নৌকা বিক্রির ‘মৌসুমি পেশায়’ এক গ্রামের শতাধিক পরিবার, তিন মাসে ওঠে বছরের খরচ
বছরের অধিকাংশ সময়েই জাহাঙ্গীর সরকারের (৪৫) হাতে তেমন কাজ থাকে না। মাঝেমধ্যে টুকটাক দিনমজুরি করেন। বর্ষা এলে বাড়ে তাঁর কর্মব্যস্ততা। বাড়ে আয়রোজগার। নৌকা তৈরি ও বিক্রিতে ব্যস্ত থাকেন। বর্ষার তিন মাস নৌকা বিক্রি করে যা আয় করেন, মূলত তা দিয়েই চলে সারা বছরের সংসার খরচ।
জাহাঙ্গীর সরকারের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার মোবারকদী গ্রামে। প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি ও তাঁর পরিবার এ মৌসুমি পেশার সঙ্গে যুক্ত। সমস্যা সত্ত্বেও পৈতৃক এ পেশায় আঁকড়ে আছেন প্রায় ৫০ বছর ধরে। এ সময়ে রোজগার ভালো হয় বলে অপেক্ষায় থাকেন, কখন বর্ষা আসবে।
মোবারকদী গ্রামে জাহাঙ্গীর সরকারের মতো শতাধিক পরিবারের তিন থেকে চার শত লোক প্রতি বর্ষা মৌসুমে নৌকা তৈরি ও বিক্রির কাজে যুক্ত। তাঁদের তৈরি ডিঙিনৌকা বিক্রি হয় চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুরসহ আরও বেশ কয়েকটি জেলায়। নৌকা তৈরিতে কারিগরদের ঠক ঠক শব্দে নীরবতা ভেঙে বর্ষায় গ্রামটি হয়ে উঠে সরগরম। এটি ‘নৌকা গ্রাম’ হিসেবেও স্থানীয় লোকজনের কাছে পরিচিত।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে মতলব-বাবুরহাট সড়কের পশ্চিমপাশে মোবারকদী গ্রাম। গতকাল রোববার দুপুরে সেখানে দেখা যায়, ৮ থেকে ১০টি স্থানে লোকজন কাঠের ডিঙিনৌকা তৈরি ও বিক্রি করছেন। এ কাজে ধুমধাম সময় কাটাচ্ছেন কারিগর ও বিক্রেতারা। নৌকা তৈরির ঠক ঠক শব্দে গোটা এলাকা হয়ে উঠেছে মুখর। মাঝেমধ্যে কিছু ক্রেতা দরদাম করছেন তৈরি নৌকার।
জাহাঙ্গীর সরকার ছাড়াও কথা হয় ওই গ্রামের আবদুল মান্নান প্রধান, হান্নান প্রধানিয়া, নুরুল ইসলাম, নুরু মিয়া, বাবুল গাজী, সাপু গাজী, বাদশা মাল, নুরুল দরজিসহ অন্তত ১৫ জনের সঙ্গে।
কারিগরেরা বলছেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে মেহগনি, চাম্বুল ও কড়ইগাছ কিনে সেগুলো ভালো করে শুকিয়ে কারিগর দিয়ে নৌকা বানান। বর্ষার তিন মাসে একেকজন এক থেকে দেড় শতাধিক নৌকা তৈরি করে বিক্রি করেন। সেই লাভের টাকায় মূলত চলে তাঁদের সংসারের সারা বছরের খরচ।
১৯৮০ সালের আগে থেকে ডিঙি নৌকা তৈরি ও বিক্রির মৌসুমি পেশায় যুক্ত আবদুল মান্নান প্রধানও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। কাজের ফাঁকে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মাঝারি আকারের একটি নৌকা বানাতে খরচ পড়ে চার থেকে ছয় হাজার টাকা। একেকটি নৌকা বিক্রি হয় আট থেকে ১০ হাজার টাকায়। খরচ মিটিয়ে প্রতি নৌকায় গড়ে লাভ হয় তিন থেকে চার হাজার টাকা। তাঁর বাবা, চাচা, জ্যাঠাসহ পরিবারের প্রায় সবাই এ মৌসুমি পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর গ্রামের শতাধিক পরিবারের তিন থেকে চার শত লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তবে কাঠের দাম বেশি থাকায় খরচ মিটিয়ে অনেক সময় প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া যায় না। সমস্যা সত্ত্বেও পৈতৃক এ পেশায় আঁকড়ে আছেন।
আবদুল মান্নানের কথার সঙ্গে সায় মেলান সেখানে উপস্থিত বাকিরাও। মোবারকদী গ্রামের কারিগর চান্দু মিয়া ও খোরশেদ আলী বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নৌকা তৈরি করছেন। একেকটি নৌকা বানিয়ে আয় করেন এক হাজারের বেশি টাকা। তাঁদের আশপাশের কয়েকটি গ্রামের অনেক লোকও কারিগর হিসেবে কাজ করেন। এতে যা পান, তা দিয়ে চলে সংসার। তবে বর্ষা শেষ হলে টুকটাক দিনমজুরিও করেন তাঁরা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম ইশমাম বলেন, ওই গ্রামের কথা শুনেছেন। একটি গ্রামে এত লোক নৌকা তৈরির পেশায় যুক্ত, তা অভাবিত বিষয়। গ্রামটিতে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করবেন।