত ও ভয়ংকর কিশোর গ্যাং হিসেবে উল্লেখ করেছে। পুলিশের ভাষ্য, এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা কিশোর-তরুণদের অপরাধে জড়ানোর পাশাপাশি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে আসছিল।

জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা লুৎফুর রহমান বলেন, সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্টকারী এবং কিশোরদের অপরাধের পথে ঠেলে দেয়—এমন কোনো গ্যাং বা অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। কিশোর গ্যাং নির্মূলে অভিযান অব্যাহত থাকবে।